মধ্যেপ্রাচ্যের আবুধাবী, ওমান, বাহরাইনসহ কয়েকটি দেশের সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার দীর্ঘদিন থেকেই বন্ধ হয়ে রয়েছে। ব্যতিক্রম ছিল বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার সৌদি আরবই। দেশটিতে প্রতি বছর লাখ লাখ কর্মী যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে সৌদি আরব সরকার এক ঘোষণায় জানিয়েছে, তার দেশের নাগরিকদের মধ্য থেকে ৬০ ভাগ কর্মীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। এমন ঘোষণা বাস্তবায়ন করা হলে সৌদি আরবে বাংলাদেশের শ্রমিক যাওয়া একদিকে যেমন সঙ্কুুচিত হয়ে আসবে, অন্য দিকে বিপুল পরিমাণ রেমিটেন্স ওই দেশ থেকে আসা বন্ধ হবে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার ও সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসকে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে নতুন করে কিভাবে টিকে থাকতে হবে সেটি নিয়ে এখন থেকেই ভাবতে হবে বলে মনে করছেন অভিবাসন খাত-সংশ্লিষ্টরা।
গত ১৯ জানুয়ারি সৌদি গেজেটে প্রকাশিত শ্রমবাজার নিয়ে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদেশীদের (প্রবাসী) জন্য সৌদির শ্রমবাজার সঙ্কুচিত করে মার্কেটিং ও সেলস (বিক্রয়) খাতে নিজস্ব নাগরিকদের জন্য কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ তৈরি করছে সৌদি আরব সরকার। বলা হয়, দেশটির মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মার্কেটিং ও সেলস (বিক্রয়) খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন থেকে অন্তত ৬০ শতাংশ কর্মী হতে হবে সৌদি নাগরিক। ফলে সৌদি আরবে থাকা অন্য দেশের নাগরিকদের (প্রবাসী) জন্য এটি বড় দুঃসংবাদ। নতুন এ নিয়ম অনুযায়ী যেসব প্রতিষ্ঠানে তিন বা এর বেশি শ্রমিক কাজ করেন, তাদেরমোট জনবলের ৬০ শতাংশ স্থানীয়দের দিয়ে পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে মার্কেটিং খাতে মার্কেটিং ম্যানেজার, বিজ্ঞাপন বিশেষজ্ঞ, গ্রাফিক ডিজাইনার ও জনসংযোগ পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো অন্তর্র্ভুক্ত রয়েছে। অপর দিকে সেলস খাতে বিক্রয় ব্যবস্থাপক থেকে শুরু করে আইটি ও যোগাযোগ যন্ত্রাংশ বিক্রয় বিশেষজ্ঞের মতো পদগুলোতেও সৌদি-নির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে। সরকারি এ সিদ্ধান্ত ঘোষণার ঠিক তিন মাস পর থেকে দেশজুড়ে কার্যকর হবে বলে সৌদি গেজেটের প্রতিবেদনে বলা হয়।
সৌদি মন্ত্রণালয় এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট করেছে, এসব পদে নিযুক্ত সৌদি কর্মীদের মাসিক ন্যূনতম বেতন হতে হবে পাঁচ হাজার ৫০০ রিয়াল। এ পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো দেশটির বেসরকারি খাতের শ্রমবাজারকে স্থানীয়দের কাছে আরো আকর্ষণীয় করে তোলা এবং যোগ্য সৌদি নাগরিকদের চাকরির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা। এর ফলে মার্কেটিং ও সেলস পেশায় নিয়োজিত কয়েক লাখ বিদেশী শ্রমিক দেশটিতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন বলে প্রতিবেদনে ধারণা করা হয়েছে। সৌদি গেজেটের বরাত দিয়ে আরো জানানো হয়েছে, শ্রমবাজারের মানোন্নয়ন এবং মানসম্পন্ন কাজের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যেই সরকার এ কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দীর্ঘদিনের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিভিন্ন খাতে প্রবাসীদের পরিবর্তে নিজস্ব জনবল নিয়োগের এ ‘সৌদিকরণ’ প্রক্রিয়া এখন আরো জোরাল হলো।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়ে বিদেশে যত শ্রমিক প্রতি বছর যাচ্ছে তার অর্ধেকের বেশিই যাচ্ছে সৌদি আরবের বিভিন্ন প্রদেশে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে (মে-২০২৫) সৌদি, কুয়েত, কাতার, আবুধাবী, ওমান, কাতার, মালয়েশিয়া, লিবিয়া, ইরাক, ইতালি, সুইজারল্যান্ড, পোল্যান্ড, জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মোট চার লাখ ২০ হাজার ৭২১ জন শ্রমিক গিয়েছে। তার মধ্যে তিন লাখ চার হাজার শ্রমিকই গিয়েছে সৌদি আরবে। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে মোট গিয়েছিল ১০ লাখ ১১ হাজার ৯৬৯ জন। এর মধ্যে ছয় লাখ ২৪ হাজার ৫৬৪ জনই গিয়েছিল সৌদি আরবে। এর আগের বছর ১৩ লাখ ৫ হাজার ৪৫৩ জন গিয়েছিল। এর মধ্যে চার লাখ ৯৭ হাজার ৬৭৪ জনই গিয়েছিলো সৌদি আরবে।
যদিও এ মুহূর্তে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার মালয়েশিয়া, আবুধাবী, লিবিয়া, ওমান, বাহরাইন, মরিশাস পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। অন্য দেশগুলোর মধ্যে কাতার, কুয়েত, জর্দান, লেবানন, ইরাক, সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ, জাপানসহ অন্যান্য দেশ খোলা থাকলেও সেগুলোতে যাচ্ছে খুবই কম। গতকাল জনশক্তি ব্যবসার সাথে জড়িত একাধিক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের গাফলতির কারণে শ্রমবাজারের অবস্থা খুবই খারাপ যাচ্ছে। তারা শুধু সত্যায়নের নামে নতুন নতুন আইন করেন। এতে এসব ভিসা অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, কোনো কর্মী অভিযোগ দিলেই বিএমইটি মন্ত্রণালয় লাইসেন্সের কাজ বন্ধের লক্ষ্য সার্ভার লকড করে দেয়। পরে তাদের সাথে যোগাযোগ করলে কয়েক দিন পর সেটি খুলে দেয়। আমাদের নিয়ে শুরু হয়েছে শুধু ব্যবসা। এক প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেন, সৌদি সরকার নতুন করে তার দেশ থেকে যে ৬০ শতাংশ কর্মী কাজে লাগানোর যে বাধ্যবাধকতা দিয়েছে সেটি চালু হলে আমাদের শ্রমবাজার হুমকিতে পড়বে। এমনিতেই সৌদির শ্রমবাজারের অবস্থা খুব একটা ভালো না। যারা ফ্রি ভিসার নামে যাচ্ছে তাদের অনেকেই এখন দেশটিতে বিপদের মধ্যে আছে। আকামা জটিলতার কারণে অনেকেই পুলিশের হাতে ধরা পড়ছে। জেলে যাচ্ছে। ফিরছে খালী হাতে। এসব দেখার দায়িত্ব বাংলাদেশ দূতাবাস ও জেদ্দা কনসাল জেনারেল অফিসের। কিন্তু তারা এসব না দেখার ভান করে আছেন বলে তারা অভিযোগ করেন। অভিজ্ঞ মহলের মতে, সৌদির শ্রমবাজার যে কোনো মূল্য ধরে রাখতে হবে। প্রয়োজনে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা আরো বাড়ানো উচিত।



