অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
সূচকের বড় উন্নতির পরদিন ফের সংশোধনের কবলে পড়েছে পুঁজিবাজার। গতকাল বুধবার দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সংশোধন ঘটে। আগের দিনের ধারাবাহিকতায় সূচকের বড় উন্নতিতে দিন শুরু করলেও তা বেশিক্ষণ টেকেনি। বেলা ১টার পরই বাজারে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হতে থাকে যা নি¤œমুখী করে তোলে সূচককে। একই সাথে গতি হারায় বাজারগুলো। দিনের বাকি সময় এ চাপ আর সামলে উঠতে পারেনি বাজারগুলো। দিনশেষে প্রধান বাজারটিতে সব ক’টি সূচকের অবনতি ঘটে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বাজার আচরণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারিদের দ্রুত মুনাফা তুলে নেয়ার প্রতিযোগিতাকেই দায়ী করছেন। তাদের মতে, এ মুহূর্তে বাজারে মুনাফা তুলে নেয়ার এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলছে যা বাজারের স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত করছে। এটা ঠিক এখনো অনেকে বাজারকে পুরোপুরি আস্থায় আনতে পারছেনা। তাই মূল্যস্তর কিছুটা বাড়তেই সবাই মুনাফা তুলে নিতে সক্রিয় হয়। এতে যে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হয় বাজারের গতি রুদ্ধ করে।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৬ দশমিক ২৫ পয়েন্ট হ্রাস পায়। ৫ হাজার ৯০৩ দশমিক ৫৩ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বিকেলে লেনদেনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৮৯৭ দশমিক ২৭ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৪ দশমিক ০৭ ও ১ দশমিক ৮১ পয়েন্ট। তবে সংশোধন সত্ত্বেও দেশের দ্বিতীয় পুুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সব সূচকই কমবেশি উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। এখানে সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৩৭ দশমিক ৮৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায় গতকাল। দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে সিএসই-৩০ ১৯ দশমিক ৬৯ ও সিএসসিএক্স সূচক ১১ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়।
গতকাল দুই বাজারেই লেনদেনের অবনতি ঘটে। ঢাকা স্টক এক হাজার ৭৩ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৪২ কোটি টাকা কম। মঙ্গলবার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ১১৫ কোটি টাকা। তবে লেনদেনের বড় অবনতি ঘটে চট্টগ্রাম স্টকে। এখানে আগের দিনের ৭১ কোটি টাকা থেকে ১৭ কোটিতে নেমে আসে লেনদেন।
এ দিকে বাজারে তারল্য বাড়াতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ‘বিএসইসি (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫’ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ব্যাংক, বীমা ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) শেয়ারে মার্জিন অর্থায়নের ক্ষেত্রে ‘পিই রেশিও’র পরিবর্তে ‘পিবি রেশিও’ চালুর প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে এ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও বাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ায় ‘পিবি রেশিও’ বাতিলের চিন্তা করছে কমিশন।
বিএসইসির সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংক, এনবিএফআই ও সাধারণ বীমা খাতে ‘পিবি রেশিও’ না রাখার সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে পরীক্ষামূলকভাবে জীবনবীমা খাতে এটি রাখার বিষয়ে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে। গত ১৯ জুলাই মার্জিন রুলসের সংশোধিত খসড়া বিধিমালা প্রকাশ করে সংশ্লিষ্টদের মতামত, পরামর্শ ও আপত্তি আহ্বান করে বিএসইসি। নির্ধারিত দুই সপ্তাহের সময়সীমা শেষ হয়েছে। এখন পাওয়া মতামতগুলো কমিশন সভায় পর্যালোচনা করা হবে। এরপর বিধিমালা চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, খসড়া বিধিমালায় ব্যাংক, বীমা ও এনবিএফআই ছাড়া অন্যান্য কোম্পানির পিই রেশিও ৩০-এর বেশি হলে মার্জিন ঋণের জন্য শেয়ারটি অযোগ্য বিবেচনার প্রস্তাব করা হয়েছে। জনমতের ভিত্তিতে এই সীমা বাড়িয়ে ৪০ করার চিন্তা করছে কমিশন। এতে আরো বেশি কোম্পানি মার্জিন সুবিধার আওতায় আসবে। এ ছাড়া বর্তমানে গ্রাহকের ইকুইটি ৭৫ শতাংশের নিচে নামলে মার্জিন কল দেয়ার বিধান রয়েছে। সংশোধিত প্রস্তাবে এই সীমা ৭০ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। একই সাথে মার্জিন কলের পর প্রয়োজনীয় ইকুইটি পুনরুদ্ধারে তিন কার্যদিবস সময় দেয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
কমিশন এখন ইকুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নামলে আগাম নোটিশ দিয়ে শেয়ার বিক্রির সুযোগ এবং ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে আগাম নোটিশ ছাড়াই শেয়ার বিক্রির বিধান যুক্ত করার কথা ভাবছে। তবে ব্রোকারেজ হাউজের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন সিইও ফোরাম বিক্রির সীমা ৪০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবিত বিধিমালায় স্টকব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক ও পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপকদের মূলধন বা নিট সম্পদের সর্বোচ্চ পাঁচগুণ পর্যন্ত মার্জিন ঋণ দেয়ার সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে এই সীমা তিনগুণ। ফলে ১০০ টাকা মূলধনের বিপরীতে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫০০ টাকা হতে পারে।
এ ছাড়া মার্জিন ঋণের জন্য গ্রাহকের বিও হিসেবে ন্যূনতম সিকিউরিটিজের পরিমাণ পাঁচ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে তিন লাখ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে ‘এ’ ক্যাটাগরির শেয়ারের পাশাপাশি ‘বি’ ক্যাটাগরির পাঁচ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানির শেয়ারে মার্জিন সুবিধা রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরির সব কোম্পানির শেয়ারে মার্জিন ঋণের সুযোগ দেয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। তবে ‘জেড’, ‘এন’ ও ‘জি’ শ্রেণীর কোম্পানি, এসএমই মার্কেটের শেয়ার এবং এটিবি ও ওটিসি প্ল্যাটফর্মের সিকিউরিটিজ মার্জিন ঋণের বাইরে থাকবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিধিমালা সহজ হলে বাজারে তারল্য ও লেনদেন বাড়তে পারে। তবে তারা মনে করেন, কম লভ্যাংশ দেয়া ‘বি’ ক্যাটাগরির শেয়ারে মার্জিন সুবিধা এবং পিই রেশিওর সীমা ৪০ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁঁকি সৃষ্টি করতে পারে। দুর্বল কোম্পানির শেয়ারে অতিরিক্ত মার্জিন ঋণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির মাত্রা বাড়াতে পারে। এমনকি এটি একপর্যায়ে ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। ২০১০ সালের পুঁজিবাজার বিপর্যয়ের পর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এসব কারণে দীর্ঘদিন ভুগেছে।


