বর্ষার রানী কেয়া

Printed Edition
বর্ষার রানী কেয়া
বর্ষার রানী কেয়া

শফিউল আযম বেড়া (পাবনা)

ফুলকে ভালোবাসে না এমন মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে বিরল। বাঙালির অতি পরিচিত ও ভালোবাসার এমন একটি ফুলের নাম কেয়া। কেয়া না ফুটলে কি বর্ষা হয়? এ কারণে কেয়াকে সাধারণত বর্ষার ফুল বলা হয়। অনেকে এ ফুলকে বর্ষার রানী বলে জানেন। এর সুগন্ধ মনকেও হরণ করে। কেয়া তার সুগন্ধের জন্যই প্রাচীনকাল থেকে সুপরিচিত।

কেয়া ফুল সাহিত্যপ্রেমীদের প্রিয়তা পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথ নানা নামে ডেকেছেন এ ফুলকে ‘কেতকীকেশরে কেশপাশ করো সুরভি’। অন্য কবিতায় লিখেছেন ‘তোমার ফাগুন দিনের বকুল চাঁপা/ শ্রাবণ দিনের কেয়া’। এ ফুলকে নিয়ে এমন অনেক কবিতা আছে- ‘বর্ষা এল ঝেঁপে/তরুলতা কেঁপে/কেওড়া কেয়ার বনে/উত্তাল হাওয়ার সনে।’ পল্লীকবি জসীম উদ্দিন লিখেছেন ‘আজিকের রোদ ঘুমায়ে পড়িয়া ঘোলাট-মেঘের আড়ে/কেয়া-বন পথে স্বপন বুনিছে ছল ছল জল-ধারে।’ যতীন্দ্রমোহন বাগচীর ভাষায় ‘শূন্য ঘরে/হিয়া গুমরিয়া মরে/স্মরি’ যত জীবনের ভুল/অকস্মাৎ তারি মাঝে/ধ্বনি কার কানে বাজে/চাই ফুল... চাই কেয়া ফুল।

কেয়া ফুল জৈষ্ঠ্য মাসে ফুটতে শুরু করে আষাঢ়-শ্রাবণ মাসজুড়ে ফোটে। এটির বেশি দেখা মেলে সেন্টমার্টিন ও সুন্দর বনে। নোনাপানির ধার ঘেঁষে শ্বাসমূলে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে কেয়াগাছ। দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নদী বা সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠে কেয়াবন। ইদানীং বেড়া উপজেলার ঢালারচর ইউনিয়নের চরঢালা গ্রামের কয়েকটি বাড়িতে এ ফুল দেখতে পাওয়া যায়। সৌখিন ফুলপ্রেমীরা বাগানে, ঘরের দক্ষিণা জানালার পাশে, বাড়ির আঙিনায় ছাদের টবে অতি যতেœ লাগিয়েছেন। আবার অনাদর আর অযতেœও আছে অনেকের বাড়িতে।

লক্ষণীয় বিষয় হলো এখানকার বেশির ভাগ ফুলই পুরুষ প্রজাতির সাদা রংয়ের এবং সুগন্ধযুক্ত। স্ত্রী কেয়ার রঙ সোনালি। যার নাম স্বর্ণ কেয়া। স্ত্রী ফুল থেকে আনারসের মতো ফল হয়, যা অনেকে খেয়ে থাকেন। এটা এক লিঙ্গিক ফুল। কেয়া গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। সাধারণত কাণ্ড থেকেই শাখাপ্রশাখা গজায়। পুরনো গাছে কাণ্ডের নিচে শেকড়ের ঝুরি বের হয়ে নতুন গাছের জন্ম নেয়। পাতা লম্বাটে আকারের। কিন্তু এখানকার গাছগুলোর পাতার দু’পাশ কাঁটামুক্ত। পাতাগুলো ৩-৪ মিটার লম্বা ও ৫-৬ সেন্টিমিটার চওড়া।

অঞ্চল ও ভাষাভেদে কেয়া ফুল বিভিন্ন নামে পরিচিত। বাংলাদেশে কেতকি, কেওড়া, স্বর্ণকেয়া, স্বর্ণপুষ্পী,পাংগুলা বলে ডাকা হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, মারাঠি, ওড়িয়া ও নেপালে কেতকী বলা হলেও তামিল ভাষায় কেয়াকে তলাই, মালয়ালমে কেইতা আর তেলেগুতে কেথকি বলা হয়। হিন্দিতে কেওড়া, পাকিস্তানে উর্দুতে কেয়ার নাম কেতকী। শ্রীলঙ্কায় কেয়াকে বলা হয় কাদোলু। অনেক অঞ্চলে কেয়া সুগন্ধি পাইন বা পান্ডান পাম হিসেবে পরিচিত।

কেয়া ইংরেজিতে ঝপৎবি ঢ়রহব বৈজ্ঞানিক নাম চধহফধহঁং ঋধংপরপঁষৎরং এটি চধহফধহঁং গণের উদ্ভিদ। কেয়া ফুল থেকে তৈরি সুগন্ধি কেওড়া তেল মাথার খুশকি দূর করে। প্রতিদিন শোবার আগে মাথায় মাখলে অনিদ্রা কেটে যায়। কেয়া বীজের রস পানির সাথে মিশিয়ে খেলে যকৃতের সমস্যায় ভালো উপকার পাওয়া যায়। ডায়াবেটিকস নিয়ন্ত্রণে রাখতে এর পাতার রস বিশেষ উপকারী। বাষ্পীভবন প্রক্রিয়ায় কেয়া ফুল থেকে বানানো হয় কেওড়া জল যা ভোজনরসিকদের রসনাবিলাসে ভূমিকা রাখে। কেওড়া জল ছাড়া বিরিয়ানি, পোলাও যেমন ঠিক জমে না, তেমনি কেক, মিষ্টি, পায়েস রান্নায়ও কেওড়ার এসেন্স নিয়ে আসে ভিন্নমাত্রা। তাইতো হিয়া মোর গুমরিয়ে কাঁদে কেয়া সনে।