দেশীয় কেন্দ্র বসিয়ে রেখে ভারত থেকে বছরে ১৭ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ আমদানি

নতুন করে চার্জ আরোপ করা হচ্ছে, বাড়ছে ব্যয়ের চাপ

অলস বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে প্রতি বছর প্রায় অর্ধ লাখ কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। দেশীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্র অলস বসিয়ে রাখা হলেও ভারত থেকে প্রায় আড়াই আজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি করা হয়েছিল। পিডিবির এক হিসাব মতে, ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে বছরে এখন ব্যয় হচ্ছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। এর ওপর এবার ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের ওপর নতুন করে ‘সেটেলমেন্ট নোডাল এজেন্সি’ বা এসএনএ চার্জ যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে বছরে বাড়তি ব্যয় হবে কোটি কোটি টাকা। ফলে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয়ের চাপ আরো বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

প্রাথমিক জ্বালানি নিশ্চিত না করেই বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দায়মুক্তি আইনের মাধ্যমে দেশে একের পর এক বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। গড় চাহিদার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বিদ্যুৎ কেন্দ্র অনুমোদন দিয়ে সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছিল। অলস বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে প্রতি বছর প্রায় অর্ধ লাখ কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। দেশীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্র অলস বসিয়ে রাখা হলেও ভারত থেকে প্রায় আড়াই আজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি করা হয়েছিল। পিডিবির এক হিসাব মতে, ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে বছরে এখন ব্যয় হচ্ছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। এর ওপর এবার ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের ওপর নতুন করে ‘সেটেলমেন্ট নোডাল এজেন্সি’ বা এসএনএ চার্জ যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে বছরে বাড়তি ব্যয় হবে কোটি কোটি টাকা। ফলে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয়ের চাপ আরো বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ভারতের আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ০.০০৫ ভারতীয় রুপি এসএনএ চার্জ দিতে হবে। ভারতীয় কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (সিইআরসি) প্রথমে প্রতি ইউনিটে ০.০১ রুপি চার্জ নেয়ার প্রস্তাব করেছিল। পরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) আবেদনের পর তা অর্ধেক করে ০.০০৫ রুপি নির্ধারণ করা হয়। প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় মোট এক হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা রয়েছে। এই বিদ্যুৎ যদি পূর্ণ সক্ষমতায় এক ঘণ্টা আমদানি করা হয়, তাহলে মোট ১১ লাখ ৬০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। প্রতি ইউনিটে ০.০০৫ ভারতীয় রুপি এসএনএ চার্জ হিসেবে এক ঘণ্টায় দিতে হবে প্রায় পাঁচ হাজার ৮০০ ভারতীয় রুপি। একই হারে ২৪ ঘণ্টা পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ আমদানি হলে দৈনিক এসএনএ চার্জ দাঁড়াবে প্রায় এক লাখ ৩৯ হাজার ২০০ রুপি। আর এতে বছরে ব্যয় হবে পাঁচ কোটি আট লাখ আট হাজার ভারতীয় রুপি, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় সাত কোটি টাকা। তবে বাস্তবে বিদ্যুৎ আমদানি সবসময় পূর্ণ সক্ষমতায় এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে হয় না। তাই প্রকৃত বার্ষিক ব্যয় নির্ভর করবে আমদানির পরিমাণ, কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন, চুক্তির শর্ত এবং গ্রিড পরিস্থিতির ওপর। তবুও দীর্ঘমেয়াদে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানির কারণে ছোট ইউনিট চার্জও বড় অঙ্কে পরিণত হতে পারে।

বিদ্যুৎ বিভাগের সূত্র জানিয়েছে, আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের সময়সূচি তৈরি, মিটার থেকে ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ব্যবহারের হিসাব মেলানো এবং গ্রিড পরিচালনাসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি কাজের ব্যয় মেটাতে এই চার্জ নেয়া হবে। এ জন্য ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এনটিপিসি বিদ্যুৎ ব্যাপার নিগম লিমিটেড (এনভিভিএন) এবং বাংলাদেশের বিপিডিবির মধ্যে এসএনএ চুক্তি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে মতামত চেয়ে গত ১৮ আগস্ট অর্থ বিভাগে চিঠি দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, চুক্তি করতে দেরি হলে এনভিভিএনের মাধ্যমে এক হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে। ফলে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যক্রম চলছে।

ভারতের বিদ্যুতের ওপর বাড়ছে নির্ভরতা

বিভিন্ন চুক্তির আওতায় ভারত থেকে সর্বোচ্চ দুই হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। এর মধ্যে সরকারি পর্যায়ে এনভিভিএনের মাধ্যমে ভারতের এনটিপিসির কেন্দ্র থেকে ২৫০ মেগাওয়াট, দামোদর ভ্যালি করপোরেশন (ডিভিসি) থেকে ৩০০ মেগাওয়াট এবং ত্রিপুরা স্টেট ইলেকট্রিসিটি করপোরেশন থেকে ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি খাতের পিটিসি ইন্ডিয়ার মাধ্যমে সেম্বকর্প এনার্জি ইন্ডিয়ার একটি কেন্দ্র থেকে ২০০ মেগাওয়াট এবং সেম্বকর্প থেকে সরাসরি আরো ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি রয়েছে। সব মিলিয়ে এক হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য এনভিভিএন ও বিপিডিবির মধ্যে এসএনএ চুক্তি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর বাইরে ভারতের আদানি পাওয়ারের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা কেন্দ্র থেকে এক হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, আদানির সাথে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির মধ্যেই এ ধরনের চার্জের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে আদানি থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের জন্য নতুন করে এসএনএ চুক্তির প্রয়োজন হবে না।

বছরে ব্যয় ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ব্যয় শুধু বিদ্যুতের মূল দামেই সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যুতের মূল মূল্যের পাশাপাশি কোনো কোনো ক্ষেত্রে হুইলিং বা সঞ্চালন চার্জও দিতে হয়। এবার এর সাথে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে এসএনএ চার্জ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, আদানি পাওয়ার, এনভিভিএন, পিটিসি ইন্ডিয়া ও সেম্বকর্প- এই চার উৎস থেকে বাংলাদেশ প্রায় এক হাজার ৬৪১ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ আমদানি করেছে। এ জন্য বিদ্যুতের মূল মূল্য হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৯৯৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে আদানি পাওয়ারের বিদ্যুতের জন্য। প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে প্রায় ৮০৩ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১১ হাজার ৯৩৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এনভিভিএনের বিদ্যুতের জন্য ব্যয় হয়েছে তিন হাজার ৪৫৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা। পিটিসি ইন্ডিয়ার বিদ্যুতের পেছনে এক হাজার ৬৫১ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং সেম্বকর্পের বিদ্যুতের জন্য এক হাজার ৯৫৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এনভিভিএনের বিদ্যুতের জন্য আলাদাভাবে ২১১ কোটি ৭১ লাখ টাকা হুইলিং চার্জও পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ। ফলে চারটি উৎস থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের পেছনে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এখন এই ব্যয়ের সাথে যুক্ত হবে এসএনএ চার্জ। প্রতি ইউনিটে ০.০০৫ ভারতীয় রুপি হিসাবে নতুন চার্জের পরিমাণ বিদ্যুতের মূল দামের তুলনায় খুব বেশি নয়। তবে আমদানির পরিমাণ প্রতি বছর শত শত কোটি ইউনিট হওয়ায় দীর্ঘ মেয়াদে এর আর্থিক প্রভাব উপেক্ষা করার মতো নয়। আমদানির পরিমাণ যত বাড়বে, এসএনএ বাবদ ব্যয়ও তত বাড়বে।

এক দিকে আমদানি অন্য দিকে ক্যাপাসিটি চার্জ

বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও কেন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানি করতে হচ্ছে এবং একই সময়ে দেশের অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে কেন ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে? বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাথে করা চুক্তি অনুযায়ী, কোনো কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ না নিলেও নির্ধারিত সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সরকারকে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়। ফলে কেন্দ্রগুলো কম চালানো হলেও নির্দিষ্ট ব্যয় বহন করতে হয়। বিদ্যুৎ খাতে এই ক্যাপাসিটি চার্জের পরিমাণ প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্টদের হিসাবে উঠে এসেছে। অর্থাৎ, এক দিকে দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে বিপুল পরিমাণ অর্থ ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে পরিশোধ করতে হচ্ছে, অন্য দিকে চাহিদা পূরণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে ভারত থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ খাতের ওপর দ্বিমুখী আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।