বাড়ছে প্রকাশ্যে ছিনতাই

ঝুঁকিতে ঢাকার ৫৫ ‘হটস্পট’

আব্দুল কাইয়ুম
Printed Edition

ভোর কিংবা গভীর রাত নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে জনাকীর্ণ সড়ক, অলিগলি, ফুটপাথ বা শপিংমলের সামনেও ছিনতাইকারীদের থাবা ছড়িয়ে পড়েছে। এতে করে জনমনে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। রাজধানীতে সাম্প্রতিক সময়ে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। সুযোগ বুঝে অস্ত্রের মুখে সর্বস্ব লুটে নেয়া এবং বাধা দিলে অবলীলায় ছুরিকাঘাত বা গুলি করার মতো নৃশংস ঘটনা নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল সাধারণ মানুষই নয়, খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি ও বিশেষ অভিযানের মধ্যেই অপরাধীদের এই বেপরোয়া মনোভাব রাজধানীবাসীকে এক চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।

গতকাল আদাবরের শেখেরটেক ৭ নম্বর সড়কের মাথায় এক বিকাশ এজেন্টের দোকানে ঢুকে তাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা ও মোবাইল লুট করে ছিনতাইকারীরা। পরে বিকেলে পুলিশ ওই ছিনতাইকারী চক্রকে ধরতে অভিযানে গেলে তারা পুলিশের ওপর ও চাপাতি নিয়ে হামলা চালায়। এতে আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম এবং এসআই তরুণ গুরুতর আহত হন। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুড়ে চার ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।

শেরেবাংলা নগরে পুলিশের দুই সদস্যকে ছুরিকাঘাত : গত ১১ জুন রাতে জিয়া উদ্যানের গ্লাস ব্রিজের সামনে ছিনতাইয়ের খবর পেয়ে ধাওয়া করে টহল পুলিশ। এ সময় অটোরিকশায় পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে ছিনতাইকারীরা ধারালো ছুরি দিয়ে হামলা চালালে শেরেবাংলা নগর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সামসুজ্জোহা এবং কনস্টেবল হৃদয় হোসেন গুরুতর আহত হন।

মোহাম্মদপুরে দুই নারীর ব্যাগ ও স্যুটকেস ছিনতাই : ১ জুন ভোর রাতে মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে একটি আবাসিক ভবনের গেটের সামনে রিকশা থেকে নামামাত্রই দুই নারীকে রামদা দিয়ে ভয় দেখিয়ে তাদের সাথে থাকা স্যুটকেস, ব্যাগ ও মূল্যবান জিনিসপত্র কেড়ে নেয় একটি সশস্ত্র চক্র। সিসিটিভি ফুটেজে এই ঘটনাটি ধরা পড়লে নগরজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

গত মে মাসের মাঝামাঝিতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে পড়ে গিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক নারীর মৃত্যু হয়। এ ছাড়া মে মাসের শেষ সপ্তাহে মতিঝিল শাপলা চত্বর এলাকায় ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বের হওয়া এক ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্য রাস্তায় গুলি করে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও ডলার ছিনিয়ে নেয় মোটরসাইকেলে আসা সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা। এসব ঘটনা ছাড়াও প্রতিনিয়ত ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনা।

গোয়েন্দা তথ্যমতে, রাজধানীতে ছিনতাইয়ের জন্য তিন শতাধিক স্পট থাকলেও এর মধ্যে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ৫৫টি এলাকাকে ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ছিনতাইয়ের সবচেয়ে বেশি প্রকোপ দেখা গেছে মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, মতিঝিল, গুলশান, ওয়ারী, রমনা এবং লালবাগ এলাকায়। ব্যাংকপাড়া, হাসপাতাল এলাকা, বাস ও রেল স্টেশনকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে এই চক্রগুলো ওত পেতে থাকে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত চার মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১১৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে ২৫টি, মার্চে ২৯টি, এপ্রিলে ২৬টি এবং মে মাসে ৩৬টি মামলা রেকর্ড করা হয়। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা এর কয়েক গুণ বেশি। কারণ ছিনতাইয়ের শিকার অনেকেই থানায় মামলা করতে আগ্রহী হন না। অন্য দিকে, ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দস্যুতার ১৩৬টি মামলা হয়েছে।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মহানগরীর আট বিভাগে তালিকাভুক্ত এক হাজার ৩৮৭ জন ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে রমনা বিভাগে ১৫২, লালবাগে ১৫৯, ওয়ারীতে ৩০৮, মতিঝিলে ১৬৮, তেজগাঁওয়ে ২৪০, মিরপুরে ৫৩, গুলশানে ৬৭ এবং উত্তরায় ২৪০ জন রয়েছে। এর বাইরেও ভাসমান কিশোর গ্যাং এবং মাদকাসক্তদের নিয়ে গঠিত আরো হাজারের বেশি ছিনতাইকারী রাজধানীতে সক্রিয় রয়েছে।

পুলিশ বলছে, এদের প্রায় ৮০ শতাংশই এক থেকে সাতটি মামলার আসামি। অনেকেই একাধিকবার গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবারো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। গত ছয় মাসে ডিএমপি ১৬৫ জন দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারীর বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটকাদেশের প্রস্তাব দেয়। পরে তাদের আটকাদেশ কার্যকর হলেও মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অনেকেই উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে আবারো ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলেন, বর্তমানে অপরাধীদের মধ্যে আইন অমান্য করার এবং পার পেয়ে যাওয়ার একটি বেপরোয়া প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জামিনে মুক্ত থাকা দাগি অপরাধীদের সঠিক নজরদারিতে না রাখা, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সামাজিক নজরদারির অভাব এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই অপরাধ চক্রগুলো আরো বেশি হিংস্র হয়ে উঠেছে।

ছিনতাই প্রতিরোধ ও নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রসঙ্গে ডিএমপি জানায়, ছিনতাইকারীদের দমনে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রয়েছে। জুন মাসের এই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাগুলোর পর প্রতিটি থানাকে আরো কঠোর বার্তা দেয়া হয়েছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশমুখ ও হটস্পটগুলোতে টহল ও পুলিশের চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে। সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি এবং সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ চলছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ছিনতাইকারীরা চাপাতি দিয়ে ওসি ও এসআইয়ের মাথায় কোপানোর চেষ্টা করলে তারা হাত দিয়ে তা ঠেকানোর চেষ্টা করেন। এতে তাদের হাতে কোপ লাগে। এ সময় পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুড়লে দুই ছিনতাইকারী গুলিবিদ্ধ হয়। পরে তাদেরসহ মোট চারজনকে আটক করা হয়। আহত পুলিশ সদস্য ও ছিনতাইকারীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওই আস্তানা থেকে বেশ কিছু দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, বর্তমানে ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা মহামারী আকার ধারণ করেছে। অপরাধীরা এখন শুধু রাতের আঁধারে নয়, বরং দিনের আলোতেও দেশীয় ও মারণাস্ত্র নিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হচ্ছে। এই সশস্ত্র আক্রমণের ফলে ভুক্তভোগীরা কেবল তাদের মূল্যবান সম্পদই হারাচ্ছেন না, বরং মারাত্মকভাবে আহত হচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটছে।

এই পরিস্থিতির পেছনে আইনি প্রক্রিয়ার কিছু গুরুতর পেশাগত ও কাঠামোগত ত্রুটিকে দায়ী করে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করতে গেলে পুলিশ ছিনতাইয়ের মামলা না নিয়ে কেবল ‘হারিয়ে যাওয়া’র সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরামর্শ দেয়। এতে অপরাধের দায়ভার অপরাধীর পরিবর্তে পরোক্ষভাবে ভুক্তভোগীর ওপরই বর্তায়। মামলার সঠিক উপস্থাপনার অভাবে এবং অপরাধের গুরুত্বকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে না পারায় অপরাধীরা আদালত থেকে খুব দ্রুত ১৫ দিন বা এক থেকে তিন মাসের মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে আসছে। জেল থেকে বেরিয়ে তারা আবার একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকাটি বর্তমানে নিরাপত্তার দিক থেকে ‘রেড জোনে’ অবস্থান করছে এবং মিরপুরসহ অন্যান্য ঘনবসতিপূর্ণ ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর অবস্থাও দিন দিন আশঙ্কাজনক হয়ে উঠছে। বেশির ভাগ অপরাধী মাদকাসক্ত হওয়ায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সামান্য ব্যাগ বা মোবাইলের জন্য মানুষকে ছুরিকাঘাত বা গুলি করতেও দ্বিধাবোধ করে না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি এবং সজাগ থাকা এখন সময়ের দাবি। এই ধরনের অপরাধকে আর ‘সাধারণ অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই; বরং একে জননিরাপত্তা ও জীবনের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দ্রুত এবং কার্যকর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলেই এই অস্থির পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।