১০১ আলেমের নাম ব্যবহার

অধিকাংশ আলেম জানেন না বিবৃতির বিষয়ে

খালিদ সাইফুল্লাহ
Printed Edition

সম্প্রতি ১০১ আলেমের নামে একটি বিবৃতি দেয়া নিয়ে আলেম সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিবৃতিতে যাদের নাম রয়েছে, তাদের অনেকে জানিয়েছেন, তাদের কাছ থেকে অনুমতি ছাড়াই তাদের নাম দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া অনেক আলেম এ ধরনের বিবৃতিকে হটকারিতা হিসেবে দেখছেন।

জানা যায়, গত ১ জানুয়ারি ১০১ আলেমের নামে একটি বিবৃতি দেয়া হয় দাওয়াতুল ইহসান বাংলাদেশ নামে একটি সংগঠনের ব্যানার থেকে। তবে বিবৃতিপত্রে তারিখ দেয়া হয় ২ জানুয়ারি। বিবৃতিদাতা হিসেবে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী, মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমান, হাটহাজারি মাদরাসার অধ্যক্ষ খলিল আহমদ কুরাইশী, বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা আবদুল মালেকসহ বিভিন্ন আলেমের নাম রয়েছে। বিবৃতিতে হেফাজত আমিরের ৩১ ডিসেম্বরের তারিখে আরবিতে করা একটি সাক্ষর রয়েছে। এ ছাড়া সংগঠনটির সভাপতি নারায়ণগঞ্জের ডিআইটির পীর হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা আবদুল আউয়াল ও মহাসচিব মুফতি বশিরুল্লাহর কোনো স্বাক্ষর নেই। এমনকি বার্তা প্রেরক মাহাদী হাসানেরও কোনো স্বাক্ষর নেই বিবৃতিতে। এ দিকে ‘জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট কোনো ইসলামি জোট নয়’ এমন শিরোনামে দেয়া বিবৃতি নিয়ে আলেম সমাজের মধ্যেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেক আলেম ইতোমধ্যে জানিয়েছেন বিবৃতিতে তাদের নাম থাকলেও এ ব্যাপারে তারা কিছুই জানেন না। এমনকি বার্তা প্রেরক দাওয়াতুল ইহসান বাংলাদেশের সদস্য মাহাদী হাসান নিজেও বিষয়টি ভালোভাবে জানেন না এবং এ ব্যাপারে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি নন বলে জানান।

জানা যায়, গত নভেম্বরের শুরুতে হঠাৎ করেই দাওয়াতুল ইহসান বাংলাদেশ নামে একটি নতুন সংগঠন গড়ে তোলা হয়। এরপর ৮ নভেম্বর ওই সংগঠনের ব্যানারে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ‘কওমি মাদরাসার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অবদান’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। ওই সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। সভাটি কওমি মাদরাসার ইতিহাস, ঐতিহ্য নিয়ে আয়োজন করলেও বেশির ভাগ বক্তা রাজনৈতিক বক্তব্য রাখেন বেশি। তারা জামায়াত এবং মওদূদীবাদ নিয়ে নানা ধরনের বক্তব্য দেন। প্রধান অতিথি বয়োবৃদ্ধ হেফাজত আমিরের ওইদিন চট্টগ্রামে পটিয়া থেকে বিমানে ঢাকায় আসার কথা ছিল। কিন্তু তিনি সেদিন অসুস্থ হয়ে পড়লে সভায় যোগদান করতে পারবেন না বলে জানান। তার পরও আয়োজকরা অতিজরুরি ভিত্তিতে সেদিন সকালে হেলিকপ্টার ভাড়া করে হেফাজত আমিরকে অসুস্থ অবস্থায় ঢাকায় নিয়ে আসেন। আয়োজকদের সূত্রে জানা যায়, সেদিন তাদের এ জন্য দুই লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছিল এবং এ টাকা একটি রাজনৈতিক দল থেকে সরবরাহ করা হয়েছিল বলেও নেতাদের আলাপচারিতায় জানা যায়।

এরপর গত ১ জানুয়ারি হঠাৎ করে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে তাদের বিবৃতিতে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এমনকি দেশের শীর্ষ শ্রদ্ধেয় আলেমদের নাম ব্যবহার করে এ ধরনের বিবৃতিতে আলেম সমাজের মধ্যেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তারা মনে করছেন বর্তমানে দেশে দু’টি শক্তিশালী জোট জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এখানে একটি জোটকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দিতে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়ে থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা।

বিবৃতিতে নাম রয়েছে- দেশের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের হাটহাজারি মাদরাসার মুহতামিম আল্লামা খলিল আহমদ কুরাইশির। গতকাল জানতে চাইলে নয়া দিগন্তকে তিনি বলেন, আমার কাছ থেকে কোনো অনুমতি না নিয়েই আমার নাম দেয়া হয়েছে। যারা এ কাজ করেছেন তারা সঠিক কাজ করেনি। এখন তাদের শক্তভাবে ধরা উচিত কেন তারা এ ধরনের মিথ্যা কাজ করল।

এ ছাড়া হাটহাজারি মাদরাসার আরো তিনজন শিক্ষকের নাম দেয়া হয়েছে। তাদের কাছ থেকেও নাম দেয়ার ব্যাপারে কোনো অনুমতি নেয়া হয়নি। হাটহাজারি মাদরাসার মুহাদ্দিস ও হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির আল্লামা জসিম উদ্দিন নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, তার কাছ থেকে বিবৃতি দেয়ার আগে কোনো অনুমতি নেয়া হয়নি। হাটহাজারি মাদরাসার আরেক মুহাদ্দিস আশরাফ আলী নিজামপুরী ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন, দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসার কারোর সাথে কথা না বলেই অনৈতিকভাবে চারজনের নাম ব্যবহার করেছে তারা। তিনি আরো লেখেন, উম্মুল মাদারিস জামিয়া আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসা দেশের সর্ববৃহৎ ও সর্বপ্রাচীন দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই জামিয়া সম্পূর্ণ প্রচলিত রাজনীতিমুক্ত ছিল, আছে এবং ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও থাকবে। সম্প্রতি ১০১ জন আলেমের নামে তথাকথিত এক বিবৃতিতে জামিয়ার মহাপরিচালকসহ চারজন সিনিয়র মুহাদ্দিস ও মুফতিদের নাম জড়িয়ে যে সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। এ বিবৃতি সম্পর্কে তারা কেউ-ই কিছুই জানেন না। জামিয়ার শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ইলম ও আমলের পাশাপাশি রাজনীতির বিষয়টি কঠোরভাবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে মহাপরিচালক থেকে শুরু করে প্রাথমিক স্তরের কোনো শিক্ষকই প্রচলিত রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত নন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এমন মিথ্যা সংবাদ প্রচার করা থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষভাবে আহ্বান জানানো হচ্ছে। আশরাফ আলী নিজামপুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, তাদের অনুমতি না নিয়েই বিবৃতির নামে মিথ্যাচার করা হয়েছে।

বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেক, দেওনার পীর অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, তাদের কাছ থেকেও অনুমতি না নিয়ে বিবৃতিতে নাম দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া বরুণার পীর মুফতি রশিদুর রহমান ফারুক, সিলেটের শামীমাবাদ মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা সৈয়দ শামীম আহমদ ও সিলেট দরগাহ মাদরাসার মাওলানা আতাউল হক জালালাবাদী বিবৃতি দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। মুফতি ফয়জুল্লাহ সন্দ্বীপি বলেছেন, এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। মাওলানা আবু সাবের আবদুল্লাহ জানিয়েছেন, এ বিবৃতিতে আমি স্বাক্ষর দিইনি। মাওলানা আহমদ মায়মুন বলেছেন, বিবৃতিতে আমার নাম কিভাবে এলো সেটি জানা নেই। মুফতি আনওয়ারুল হক বলেন, আমি কোনো আলেমের বিপক্ষে কখনোই বিবৃতি দিতে পারি না। এখানে আমার নাম না জানিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি এগুলোর সাথে একমত নই।

জানা যায়, বিবৃতিতে নাম থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি নাম জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে জড়িত ও বিভিন্ন পদে রয়েছেন। যারা ইতোমধ্যে বিএনপির সাথে জোট বেধে নির্বাচন করছেন। তবে ১০১ আলেমের বিবৃতি বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সিনিয়র সহসভাপতি মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী। ফেসবুকের এক পোস্টে তিনি লেখেন, ১০১ আলেমের নামে একটা বিবৃতি আমার নজরে এসেছে। এরই মধ্যে কয়েকজন বলেছেন তারা এ বিবৃতি সম্পর্কে জানেন না। দেখলাম দেশের কয়েকজন শীর্ষ আলেমের নাম। আবার দেখলাম জুনিয়র বা অল্প বয়সীদের নামও আছে। এটা দেখে চিন্তায় পড়ে গেলাম যে, আমার মতো অধমের নামও আছে কি না। দেখলাম, আমার নাম ব্যবহার করে কেউ লাভবান হবে এ যোগ্যতা আমার হয়নি। তাই বেঁচে গেলাম। আর যে বা যারা এমন দুঃসাহসিক কাজ করতে পেরেছে, এদের না আছে দীনদারি, না আছে ভালো কাজ করার যোগ্যতা। এরা আজ আপনাকে কাল আমাকে ব্যবহার করবে, কখন কোথায় ডুবাতে চেষ্টা করবে তা ভাবাও যায় না। কেউ যদি কাউকে অধিক এবং পরিষ্কার স্বচ্ছ পানিতে ডুবিয়ে মারার চেষ্টা করে তা-ও তো পোষায়। অল্প, পচা, নোংরা আর দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে ডুবিয়ে মারতে চাইলে তো এটা আরো দুর্বিষহ। এরা কারা, এদেরকে খুঁজে বের করা দরকার। এমন এমন ব্যক্তিদেরকে কলুষিত করার দুঃসাহস দেখিয়েছে, এদের চেহারা জাতির সম্মুখে উন্মোচিত করা প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নয়া দিগন্তকে আবদুর রব ইউসুফী বলেন, জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ ধরনের বিবৃতি ঠিক হয়নি। জমিয়তের নেতাদের নাম থাকা প্রসেঙ্গে তিনি বলেন, দলের কোনো ফোরামে বিবৃতির বিষয়ে আলোচনা হয়নি। এ কারণে যাদের নাম রয়েছে, তারাই তাদের বিষয়টি বলতে পারবেন। জমিয়তের প্রচার সম্পাদক মাওলানা ইমরানুল বারী সিরাজী জানিয়েছেন, বিবৃতিদাতারা তার সম্মতি নিয়েই তার নাম দিয়েছেন।

বিবৃতির বিষয়ে হেফাজত নেতা হারুন ইজহার গতকাল এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, বিএনপির সাথে জোট করতেই পারেন পলিটিক্যাল ও জিও-পলিটিক্যাল কৌশলগত কারণে, আদর্শিক মিল থেকে নয়। সে কৌশলের পক্ষে যুক্তি দেয়ার অনেক কিছু আছে। এমনকি আপনারা আপনাদের কৌশলগত রাজনৈতিক অবস্থানকে ইসলামের কোনো বৃহত্তর স্বার্থে শরঈ জায়গা থেকেও দালিলিক করতে পারেন, ইজতিহাদ করতে পারেন। নিয়ত যদি সহিহ থাকে, ইজতিহাদটি ভুল হলেও আপনার কোনো দায় থাকবেনা আল্লাহর নিকট। কিন্তু রাজনৈতিক মৌসুমে আপনারা হঠাৎ আকিদাহর কথা বলে, শরিয়তের কথা বলে, হক্ক-বাতিলের কথা বলে সেকুলার বিএনপির কোলে বসে জামায়াতের বিরোধিতা করে মানুষকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছেন, তা উল্টো আপনাদের জন্য বুমেরাং হতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যেই শত আলেমের বিবৃতি আংশিক ভুয়া প্রমাণিত হতে শুরু হয়েছে।

তিনি আরো লেখেন, রাজনৈতিক নানা পক্ষের পর্দার আড়ালে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও কি অস্বীকার করা যাবে? আমাদের আপত্তি আপনাদের রাজনৈতিক অবস্থানের বিরুদ্ধে নয়, সে অবস্থানের পক্ষে ভণ্ডামির আশ্রয় নেয়ার বিরুদ্ধে। রাজনীতিতে ভণ্ডামি চললেও ইসলামি রাজনীতিতে এমন ভণ্ডামি অনাকাক্সিক্ষত।