সূচকের পাশাপাশি পুঁজিবাজাওে লেনদেনেও অবনতি

আস্থায় নিতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সপ্তাহের দ্বিতীয় কর্মদিবসেও সূচক হারিয়েছে দেশের পুঁজিবাজার। এ নিয়ে টানা দুইদিন পতন ঘটল পুঁজিবাজার সূচকের। আর সেই সাথে কমেছে বাজারগুলোর লেনদেনও। গতকাল দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সবগুলো সূচকের কমবেশি অবনতি ঘটে। লেনদেনের শুরুতে কিছুক্ষণের জন্য দুই বাজারেই সূচক ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও পরবর্তীতে বড় ধরনের বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে। লেনদেনের শেষদিকে এসে বাজারগুলো বিক্রয়চাপ সামলে নেয়ার চেষ্টা করলেও পুরোপুরি সফল হয়নি।

প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৭ দশমিক ৪৪ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৪ হাজার ৮৬৯ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি গতকাল লেনদেন শেষে ৪ হাজার ৮৬১ দশমিক ৫৫ পয়েন্টে নেমে আসে। দিনের শুরুতে সূচকটি প্রায় ১৫ পয়েন্টের মতো বৃদ্ধি পেলেও এর পরই বিক্রয়চাপে পড়ে। প্রায় দুই ঘণ্টা এ চাপ অব্যাহত থাকায় দুপুর সোয়া ১২টায় সূচকটি ৪ হাজার ৮৪৩ পয়েন্টে নেমে আসে। এ পর্যায়ে সূচকের অবনতি রেকর্ড করা হয় ২৬ পয়েন্ট। তবে সাড়ে ১২টার দিকে ফের ঊর্ধ্বমুখী হয় সূচকটি। লেনদেন শেষ হওয়ার মুহূর্তে সূচকটি একবার কয়েক পয়েন্ট বাড়লেও দিনের সমন্বয় শেষে তা টিকে থাকেনি। একই সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ সূচক কমেছে যথাক্রমে ৯ দশমিক ৬৩ ও ২ দশমিক ৯১ পয়েন্ট।

দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই গতকাল ৩২ দশমিক ৫৩ পয়েন্ট কমেছে। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি হয়েছে যথাক্রমে ৪১ দশমিক ৯৫ ও ১৮ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট।

সূচকের পাশাপাশি গতকাল দেশের দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেনের অবনতি ঘটে। ঢাকা শেয়ারবাজার এ দিন ৩০৯ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিন অপেক্ষা ৭৬ কোটি টাকা কম। রোববার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৩৮৫ কোটি টাকা। অপর দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেন ১৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা থেকে ১১ কোটি ৯৯ লাখ টাকায় নেমে আসে। দিনের শুরুতে একটি বড় সময় ধরে বিক্রয়চাপের মুখে থাকায় লেনদেনের এ অবনতি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তারা মনে করছেন, এ মুহূর্তে বাজারে ব্যাপকভাবে আস্থাহীনতা বিরাজ করছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিতে পারে তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ শঙ্কায় রয়েছেন। তাদের মতে, সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে যেকোনো সময় ঘুরে দাঁড়াতে পারে দেশের পুঁজিবাজার। তবে এর জন্য সময় দরকার। মনোয়নপত্র জমা দেয়ার পর এ প্রক্রিয়া পুরোটা শেষ করে দেশে নির্বাচনী কর্মকাণ্ড শুরু হলেই বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হবে এমনটিই মনে করেন তারা। তখনই নিশ্চিত হবে দেশ একটি নতুন সরকারের দিকে এগোচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা তখন পুঁজিবাজার নিয়ে আশ^স্ত হতে পারবে। বাজারে তাদের অংশগ্রহণ বাড়বে।

গতকালের বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, দুই বাজারেই মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোই গতকাল বেশি দরপতনের শিকার হয়েছে। বাজারগুলোর বিশেষায়িত ডিএসই-৩০ ও সিএসই-৩০ সূচকের অবনতিই এ দিকে ইঙ্গিত করে। তবে সূচকের অবনতির পেছনে বড় ভূমিকাটি ছিল ব্যাংকিং খাতের। এ খাতের বেশির ভাগ কোম্পানিই গতকাল দরপতনের শিকার ছিল। পাশাপাশি ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত, ফার্মাসিউটিক্যালস, টেক্সটাইল ও মিউচুয়াল ফান্ড। এ খাতগুলোতেই মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির সংখ্যা বেশি। তবে বাজারের বড় পতন ঠেকায় বীমা, সিমেন্ট, সিরামিকস ও আইটি খাত। এ খাতগুলোর বেশির ভাগ কোম্পানির শোয়ারের দাম বেড়েছে গতকাল। ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া মোট ৩৯০টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ১৪২টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ১৫৫টি। অপরিবর্তিত ছিল ৯৩টির দর। অপর দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া ১৪৭টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ৪৭টির দাম বাড়লেও কমেছে ৬৮টির। এখানে ৩২টি সিকিউরিটিজের দর অপরিবর্তিত থাকে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে ব্যাংকিং খাতের কোম্পানি সিটি ব্যাংক। ১১ কোটি ৬ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৪৫ লাখ ১২ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ১০ কোটি ৮৬ লাখ টাকায় ৪ লাখ ৭৩ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস উঠে আসে লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আলহাজ টেক্সটাইল, রহিমা ফুড করপোরেশন, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, উত্তরা ব্যাংক, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, সায়হাম কটন মিলস ও ফাইন ফুডস।

দিনের মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল টেক্সটাইল খাতের কোম্পানি সোনারগাঁও টেক্সটাইলস। গতকাল ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে কোম্পানিটির। ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সোনারবাংলা ইন্স্যুরেন্স, সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস, বিডি থাই ফুডস, জনতা ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড, এক্সি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, রিলায়েন্স ওয়ান মিউচুয়াল ফান্ড ও সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স।

ডিএসইতে গতকাল দরপতনের শীর্ষে ছিল ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ দর হারায় ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের কোম্পানিটি। ৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ দর হারিয়ে দরপতনের দ্বিতীয় কোম্পনি ছিল এনসিসি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। এ তালিকার অন্য কোম্পানি ও ফান্ডগুলো ছিল যথাক্রমে জাহিন স্পিনিং, নুরানি টেক্সটাইলস, ইবিএল এনআরবি মিউচুয়াল ফান্ড, ম্যাকসন্স স্পিনিং, ফিনিক্স ফিন্যান্স, ফার্স্ট ফিন্যান্স ও ইউনিয়ন ক্যাপিটাল।