মতবিনিময় সভায় ইসলামী নেতারা

গোষ্ঠীস্বার্থে পরস্পর বিরোধে জড়ালে সবার ধ্বংস অনিবার্য

গতকাল রাজধানীর পল্টনে বিএমএ মিলনায়তনে জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদ এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের মতবিনিময় সভা
ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের মতবিনিময় সভা |সংগৃহীত

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের ঐক্য; উলামায়ে কেরাম ও তাওহীদি জনতার করণীয়- শীর্ষক মতবিনিময় সভায় দেশের শীর্ষ আলেম, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, গোষ্ঠীগত স্বার্থে পরস্পর বিরোধে জড়ালে সবার জন্যই ধ্বংস অনিবার্য। বর্তমান সঙ্কটকালে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখা জরুরি, না হলে দেশ আবারো ফ্যাসিবাদ ও বৈদেশিক প্রভাবের ভয়াল ছোবলের মুখোমুখি হবে।

গতকাল রাজধানীর পল্টনে বিএমএ মিলনায়তনে জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদ এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। সভায় ইসলামপন্থীদের ঐক্যের জন্য জামায়াতে ইসলামী উদার উল্লেখ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, জামায়াত আমির ইতঃপূর্বে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন আগামী নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের একটি ব্যালট করতে যতটা ছাড় ও উদারতার প্রয়োজন হয় জামায়াতে ইসলামী তা করবে। শুধু নির্বাচনের জন্যই নয়; আগামী দিনে যাতে আলেমদের ওপর আর কেউ জুলুম করতে না পারে সেজন্য সব ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে রফিকুল ইসলাম খান বলেন, আওয়ামী লীগ আলেম-ওলামাদের ওপর সবচেয়ে বেশি জুলুম করেছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের জুলুমের শিকার হয়েছে। তবে আলেমদের ওপর বেশি জুলুম হয়েছে। আলেম সমাজ একই প্লাটফর্মে জোটবদ্ধ থাকলে আগামীতে কেউ আলেমদের ওপর জুলুম করার দুঃসাহসিকতা দেখাতে পারবে না। আলেমদের মাইনাস করে আধিপাত্যবাদ, ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন কেউ দেখতে পারবে না। স্বাধীনতা-সার্বভৌত্ব রক্ষার সব আন্দোলন-সংগ্রামে আলেমদের অবদান ও ত্যাগ জাতি চিরকাল মনে রাখবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৫ আগস্টও হাসিনা পালিয়ে যাবে- এটা কেউ ভাবেনি। কিন্তু জীবনের মায়া ত্যাগ করে আলেমরাই ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আলেমরাই রাজপথে ছিল। বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়ে ফ্যাসিবাদমুক্ত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। নতুন বাংলাদেশের নেতৃত্ব ইসলামপন্থীদের দিতে হলে অবশ্যই ঐক্যের বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি সব দল ও মতের নেতৃত্বকে একই প্লাটফর্মে জোটবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

সভায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ১৭৫৭ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়ে ওলামা-মাশায়েখদের আন্দোলনের সামনের সারিতে রাখা হয়েছে। ইসলামপন্থীরা সামনের সারিতে থেকে জীবন ও রক্ত দিয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেছে ইসলাম বিদ্বেষীরা ওই আন্দোলনের ভূমিকা হাইজ্যাক করে নিজেদের অর্জন দাবি করে, যা স্পষ্ট প্রতীয়মান ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলন। এ আন্দোলনে যাত্রাবাড়ী একটি মাদরাসার ১৭ জন ছাত্র শহীদ হলেও গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী একটি দলের ছাত্র সংগঠনের সভাপতি দাবি করে তিনি নাকি যাত্রাবাড়ীতে ধর ধর বলে চিৎকার করছে আর আওয়ামী লীগ পালিয়ে গেছে! এতেই যাত্রাবাড়ী স্বাধীন হয়ে গেছে! যেখানে তিনি ইতিহাস বিকৃত করে একক ক্রেডিট নেয়ার চেষ্টা করেছেন। সারা দেশে এ আন্দোলনে যত আহত হয়েছেন এবং শহীদ হয়েছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম, হাফেজসহ ইসলামপন্থীরা আহত ও শহীদ হয়েছেন। সবশেষে শহীদ হয়েছেন নোয়াখালীর কুরআনের হাফেজ হাসান। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামপন্থীদের নিয়ে ইসলামবিদ্বেষীরা যেই ন্যারেটিভ প্রচার করেছে সেটি জনগণের কাছে এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে। জনগণ বিশ্বাস করে ইসলামপন্থীদের হাতেই বাংলাদেশ নিরাপদ ও দুর্নীতিমুক্ত একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন সম্ভব। যার প্রমাণ ইতঃপূর্বে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ তিনটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে দেখিয়ে দিয়েছেন। তাদের দায়িত্ব পালনকালে দুই পয়সার দুর্নীতি হয়েছে বলে আজ পর্যন্ত কেউ অভিযোগ করতে পারেনি। তাই ইসলামপন্থীরা জোর করে বলতে পারে, আগামীর বাংলাদেশ পরিচালনার দায়িত্ব ইসলামী দলের হাতে গেলে একটি কল্যাণ ও মানবিক বাংলাদেশ গঠিত হবে। অন্য কোনো দল বা মতাদর্শের দলের কাছে আগামীর রাষ্ট্রপরিচালনা দায়িত্ব গেলে আবারো বাংলাদেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হবে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, নৈরাজ্য সৃষ্টির পাশাপাশি আলেমদের ওপরও জুলুমের ভয়াবহতা দেখা যাবে। তাই এখনই আলেম-ওলামাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

সভায় বক্তারা আরো বলেন, আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পতনের পর দেশে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে। এটি ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের ফসল। যেখানে ছাত্র থেকে যুবক, পুরুষ থেকে নারী, আলেম থেকে আওয়াম সবার রক্ত ঝরেছে। দল-মত নির্বিশেষে স্বতঃস্ফূর্র্ত আন্দোলনের মাধ্যমেই এ বিজয় অর্জিত হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের সঙ্কীর্ণ দলীয় ও ব্যক্তিস্বার্থে এ সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ।

বক্তারা বলেন, এ সরকার যেন বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নাতীতভাবে বাস্তবায়ন করে। একই সাথে উপদেষ্টা পরিষদ ও নারী অধিকার কমিশনসহ অন্যান্য সংস্কার কমিশন থেকে বিতর্কিত ব্যক্তিদের অপসারণ করে জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।

বক্তারা আরো বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর, রোহিঙ্গা সমস্যা ও অন্যান্য জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষগুলো এবং জাতীয় স্টেইকহোল্ডারদের সমন্বয়ে গ্রহণযোগ্য ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে যেন জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থা সরকার নিশ্চিত করা হয়।

বক্তারা বলেন, এ মুহূর্তে জাতীয় ঐক্যই আমাদের প্রধান শক্তি। বিভক্তি ও হঠকারী রাজনীতি দেশের অর্জিত বিজয়কে ব্যর্থ করে দিতে পারে। সব পক্ষকে এখনই দায়িত্বশীল ও বিবেকবান ভূমিকা পালন করতে হবে।

সভা থেকে গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো হলো : ১. গোষ্ঠীগত ও দলীয় স্বার্থ পরিহার করে আন্তরিক ঐক্যই এখন সমাধান, ২. ইন্টেরিম সরকারের প্রতি অহেতুক চাপ সৃষ্টির পরিবর্তে দায়িত্বশীল সহযোগিতা অব্যাহত রাখা, ৩. বিচার, নির্বাচন ও সংস্কার প্রক্রিয়াকে নিরপেক্ষ ও প্রশ্নাতীতভাবে সম্পন্ন করার দাবি, ৪. বিতর্কিত উপদেষ্টা ও কমিশন সদস্যদের অব্যাহতির মাধ্যমে আস্থা পুনঃস্থাপন, ৫. চট্টগ্রাম বন্দর, রোহিঙ্গা ইস্যু ও জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সর্বপক্ষীয় সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

আয়োজক সংগঠনের সভাপতি মাওলানা নূরুল হুদা ফয়েজীর সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় আরো বক্তৃতা করেন, ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী, ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমাদ, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা আহমাদ আলী কাসেমী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দীন আহমদ, ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা ড. খলিলুর রহমান মাদানী, টকশো ব্যক্তিত্ব ড. ফয়জুল হক, জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য এবং ওলামা বিভাগের সভাপতি মাওলানা মোশাররফ হোসেন, এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক মাওলানা সানাউল্লাহ খান, মুফতি আবদুল্লাহ মাসুম, ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বাশার, মাওলানা আবদুল্লাহ আল মাসউদ, মাওলানা মোহাম্মদ আলী ফেনী, মাওলানা হানযালা, মুফতি হেমায়েতুল্লাহ কাসেমী, মাওলানা মীর হুসাইন, মাওলানা ছানা উল্লাহ বিজয়নগর, মাওলানা মাহবুবুর রহমান আশরাফি প্রমুখ।