শফিউল আযম বেড়া (পাবনা)
পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবাসন প্রকল্পের বহুল আলোচিত ‘বালিশকাণ্ড’কেও পেছনে ফেলেছে পাবনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের দুর্নীতির চিত্র। বহুতল ভবনের মূল নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ থাকলেও বাস্তবে অস্তিত্বহীন ও অনাবশ্যক ‘অবশিষ্টাংশ কাজের’ (রিমেইনিং ওয়ার্কস) ভুয়া দরপত্র আহ্বান করে প্রায় ২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা লোপাটের মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পাবনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ১০ তলা ভবনের জন্য ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার মূল দরপত্র আহ্বান করা হয়। কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাজিন কনস্ট্রাকশন। ২০২৭ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে ভবনটির কেবল ৯ তলার ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, মূল ভবনের অবকাঠামো শেষ হওয়ার আগেই চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি ‘অবশিষ্টাংশ কাজ’ হিসেবে ছয়টি নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) অনুযায়ী, কোনো চলমান বড় প্রকল্পের কাজ এভাবে ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করা বেআইনি। কেনাকাটা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন এড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে কাজ ভাগ-বাটোয়ারা করতেই প্রতিটি টেন্ডার পাঁচ কোটি টাকার নিচে রাখা হয়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, পাবনা গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীরের আহ্বান করা এক দরপত্রে হাসপাতাল ভবনের ‘এ’ ব্লকের ছাদে কাচের কাজের জন্য ধরা হয় চার কোটি ৯৬ লাখ ৮৮ হাজার ৯৫৫ টাকা। কাজ পেয়েছে টুঙ্গিপাড়ার যুবলীগ নেতা ও আ’লীগ আমলে নগর গণপূর্ত ঠিকাদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক দ্বীন ইসলামের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এসএ এন্টারপ্রাইজ। কাগজপত্রে এই বিল পরিশোধ করা হলেও বাস্তবে ছাদের কাচের কাজের কোনো অস্তিত্বই নেই। প্রতিষ্ঠানের মালিক দ্বীন ইসলাম জানান, তিনি শাহাদাত হোসেন নামে একজনকে লাইসেন্স ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন, কাজের অবস্থা তিনি জানেন না।
অন্য এক দরপত্রে (আইডি: ১২১৭৬১২) অতিরিক্ত আরসিসি কাজ ও ভিত্তি ইটের দেয়ালের জন্য চার কোটি ৯৮ লাখ ৯ হাজার টাকা ধরা হয়। কাজ না করেই বিল তুলে নেয় মেসার্স নূর কনস্ট্রাকশন। প্রতিষ্ঠানটি আরো একটি কাজ পায়, যার দরপত্র ছিল অতিরিক্ত ওভারহেড জলাধার ও শাটারিং সংক্রান্ত। এটি মূল দরপত্রের অন্তর্ভুক্ত হলেও কেবল কাগজ-কলমে প্রক্রিয়া দেখিয়ে চার কোটি ৯৮ লাখ টাকার বেশি বিল উত্তোলন করা হয়।
এ ছাড়া ল্যাবরেটরি ও আইসিইউতে ভিনাইল ফ্লোরিংয়ের নামে চার কোটি ৯৭ লাখ টাকা এবং ইটের দেয়াল গাথুনির নামে আরো প্রায় পাঁচ কোটি টাকার কাজ পায় বন্ধু কনস্ট্রাকশন। মসজিদ, মর্গ ও সাবস্টেশনের জন্য আইআর ইনফ্রাস্ট্রাকচার নামের অপর একটি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয় আড়াই কোটি টাকার কাজ। এসব কাজ মূল দরপত্রের অংশ হওয়া সত্ত্বেও আলাদা টেন্ডার দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিতর্কিত সাজিন কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের কর্ণধার শাহাদাত হোসেন এসব ‘নামসর্বস্ব’ কাজের মূল নিয়ন্ত্রক ছিলেন। এতে পাবনা গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাউদুদুর রহমান ও নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীরের সরাসরি যোগসাজশ রয়েছে। তবে বক্তব্য জানতে চাইলে তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি।
গণপূর্ত অধিদফতরের পপুলেশন প্রজেক্ট সেলের (পিপিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ কে এম সোহরাওয়ার্দী বলেন, বিষয়টি আমার নজরে নেই। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। অন্য দিকে পাবনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক ডা: আমজাদুল হক জানান, সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ পেলে প্রজেক্ট অফিস থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।



