আলজাজিরা ও মিডল ইস্ট মনিটর
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ সঙ্ঘাতের রেশ কাটিয়ে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক ও নৌচলাচল কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। কাতারের জলসীমায় সব ধরনের নৌযান চলাচল পুনরায় চালুর ঘোষণার পাশাপাশি দীর্ঘ পাঁচ মাস পর ইরান ও কাতারের মধ্যে সামুদ্রিক বাণিজ্য আবার শুরু হয়েছে। তবে এই ইতিবাচক আবহের মধ্যেও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা ও আঞ্চলিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
কাতারের পরিবহন মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দেশটির জলসীমায় সব ধরনের নৌযান চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গত ২৯ জুনের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হলো, যার অধীনে পালতোলা ও মাছ ধরার নৌকা চলাচল স্থগিত ছিল। কাতার তখন আনুষ্ঠানিক কোনো কারণ না জানালেও আঞ্চলিক সামরিক অভিযানের সময় ছিটকে আসা গোলার আঘাতে এক নাগরিকের মৃত্যুর কথা জানিয়েছিল। তবে এখন সমুদ্রযাত্রায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বাণিজ্যিক ও সাধারণ নৌযানগুলোকে বিদ্যমান সামুদ্রিক আইন কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ দিকে, দোহায় নিযুক্ত ইরানের বাণিজ্যিক সহদূত আব্বাস আবদোলখানি নিশ্চিত করেছেন যে, ইরানি দূতাবাস ও কাতারি কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে ইরানের দাইয়ার বন্দর এবং কাতারের আল রুয়াইস বন্দরের মধ্যে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। যুদ্ধকালে দাইয়ার বন্দরটি একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছিল। গত মাসে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতার মাধ্যমে চার মাসের সঙ্ঘাতের অবসান ঘটলেও উপসাগরে প্রবেশ ও বের হওয়ার রুট নিয়ে এখনো কিছু বিরোধ ও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। অবশ্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরে আটকে থাকা ইরানি পণ্য ছাড় হওয়াকে দুই তীরের বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ড জানিয়েছে, ওমানের নির্ধারিত করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজকে রেডিও বার্তার মাধ্যমে সতর্ক করে গতিপথ ঘুরিয়ে দিয়েছে আইআরজিসি। এর মধ্যে দু’টি জাহাজ তেহরানে এবং চারটি উপসাগরে ফিরে গেছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তাদের বর্ণিত ‘নিরাপদ পথ’ ছাড়া অন্য পথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোকে তারা কাউন্টার করবে। হরমুজ প্রণালীর এই কৌশলগত গুরুত্বকে ইরানের জন্য ‘পারমাণবিক অস্ত্রের’ মতো শক্তিশালী হাতিয়ার বলে মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ। ইরান সফর শেষে তিনি সতর্ক করেন, মধ্যপ্রাচ্যে বড় সঙ্ঘাত ছড়ালে তেহরান বাব এল-মান্দেব প্রণালীও আটকে দিতে পারে, যা বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ স্থবির করে দেবে। মেদভেদেভ ইরানের ওপর চালানো মার্কিন হামলার তীব্র সমালোচনা করে একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেন। একই সাথে তিনি জানান, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার শিকার দেশগুলো যাতে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়তে পারে, সেজন্য ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সাথে একটি যৌথ প্ল্যাটফর্ম বা আনুষ্ঠানিক সংস্থা তৈরির বিষয়ে তার আলোচনা হয়েছে। মূলত নিহত ইরানি নেতার জানাজার আনুষ্ঠানিকতার ফাঁকে রুশ প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত হিসেবে তেহরান সফরে গিয়ে তিনি এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন।
হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে ফি নিচ্ছে ইরান, মিত্রদের জন্য থাকছে বিশেষ ছাড়
এনডিটিভি জানায়, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর নতুন করে ফি আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। তবে বিগত সঙ্কটের সময়ে যেসব দেশ তেহরানের পাশে ছিল, তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা ও ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হবে। গতকাল শনিবার চীনের বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড পিস ফোরামে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন চীনে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আবদোলরেজা রাহমানি ফাজলি।
রাষ্ট্রদূত ফাজলি জানান, হরমুজ প্রণালী ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সেখানে চলাচলকারী নৌযানগুলোর নিরাপত্তা ও বিভিন্ন সেবামূলক কাজের জন্য এই ফি নেয়া হবে। তবে এটিকে প্রচলিত কোনো ‘টোল’ হিসেবে বিবেচনা না করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ওমানের সাথে যৌথ সমন্বয়ে এই নতুন নৌ-ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো সমুদ্রপথের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জাহাজ চলাচল নিবিড়ভাবে তদারকি করা এবং বিপুল সংখ্যক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবেলা করা। বিবৃতিতে তিনি আরো উল্লেখ করেন, কঠিন দিনগুলোতে যারা ইরানের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, তাদের এই ফি পরিশোধের ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়া হবে। উল্লেখ্য, বিশ্ববাজারে সরবরাহকৃত মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সময় ইরান এই নৌপথ অবরুদ্ধ করে দিলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে ওয়াশিংটনের সাথে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ইরান এই নৌপথের ওপর থেকে তাদের অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়। বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যে সঙ্ঘাতের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।



