বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফ্যাসিবাদের হুমকি এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। ভারতে পলায়নরত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সভানেত্রী এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দলটির নেতাকর্মীদের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও কার্যক্রমে রাজপথ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তবে তাদের যেকোনো আইনবহির্ভূত বা চক্রান্তমূলক কার্যক্রম মোকাবেলায় দেশপ্রেমিক শক্তির প্রস্তুতি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী।
এমন পরিস্থিতিতে ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারের পুনরুত্থান রুখতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার ‘জাতীয় ঐক্যের’ ডাক দেশজুড়ে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে। দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলও এই আহ্বানে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার পালাবদল বা নির্বাচনের রাজনীতিতে দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ও মতামতভিত্তিক বিরোধ থাকা স্বাভাবিক।
তবে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জুলাই বিপ্লবের চেতনা ধারণ এবং স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের অবসান- এই মৌলিক স্তম্ভগুলোতে কোনো আপস করা চলবে না। এই ঐক্য ধরে রাখতে পারলে বাংলাদেশ অচিরেই একটি টেকসই, স্বনির্ভর এবং সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
তবে সংসদে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ঐক্যের যে আহ্বান, তা অর্থবহ করতে হলে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে ‘জুলাই সনদ’ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় এই আহ্বান কেবল আনুষ্ঠানিক বক্তৃতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
সূত্র মতে, চলতি মাসে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় ঐক্য যেকোনো মূল্যে অটুট রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। একই সুর শোনা গেছে সংসদে বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতা ডা: শফিকুর রহমানের কণ্ঠেও। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, চিফ হুইপ, বিরোধীদলীয় হুইপসহ সংসদ সদস্যরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একই সুরে কথা বলেছেন যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন সমঝোতার দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
গত ১৫ জুলাই অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান জাতীয় ঐক্যের এই রূপরেখা স্পষ্ট করে জাতির সামনে তুলে ধরেন। এক দূরদর্শী বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আর যাতে কখনো কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এবং প্রিয় মাতৃভূমি যাতে কোনো শক্তির তাঁবেদারি রাষ্ট্রে পরিণত না হয়- এই প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এক দৃঢ় জাতীয় ঐক্য রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, এই ঐক্য যেকোনো মূল্যে অটুট থাকবে, ইনশাআল্লাহ।’
সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী আরো যোগ করেন, বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুযায়ী সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে নানা নীতিগত ইস্যুতে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। তবে সেই পার্থক্য যেন কখনো শত্রুতা, হিংসা বা প্রতিশোধের রাজনীতিতে রূপ না নেয়। বিগত স্বৈরাচারী শাসনের হিংসাত্মক রাজনীতির ইতি টেনে দেশে প্রকৃত ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করাই বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য। রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘জুলাই সনদ’ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আয়োজিত ‘গণ-অভ্যুত্থানের টার্নিং পয়েন্ট’ শীর্ষক আলোচনা সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা রক্ষা করার একমাত্র উপায় হলো জনগণের ইস্পাতকঠিন ঐক্য। ফ্যাসিবাদকে পুনরুজ্জীবিত করার যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে দেশের সব প্রগতিশীল ও গণতন্ত্রকামী শক্তিকে রাজপথে সোচ্চার থাকতে হবে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ও সাবেক প্রোভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচার মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী যে ঐক্যের ডাক দিয়েছেন, তা সময়ের দাবি। তার এই আহ্বানকে সবার সম্মান জানানো উচিত। বিরোধী দলসহ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সব শক্তির উচিত এতে সাড়া দেয়া। ফ্যাসিস্টরা এখনো ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে, তাই কেবল এই ইস্যুতে নয়, দেশের প্রতিটি কল্যাণমূলক পদক্ষেপে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে জাতীয় ঐক্য থাকা জরুরি।’
অন্য দিকে বিরোধী জোটের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর ‘প্রতিহিংসার বদলে ন্যায়পরায়ণতার’ নীতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিগত আমলের অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান। পাশাপাশি জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী দলগুলো সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় ভূমিকা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের ওপর ইতিবাচক চাপ সৃষ্টি এবং আগামী নির্বাচনের জন্য জনমত গড়ে তুলতে ইতোমধ্যে ১১ দলীয় জোটের ব্যানারে রাজধানীসহ সারা দেশে মিছিল, সমাবেশ ও নানা কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, সাবেক এমপি ও ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে কেবল মুখে ঐক্যের কথা বললে হবে না, তা বাস্তবে রূপ দিতে হবে। ফ্যাসিবাদ রুখতে হলে ব্যবস্থার (সিস্টেম) মৌলিক পরিবর্তন দরকার; তা না হলে পুরনো ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে অথবা নতুন ফ্যাসিবাদের জন্ম হবে। জনগণ গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের স্পষ্ট ম্যান্ডেট দিয়েছে। সরকারকে সেই জনরায়ের পূর্ণ সম্মান জানাতে হবে, তবেই প্রকৃত জাতীয় ঐক্য সম্ভব হবে।’
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘দেশের চলমান সঙ্কট মোকাবেলা ও রাষ্ট্র মেরামতের জন্য বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য অত্যন্ত জরুরি। কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর পক্ষে দেশকে স্বৈরতন্ত্র ও দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব নয়। সব গণতান্ত্রিক শক্তির সমঝোতার মাধ্যমেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ প্রসঙ্গে নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘মৌলিক ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলোতে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। বর্তমানে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা গেলেও, ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তনের ভীতি সবার মধ্যেই রয়েছে। অন্তত এই একটি জায়গায় দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য বিদ্যমান, যা অত্যন্ত ইতিবাচক।’



