দীর্ঘ ছয় বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আগামী ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসজুড়ে উৎসবের আমেজ, একই সাথে চলছে নানা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। গত মঙ্গলবার থেকে মনোনয়নপত্র বিতরণ শুরু হওয়ার পর থেকেই ছাত্র সংগঠন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্যানেল চূড়ান্ত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এখন পর্যন্ত অন্তত সাতটি প্যানেল এবারের ডাকসু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ক্যাম্পাসের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের আভাস দিচ্ছে।
২০১৯ সালের নির্বাচনের পর দীর্ঘ বিরতি এবং সাম্প্রতিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট এবারের ডাকসু নির্বাচনকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রচলিত দলীয় ছাত্র রাজনীতির প্রতি একধরনের অনাস্থা এবং পরিবর্তনের পক্ষে জোরালো মনোভাব দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ছাত্র সংগঠনগুলোকেও চিরাচরিত কৌশল থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে প্যানেল সাজাতে হচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে বেশ কয়েকটি নতুন প্যানেল গঠিত হওয়ায় এবারের নির্বাচনী লড়াই হবে বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। নির্বাচনী মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য বিভিন্ন সংগঠন নিজেদের মতো করে গুছিয়ে নিচ্ছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল একটি শক্তিশালী প্যানেল দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের এক নম্বর জয়েন্ট সেক্রেটারি মমিনুল ইসলাম জিসান, ঢাবি শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস ও সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন শীর্ষ পদে লড়তে পারেন। এর বাইরে দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন-এমন ‘ক্লিন ইমেজের’ ছাত্রনেতাদের নিয়ে ছাত্রদলের প্যানেল গঠিত হবে। তবে প্যানেলের নাম এখনো ঠিক হয়নি।
ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ সম্ভাব্য পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করে অন্যদের চেয়ে খানিকটা এগিয়ে রয়েছে। তাদের প্যানেলে ভিপি পদে ইয়াছিন আরাফাত ও জিএস পদে খায়রুল আহসান মারজান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির নিজস্ব ব্যানারে নির্বাচনে আসবে কি না, তা স্পষ্ট না হলেও তাদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রীয় নেতা আবু সাদিক কায়েম ও ঢাবি শাখার সভাপতি এস এম ফরহাদের নাম শোনা যাচ্ছে। তারাও এখনো প্যানেলের নাম চূড়ান্ত করতে পারেননি।
অন্য দিকে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের প্যানেল থেকে ভিপি পদে নির্বাচন করবেন সংগঠনটির ঢাবি শাখার আহ্বায়ক আবদুল কাদের। জিএস পদে নির্বাচন করবেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক আবু বাকের মজুমদার। তবে এজিএস ও অন্য পদগুলোয় কারা প্রার্থী হবেন সেটি এখনো ঠিক হয়নি। এটি নিয়ে নিজেদের মধ্যে দরকষাকষি করছেন শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। আলোচনায় রয়েছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব জাহিদ আহসান ও মুখ্য সংগঠক তাহমীদ আল মুদ্দাসির চৌধুরী। তারাও প্যানেলের নাম ঠিক করতে পারেননি।
এ দিকে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর মোর্চা গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট থেকেও একটি পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দেয়া হবে, যেখানে ছাত্র ইউনিয়নের মেঘমল্লার বসু, বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর জাবির আহমেদ জুবেল এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের মোজাম্মেল হকের মতো নেতারা শীর্ষ পদগুলোতে থাকতে পারেন।
প্রচলিত এসব রাজনৈতিক ধারার বাইরেও বেশ কয়েকটি প্যানেল সাধারণ শিক্ষার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে। ‘ডাকসু ফর চেঞ্জ’ স্লোগান নিয়ে ছাত্র অধিকার পরিষদ সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লার নেতৃত্বে একটি প্যানেল আসছে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম মুখপাত্র উমামা ফাতেমার নেতৃত্বে গঠন হতে যাওয়া ‘শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেলটি নিয়ে। এই প্যানেলে ঢাবি সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মহিউদ্দিন মুজাহিদের মতো পরিচিত মুখ যুক্ত হওয়ায় এটিকে শক্তিশালী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংসদের আহ্বায়ক জামালুদ্দিন মুহাম্মদ খালিদের নেতৃত্বে আরো একটি প্যানেল গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এসব প্যানেলের বাইরেও একাধিক শক্তিশালী প্রার্থী স্বতন্ত্রভাবে শীর্ষ পদগুলোতে লড়বেন বলে জানা গেছে, যা নির্বাচনী সমীকরণকে কিছুটা জটিল করে তুলেছে।
এবারের ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল বহুলাংশে নির্ভর করছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামতের ওপর। গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসে যেহেতু দলীয় রাজনীতির প্রতি একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, তাই যে প্যানেল বা প্রার্থী নিজেদেরকে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন, তারাই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরিচিত মুখদের নিয়ে গঠিত ‘শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেলটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোট আকর্ষণ করার সম্ভাবনা রাখে। তবে ছাত্রদল ও বামপন্থী জোটের ছাত্র সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক ভিত্তিকেও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সব মিলিয়ে কোন প্যানেল ডাকসুর নেতৃত্বে আসবে, তা নির্ধারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সচেতন রায়ই মূল ভূমিকা পালন করবে।
ডাকসু নির্বাচন কমিশনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন চাচ্ছে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করার। সবাই সমানভাবে সুযোগ পাবে, সমানভাবে প্রচার করবে। এটি হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের চাওয়া। এখন যে জটিলতাটা তৈরি হয়েছে এটি হচ্ছে প্রশাসন এবং ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে। সেগুলো নিয়ে একটা মিটিং হয়েছে, প্রয়োজনে আরো মিটিং হবে। আমার মনে হয় অচিরেই এটার সমাধান হয়ে যাবে।’



