সারের কাগুজে মজুদ বাস্তবে সঙ্কট

অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী আমলের সার সিন্ডিকেট গত দেড় বছরে আরো বিস্তৃত হয়েছে। সিন্ডিকেটের ছায়া পড়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয়ের সার বিভাগ কিংবা বিএডিসির কর্মকর্তাদেরও কেউ কেউ কলকাঠি নাড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

কাওসার আজম
Printed Edition

  • ডিলারদের ওপর দায় চাপিয়ে দায়িত্ব সারছে কৃষি মন্ত্রণালয়
  • বাড়তি দামে বাড়ছে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়
  • নজরদারি দুর্বল, মন্ত্রণালয়েও সিন্ডিকেটের ছায়া!

বোরো মৌসুমের ভরা সময়ে মাঠে যখন চারা রোপণ আর সেচের কাজে কৃষকের ব্যস্ততা, তখনই নতুন দুশ্চিন্তা চেপে বসেছে তাদের কাঁধে। সরকারি হিসাবে গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুদ থাকলেও বাস্তবে মাঠপর্যায়ে দেখা দিয়েছে সঙ্কট। কৃষি মন্ত্রণালয় কিংবা অধীনস্থ দফতরের সংশ্লিষ্টরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সার সঙ্কটের কথা স্বীকার করছেন না। আবার স্বীকার করলেও দাবি করছেন ‘কৃত্রিম সঙ্কট’। অথচ সরকারের নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে এক দিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্য দিকে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও দেখা দিচ্ছে শঙ্কা। গত প্রায় দুই বছর ধরে কৃষককে বাড়তি দামে সার কিনতে হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টরা পর্যাপ্ত মজুদের তথ্য দিলেও নির্ধারিত মূল্যে সার পাচ্ছেন না কৃষক। সারের অতিরিক্ত দামে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে নেই শক্তিশালী নজরদারি। উপযুক্ত ব্যবস্থা না নিয়ে ডিলারদের ওপর দায় চাপিয়েই দায়িত্ব সারছে কৃষি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী আমলের সার সিন্ডিকেট গত দেড় বছরে আরো বিস্তৃত হয়েছে। সিন্ডিকেটের ছায়া পড়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয়ের সার বিভাগ কিংবা বিএডিসির কর্মকর্তাদেরও কেউ কেউ কলকাঠি নাড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা যায়, দেশের প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়। চলতি মৌসুমে সোয়া দুই কোটি টনের বেশি চাল উৎপাদিত হয়, যা সারা বছরের চাল সরবরাহের প্রধান ভরসা। বোরো পুরোপুরি বীজ, সার ও সেচনির্ভর। ফলে উপকরণের দাম বাড়লেই সরাসরি বাড়ে উৎপাদন ব্যয়। শুধু ধান নয়, এ সময় আলু, পেঁয়াজ, সরিষা ও বিভিন্ন সবজির উৎপাদনও চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকে। তাই সারের বাজারে অস্থিরতা মানেই পুরো খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা।

কিন্তু সরকারি হিসাবে সারের কোনো সঙ্কট নেই। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত মজুদ রয়েছে সাড়ে পাঁচ লাখ টন ইউরিয়া, তিন লাখ ২১ হাজার টন টিএসপি, পাঁচ লাখ ৩৩ হাজার টন ডিএপি এবং তিন লাখ ৩১ হাজার টন এমওপি। উপজেলা পর্যায়েও চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন।

সরকার নির্ধারিত এক বস্তা ইউরিয়ার দাম এক হাজার ২৫০ টাকা হলেও কৃষককে গুনতে হচ্ছে এক হাজার ৪৫০ থেকে এক হাজার ৪৬০ টাকা। ডিএপি ও টিএসপির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। কেজি হিসেবে ইউরিয়ার নির্ধারিত দাম ২৭ টাকা হলেও দুই থেকে পাঁচ টাকা বেশি নেয়া হচ্ছে। টিএসপির নির্ধারিত ২৭ টাকার বিপরীতে তিন থেকে ১৩ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেয়া হচ্ছে। ২১ টাকার ডিএপি বিক্রি হচ্ছে সাত থেকে ১৫ টাকা বেশি দামে। ২০ টাকার এমওপি কিনতে হচ্ছে তিন থেকে আট টাকা বেশি দিয়ে।

সার সঙ্কটের কথা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অস্বীকার করে আসছে কৃষি মন্ত্রণালয়। কৃষি সচিব একাধিকবার বলেছেন, এই মুহূর্তে সারের কোনো ঘাটতি নেই। কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে সার সঙ্কটের জন্য আমদানিকারক ও ডিলারদের দায় দিয়ে আসছেন। তাদের অভিযোগ, উৎপাদনের ভরা মৌসুমে একটি চক্র কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে অতিরিক্ত দাম আদায় করছে। সরকারি গুদামে সার থাকলেও খুচরা পর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, ডিলার ও আমদানিকারকরা পাল্টা অভিযোগ তুলছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার উইং ও বিএডিসির বিরুদ্ধে। আমদানিকারকরা বলছেন, বিগত দুই বছরে যথাসময়ে সার আমদানি করতে ব্যর্থ হয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এ কারণে সার সরবরাহে ভরা মৌসুমে ঘাটতি তৈরি হয়। দায় চাপানো হয় ব্যবসায়ীদের উপর। ডিলাররা বলছেন, সরবরাহ কম থাকায় বেশি দামে তাদেরও সার কিনতে হয়। এ জন্য কৃষক পর্যায়ে বেশি দামে বিক্রি করতে তারা বাধ্য হচ্ছেন। এভাবে কৃষি মন্ত্রণালয়, সার আমদানিকারক ও ডিলাররা একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ তুললেও সমাধানে নেই কার্যকর উদ্যোগ। মাঝে মধ্যে অভিযানের খবর পাওয়া গেলেও তার স্থায়ী প্রভাব পড়ছে না বাজারে।

সার বরাদ্দ বিশ্লেষণেও কিছু অসঙ্গতি দেখা গেছে। চলতি ফেব্রুয়ারিতে টিএসপি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৭৫ হাজার ৫০০ টন, যেখানে গত বছর ছিল ৮০ হাজার ৮০০ টনের বেশি। ডিএপি বরাদ্দ এক লাখ ৩৭ হাজার ৩০০ টন, গত বছর ছিল এক লাখ ৪৪ হাজার টনের বেশি। এমওপির বরাদ্দ বেড়ে হয়েছে ৬৭ হাজার ৮০০ টন, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দুই হাজার টন বেশি। সংশ্লিষ্টদের মতে, পার্থক্য খুব বড় না হলেও ভরা মৌসুমে সামান্য ঘাটতিও বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

এর আগে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পরই ভরা মৌসুমে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। তখনও সরকার সারের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। এবার সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। কৃষি মন্ত্রণালয়ে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমন্বিত নজরদারি থাকলে এখনও বাড়তি দামে সার বিক্রি বন্ধ করা সম্ভব।

শুধু বোরো নয়, গত আমন মৌসুমেও দেড় কোটি টনের বেশি চাল উৎপাদন হয়েছে। প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ফলন দাঁড়াতে পারে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ টনে। ভালো ফলন হলেও তখনো কৃষককে বাড়তি দামে সার কিনতে হয়েছিল। কিছু ডিলারকে জরিমানা করা হলেও বাজারদর কমেনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষির উৎপাদন ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকলে কৃষক ধীরে ধীরে চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলমের ভাষায়, উপকরণ কিনতে অতিরিক্ত খরচ হলে তা খাদ্য নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি আঘাত হানবে। ইতোমধ্যে অনেক কৃষক ধানের বদলে ভুট্টা চাষে ঝুঁকছেন, কারণ সেখানে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া যায়। ধানের দামে অনিশ্চয়তা ও উপকরণের বাড়তি ব্যয় মিলিয়ে ঝুঁকি বাড়ছে।

কৃষি বিভাগ বলছে, উৎপাদন মৌসুমের শুরু হয় সবজি, সরিষা, আলু ও পেঁয়াজের আবাদ দিয়ে, যার শেষ হয় বোরো ধান ঘরে তোলার মাধ্যমে। এই পুরো সময়জুড়ে সারের চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে। তাই বরাদ্দ ও মজুদের কাগুজে হিসাব নয়, মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকি জরুরি।

কৃষকদের প্রশ্ন, যদি গুদামে সার থাকে, তবে তারা কেন নির্ধারিত দামে পাচ্ছেন না। কেন একই পণ্যের জন্য অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে। সিন্ডিকেটমুক্ত করার নামে নতুন কোনো সিন্ডিকেট তৈরি হচ্ছে কি না- সে প্রশ্নও উঠছে খোদ মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধেই।

মেহেরপুর সদর উপজেলার উজলপুর গ্রামের কৃষক জাহিদুল ইসলাম জানান, সবজির ভরা মৌসুমে সারের সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করেছিল। বর্তমানে মাঠে সবজিসহ অন্যান্য চাষ সম্পন্ন হওয়ায় সারের চাহিদা কমে গেছে। তার পরও বোরো ধান চাষের জন্য খুচরা ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) টিএসপি এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৭০০ টাকা দরে এবং ডিএপি এক হাজার ৪০০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। চলতি মৌসুমে তিনি সাড়ে তিন বিঘা বোরো ধানের চাষ করেছেন বলে জানান। ডিলারদের কাছে লাইনে দাঁড়িয়ে সার কিনতে গিয়ে একদিকে সময় নষ্ট হয়, অন্যদিকে চাহিদার তুলনায় অর্ধেক সারও পাওয়া যায় না।

মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ সনজীব মৃধা কৃষকদের অভিযোগের বিষয়ে বলেন, সার সঙ্কট একসময় ছিল, তবে বর্তমানে ইউরিয়া এবং নন ইউরিয়া কোনো সারের সঙ্কট নেই। নিবন্ধিত ডিলারের কাছে গেলেই সরকার নির্ধারিত দামে সার নিতে পারবেন। তবে এখনও কিছু খুচরা ব্যবসায়ী কৃষকদের কাছ থেকে বেশি দাম নিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আগামী মার্চ-এর পর আর খুচরা ব্যবসায়ীরা সার বিক্রি করতে পারবে না। তখন এ সমস্যা দূর হবে বলে আশা করছি।

গাইবান্ধা সদরের নতুন গ্রামের কৃষক আরিফ মিয়া এবার বোরো ধান চাষ করেছেন ৮ বিঘা জমিতে। মৌসুমের শুরুতে সরকার নির্ধারিত দামে সার কিনতে পেরেছেন। তবে মৌসুমের মাঝামাঝি এসে কেজিপ্রতি তিন থেকে ছয় টাকা বেশিতে ইউরিয়া সার কিনতে হচ্ছে তাকে। এ ছাড়া টিএসপি, ডিএপি, এমওপি সার কিনতে গিয়ে কেজিপ্রতি ৮ থেকে ১০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। সেই সাথে শ্রমিক ও সেচ খরচ বেড়ে যাওয়ায় বোরো চাষাবাদে এবার লোকসানের শঙ্কায় আছেন এ কৃষক।

বোরো মৌসুমের শুরুতে আরিফ মিয়ার মতো গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে মাঠে কৃষকের ব্যস্ততা শুরু হয়েছে। সেই ব্যস্ততার ভেতরেই জমছে উদ্বেগ। কৃষকের স্বস্তি নেই। কারণ সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক আবাদ কমানোর কথা ভাবছেন। জেলার দারিয়াপুরের কৃষক নুর খালেকুজ্জামান বলেন, পরিবহন ঠিকাদার ও ডিলারের একটি চক্র অবৈধভাবে সার মজুদ করে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করছে। সরকারি গুদামে সার থাকলেও খুচরা পর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে বাড়তি দাম আদায় করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে জেলার ডিলার রায় অ্যান্ড সন্স ট্রেডার্সের নিমাই চন্দ্র রায় বলেন, চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ দেয়া হয়, তবে মাঠে আরো চাহিদা বেশি হওয়ায় অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সদর উপজেলার কয়েকজন খুচরা সার বিক্রেতা বলেন, ‘ইচ্ছে করে সারের দাম বেশি নেয়া হয় না। ডিলাররা আমাদের কাছে বেশি দাম রাখায়, বাধ্য হয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করছি’।

এ সব বিষয়ে গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক আতিকুল ইসলাম বলেন, জেলায় সারের সঙ্কট নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীরবে কৃষকের পকেট কাটা হলে তার প্রভাব শুধু একটি মৌসুমে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বছরজুড়ে বাজারে চাল, আলু, পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্যের দামে তার প্রতিফলন দেখা দিতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি রক্ষায় তাই এখনই প্রয়োজন কঠোর নজরদারি, স্বচ্ছ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বাস্তব প্রয়োগ। না হলে কাগজে মজুদ থাকলেও মাঠে সারের সঙ্কটই হয়ে উঠতে পারে আগামী দিনের বড় সঙ্কটের পূর্বাভাস।

(মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিরা এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন)।