নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের অর্ধেক অঞ্চলে চলছে তাপপ্রবাহ। আপাতত মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের। গতকাল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা পৌঁছেছে চুয়াডাঙ্গায় ৩৯.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট)। চলতি মাসেই দেশের কয়েকটি স্থানে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। তাপমাত্রা পৌঁছে যেতে পারে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (১০৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট)।
বাংলাদেশে মার্চ মাসটি থাকে না শীত- না গরম অবস্থায়। কারণ ২১ মার্চ থেকে কয়েক দিন ও রাত সমান থাকে। ফলে ওই সময়টায় বাংলাদেশে তাপমাত্রা সহনীয় অবস্থায় থাকে। তবে এপ্রিলের শুরু থেকেই তাপমাত্রা বাড়তে থাকলেও তাপপ্রবাহ শুরু হতে একটু সময় নেয়। কিন্তু চলতি বছর একটু ব্যতিক্রম অবস্থা দেখা যাচ্ছে। এবার এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই দেশের কয়েকটি স্থানে তাপপ্রবাহ শুরু হয়ে গেছে। আবহাওয়ায় আরেকটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছে গতকাল থেকে। তা হলো, ঢাকা জেলা ও এর আশপাশ জেলায় শুরু হয়েছে তাপপ্রবাহ। সাধারণত দেশের অন্যান্য স্থানে তাপপ্রবাহ শুরু হলেও ঢাকা জেলায় অথবা আশপাশ জেলায় গরম মৌসুমের শুরুতেই তাপপ্রবাহ বয়ে যায় না, কিন্তু এ বছর তাই ঘটলো।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, ঢাকা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, রাঙ্গামাটি, চাঁদপুর, বরিশাল এবং পটুয়াখালী জেলাসহ রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। গত বৃহস্পতিবার থেকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ ও নীলফামারী জেলাসহ রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে।
দেশের বর্তমান তাপপ্রবাহ আগামীকাল রোববার পর্যন্ত চলতে পারে বলে আবহাওয়াবিদরা নিশ্চিত করে বলেছেন। আজ শনিবার পর্যন্ত দেশের অর্ধেক অঞ্চল তাপপ্রবাহের আওতায় থাকলেও আগামীকাল শুধু সিলেট বিভাগ ছাড়া দেশের সাত বিভাগেই তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, গরমের এ সময়টায় এমন হতে পারে। তবে আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল বলছেন, আগামী সোমবার পর্যন্ত ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলোতে বৃষ্টির সম্ভাবনা একেবারেই কম। যদিও এর মধ্যে ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতসহ কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যেতে পারে। ঝড় ও বৃষ্টি হয়ে গেলে সাময়িকভাবে তাপমাত্রা কমতে পারে কিন্তু কিছুক্ষণ পরই আবার গরম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আজ শনিবারের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সিলেট বিভাগের দু’-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। সারা দেশে দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে।
গতকাল ঢাকা শহরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, রাজশাহীতে ৩৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, খুলনায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকাল সিলেটে ৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টি ছাড়া দেশের কোথাও উল্লেখ করার মতো বৃষ্টি হয়নি।
চুয়াডাঙ্গায় মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৯.৭ ডিগ্রি
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, টানা তিন দিন ধরে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গায়। মৌসুমের শুরুতেই এমন তাপমাত্রা বৃদ্ধি স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গতকাল শুক্রবার জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা এ মৌসুমেরও সর্বোচ্চ। একই সাথে জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে।
জেলা আবহাওয়া অফিস জানায়, শুক্রবার বেলা ৩টায় ৩৯.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৩১ শতাংশ। এর আগে দুপুর ১২টায় তাপমাত্রা ছিল ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
গত ১ এপ্রিল
জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং এর পর দিন বৃহস্পতিবার ছিল ৩৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ নিয়ে টানা তিন দিন দেশের ও মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ায় চুয়াডাঙ্গার জনজীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি।
সরেজমিনে শহর ঘুরে দেখা গেছে, টানা তাপপ্রবাহে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে চুয়াডাঙ্গার জনজীবন। সকাল ৭টার পর থেকেই তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকে। তপ্ত রোদে রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা হয়ে পড়েছে। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। বাইরে বের হলেও ছাতা, টুপি বা কাপড় দিয়ে নিজেদের রক্ষা করছেন। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন খেটে-খাওয়া মানুষ। রিকশা ও ভ্যানচালকরা পর্যাপ্ত যাত্রী পাচ্ছেন না। মাঠের শ্রমিকরা তীব্র রোদ উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে মাঝেমধ্যে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতে দেখা গেছে তাদের। গরমের কারণে শহরের বিভিন্ন স্থানে ঠাণ্ডা শরবত ও আখের রসের চাহিদা বেড়েছে।
শহরের তরমুজ বিক্রেতা আব্দুল আলীম বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গায় গরম মানেই কষ্ট। এখনো পুরো গরম শুরু হয়নি, কিন্তু তাপ সহ্য করা যাচ্ছে না। রাস্তায় বসে ব্যবসা করা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।” মোটর সাইকেল চালক রাকীব বলেন, “রোদের তাপে শরীর একেবারে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। খুব প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হচ্ছি না। বিদ্যুৎ না থাকলে ঘরেও থাকা যায় না। কোথাও স্বস্তি নেই।’
চুয়াডাঙ্গার প্রথম শ্রেণীর আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইনচার্জ জামিনুর রহমান জানান, ‘জেলায় মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, যা আগামী কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে। আপাতত বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। শুক্রবার এ জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। চলমান তাপপ্রবাহ শনিবার পর্যন্ত থাকতে পারে, রোববার থেকে তাপমাত্রা কমতে শুরু করবে।’



