২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গণ-অভ্যুত্থানে পরিচিত মুখগুলোর নেতৃত্বে বিগত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি দলটির যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার এক বছরে আন্দোলনভিত্তিক একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে নির্বাচনী রাজনীতিতে নিজেদের জায়গা করে নেয়ার চেষ্টা করেছে দলটি। তবে সামনে পথ কতটা সহজ তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
এনসিপির নেতারা বলছেন, দলটির শেকড় গণ-অভ্যুত্থানে। ২০১৩ সালের হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ভ্যাটবিরোধী কর্মসূচি, এসব ধারাবাহিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকেই নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের চিন্তা।
তারা বলছেন জুলাই অভ্যুত্থান ছিল সেই ধারার চূড়ান্ত প্রকাশ। মুক্তিযুদ্ধ ও চব্বিশের স্পিরিটকে সামনে রেখে রাজনীতিকে নিয়ে আগাতে হবে বলে জানিয়েছেন দলটির সর্বোচ্চ নেতারা। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, এক বছরে এনসিপি নানা বাধার মুখে পড়েছে। দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র, সংস্কারবিরোধী শক্তির তৎপরতা, সবকিছু মোকাবেলা করেই এগোতে হয়েছে।
নাহিদ জানান, চ্যালেঞ্জ ছিল, আছে। তবে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সক্ষমতাও তৈরি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠার এক বছরের মাথায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় এনসিপি। সাংগঠনিক কাঠামো পুরোপুরি মজবুত না হলেও ৩২টি আসনে প্রার্থী দেয় দলটি। প্রায় ২১ লাখ ভোট পেয়ে ছয়টি আসনে জয় পায়। ভোট ও আসন দুই ক্ষেত্রেই দল হিসেবে তৃতীয় অবস্থানে উঠে আসে তারা।
ঢাকা-১১ আসন থেকে জয়ী হন নাহিদ ইসলাম। রংপুর-৪ থেকে সদস্যসচিব আখতার হোসেন। কুমিল্লা-৪ থেকে হাসনাত আব্দুল্লাহ, নোয়াখালী-৬ থেকে আবদুল হান্নান মাসউদ, কুড়িগ্রাম-২ থেকে আতিকুর রহমান মুজাহিদ এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ থেকে আব্দুল্লাহ আল আমিন নির্বাচিত হন।
সংখ্যায় ছয়জন কম হলেও এনসিপি এটিকে বড় অর্জন বলছে। দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, আন্দোলনের শক্তিকে ভোটে রূপ দেয়াটা সহজ নয়। আমরা সে জায়গায় একটি ভিত্তি তৈরি করতে পেরেছি।
ট্রাম্প কার্ড : আওয়ামী বিরোধিতা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এনসিপির রাজনীতির বড় শক্তি হলো আওয়ামী লীগবিরোধিতা। গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও জনঅসন্তোষের প্রেক্ষাপটে এনসিপি নিজেদের বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছে। তবে শুধু বিরোধিতার ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি রাজনীতি করা কঠিন এমন মতও রয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইতিবাচক কর্মসূচি, সুস্পষ্ট নীতি এবং শক্ত সাংগঠনিক কাঠামো ছাড়া বড় দলে পরিণত হওয়া সম্ভব নয়।
সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম মনে করেন, তরুণ দল হিসেবে এনসিপি খারাপ করেনি। তবে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সে তুলনায় দলটি নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারেনি। তিনি বলেন, জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে হলে তৃণমূলভিত্তিক বিস্তার দরকার। শুধু শহরকেন্দ্রিক বা আন্দোলনভিত্তিক রাজনীতি যথেষ্ট নয়। বিশ্লেষকেরা তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা বলছেন- ১. সাংগঠনিক বিস্তার : জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শক্ত কমিটি গঠন। আদর্শিক স্পষ্টতা : সংস্কার, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, এসব বিষয়ে পরিষ্কার অবস্থান। ৩. অভ্যন্তরীণ ঐক্য : নতুন দলে নেতৃত্বসংক্রান্ত মতভেদ দ্রুত প্রকাশ পায়। তা সামাল দেয়া জরুরি।
সংসদে ভূমিকা কেমন হবে?
ছয়জন সংসদ সদস্য নিয়ে এনসিপি কতটা কার্যকর বিরোধী ভূমিকা রাখতে পারবে, সেটিও এখন আলোচনায়। দলটির নেতারা বলছেন, সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ইস্যুভিত্তিক অবস্থান। তারা দুর্নীতি, মানবাধিকার ও প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে সক্রিয় থাকবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, সংসদে দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক উপস্থিতি বজায় রাখতে পারলে এনসিপি নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করতে পারবে। অন্যথায় বড় দলের ছায়ায় চাপা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।
ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি এনসিপি?
প্রশ্নটি এখন রাজনীতির অঙ্গনে ঘুরছে, এনসিপি কি বড় দলে পরিণত হতে পারবে? নাকি প্রাথমিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে ধীরে ধীরে প্রাসঙ্গিকতা হারাবে?
সম্ভাবনার পক্ষে যুক্তি আছে। তরুণ ভোটারদের একটি অংশ এখনো পরিবর্তনের পক্ষে। গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি খুব পুরনো হয়নি। আওয়ামী লীগবিরোধী ভোটের একটি অংশও এখনো নতুন বিকল্প খুঁজছে।
আবার সংশয়ের জায়গাও কম নয়। আন্দোলনের আবেগ সময়ের সাথে কমে আসে। সংগঠন শক্ত না হলে ভোটব্যাংক টেকসই হয় না। বড় দলে রূপ নিতে হলে অর্থ, জনবল ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব, সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।
সামনে কোন পথ : এনসিপির সামনে এখন তিনটি স্পষ্ট পথ খোলা
সংগঠন গড়ে তোলা : স্থানীয়পর্যায়ে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করা। ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি : শুধু বিরোধিতা নয়, বিকল্প নীতি প্রস্তাবনা দেয়া। জোট রাজনীতি : সমমনা দলগুলোর সাথে সমন্বয় করে চলা।
নাহিদ ইসলাম বলছেন, বিপ্লব, বিকল্প ও বিনির্মাণ- এই তিন ধারায় আমরা এগোতে চাই। তিনি জানান, এনসিপি শুধু একটি দল নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ধারা।
এক বছরে এনসিপি আন্দোলন থেকে সংসদে পৌঁছেছে। ছয়টি আসন তাদের জন্য প্রতীকী অর্জন। তবে বড় দলে পরিণত হওয়ার লড়াই এখনো বাকি। আওয়ামী লীগবিরোধিতা তাদের বড় শক্তি। কিন্তু টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন সুসংগঠিত কাঠামো, স্পষ্ট নীতি ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচি। এনসিপি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না- তার উত্তর নির্ভর করছে আগামী কয়েক বছরের ওপর। স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সংসদে ভূমিকা এবং তৃণমূল বিস্তার- এই তিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে দলটি রাজনীতিতে স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারে। অন্যথায় ইতিহাসে অনেক আন্দোলনভিত্তিক দলের মতো তারাও হয়তো ক্ষণিকের আলো হয়ে থাকবে।



