শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধে শিল্পগোষ্ঠীর সম্পত্তি বিক্রির সিদ্ধান্ত

নাসা গ্রুপে শুরু বেক্সিমকো পরের তালিকায়

শাহ আলম নূর
Printed Edition

শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বকেয়া বেতন ও সার্ভিস বেনিফিট পরিশোধে বেক্সিমকো গ্রুপ ও নাসা গ্রুপসহ একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি বিক্রির পথে হাঁটছে সরকার। আদালতের নির্দেশনা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইতোমধ্যে নাসা গ্রুপের শেয়ার বিক্রি করে শ্রমিকদের ৭৬ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। সেই সাথে সরকারের কাছ থেকে নেয়া সুদমুক্ত ঋণ ফেরত না দেয়ায় বেক্সিমকোসহ অন্তত ১০টি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুতি চলছে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শিল্পাঞ্চলে টানা অস্থিরতা, কারখানা বন্ধ এবং মালিকপক্ষের আর্থিক অনিয়মের কারণে হাজার হাজার শ্রমিক মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার প্রথমে সুদমুক্ত ঋণ দিয়ে বেতন পরিশোধের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ঋণের টাকা ফেরত না দেয়ায় এখন সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে অর্থ আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

সাম্প্রতিক সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত ‘বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রম ও ব্যবসায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা’ সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আদালতের আদেশ মেনে নাসা গ্রুপের সম্পদ বিক্রি করে শ্রমিকদের আইনানুগ পাওনা পরিশোধ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে আদালত নিযুক্ত প্রশাসকের মাধ্যমে শেয়ার বিক্রি করে ৭৬ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। অবশিষ্ট পাওনা মেটাতে আরো সম্পত্তি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিক্রি করা হবে। তিনি আরো জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় নাসা গ্রুপ আটটি ব্যাংকের ডাউন পেমেন্ট দেয়া হয়েছে। বাকি ১৫টি ব্যাংকের দেনা এবং শ্রমিকদের অবশিষ্ট বকেয়া পরিশোধের জন্য জমি, ভবন ও অন্যান্য সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পুরো কার্যক্রম স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করতে আদালত ও সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো যৌথভাবে কাজ করছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নাসা গ্রুপের কারখানাগুলোতে ব্যাপক সঙ্কট তৈরি হয়। মাসের পর মাস বেতন বন্ধ থাকায় আশুলিয়া, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসেন। আন্দোলন, সড়ক অবরোধ ও ভাঙচুরের ঘটনায় শিল্পাঞ্চল অস্থির হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেপ্টেম্বর মাসে ত্রিপক্ষীয় সভার মাধ্যমে গ্রুপটির ১৬টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু কারখানা বন্ধ হলেও শ্রমিকদের পাওনা নিয়ে কোনো সমাধান হয়নি।

নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার আত্মগোপনে চলে যাওয়ার পর আর্থিক ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। পরে তাকে গ্রেফতার করে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের মামলায় আসামি করা হয়। তার মালিকানাধীন গুলশান ও আশুলিয়ার জমি, নারায়ণগঞ্জের সম্পত্তি, রাজউকের প্লট এবং বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার বিক্রির অনুমতি দিয়ে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নেয়া হয়। সেই সম্পদ বিক্রির অর্থ দিয়েই এখন শ্রমিকদের বকেয়া মেটানো হচ্ছে।

অন্য দিকে বেক্সিমকো গ্রুপের পরিস্থিতি আরো জটিল। শ্রমিক অসন্তোষ ঠেকাতে গত বছর সরকার দুই দফায় প্রায় ৫৮৫ কোটি টাকা সুদমুক্ত ঋণ দেয়। শর্ত ছিল ছয় মাসের মধ্যে অর্থ ফেরত দিতে হবে। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও প্রতিষ্ঠানটি একটি টাকাও পরিশোধ করেনি। একইভাবে বার্ডস গ্রুপ, টিএনজেড গ্রুপ, ইয়েলো অ্যাপারেলস, ডার্ড গ্রুপ, নায়াগ্রা টেক্সটাইলস, রোয়ার ফ্যাশন, মাহমুদ জিন্স ও অ্যাপারেল চেইন বিডি লিমিটেডও ঋণের অর্থ ফেরত দেয়নি।

তথ্যে দেখা যায়, কার্যবিবরণী অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না করলে এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। মালিক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালকদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা, পাসপোর্ট জব্দ এবং প্রয়োজনে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত অর্থ আদায় না হলে কারখানার জমি, ভবন ও যন্ত্রপাতি বিক্রি করে সরকারের পাওনা সমন্বয় করা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, মূলত শ্রমিকদের রাস্তায় নামা ঠেকাতেই এই ঋণ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অনেক কারখানা বন্ধ থাকায় এবং মালিকদের অসহযোগিতার কারণে অর্থ আদায় সম্ভব হয়নি। এখন কঠোর পথে না গেলে জনগণের করের টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ টাকা শ্রমিকের এবং জনগণের করের টাকা। এটি ফেরত না দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। প্রয়োজনে সম্পত্তি বিক্রি করে হলেও আদায় করা হবে। প্রয়োজনে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, সম্পত্তি বিক্রির সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নে ধীরগতি হলে শ্রমিকদের দুর্ভোগ বাড়বে। অনেক শ্রমিক ঘরভাড়া দিতে পারছেন না, সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। দ্রুত অর্থ না পেলে সামাজিক সঙ্কট ভয়াবহ আকার নেবে।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পোশাক খাতে দীর্ঘদিন ধরে করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা কয়েকটি গ্রুপকে বেপরোয়া করে তুলেছে। রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বারবার উদ্ধার প্যাকেজ দেয়া টেকসই সমাধান নয়। জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে একই সঙ্কট বারবার ফিরে আসবে বলে তারা মনে করছেন।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আরো তিনটি প্রতিষ্ঠান বিএইচআইএস অ্যাপারেলস, সিজনস ড্রেসেস ও প্যারাডাইস কেবলস শ্রমিকদের প্রায় ২৭ কোটি টাকা পরিশোধ করতে পারছে না। এসব কারখানাকে ঘিরে নতুন করে অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এ দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে নতুন নীতিমালা আসছে। ব্যাংকগুলোকে দায়বদ্ধ করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম আর না ঘটে। শিল্পাঞ্চল পুলিশ বলছে, যে কোনো অস্থিরতা মোকাবেলায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নাসা গ্রুপের সম্পত্তি বিক্রি করে শ্রমিকদের টাকা দেয়ার উদ্যোগ যদি সফল হয়, তবে এটি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

অন্য খেলাপি শিল্পগোষ্ঠীগুলোর ওপরও চাপ বাড়বে। তবে পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হলে নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, শ্রমিকের পাওনা আগে নিশ্চিত করতে হবে, এর পর ব্যাংক ও অন্যান্য দেনার বিষয় আসবে। কারণ শ্রমিকরাই উৎপাদনের মূল শক্তি। তাদের অসন্তোষ মানেই রফতানি খাতের বড় ধাক্কা।

বর্তমান বাস্তবতায় এক দিকে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি, অন্য দিকে শ্রমিকদের মানবিক সঙ্কট দু’দিক সামলাতে সরকার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। বেক্সিমকো ও নাসা গ্রুপের সম্পত্তি বিক্রির উদ্যোগ- তাই শুধু অর্থ আদায়ের বিষয় নয়, এটি শিল্পখাতে শৃঙ্খলা ফেরানোরও পরীক্ষা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্রমিকরা এখন অপেক্ষায় আছেন এসব সিদ্ধান্ত কত দ্রুত বাস্তবায়ন হবে। বছরের পর বছর যে ঘাম ঝরিয়ে তারা উৎপাদন সচল রেখেছেন, তার ন্যায্য মূল্য তারা কবে পাবেন এই প্রশ্নই শিল্পাঞ্চলের প্রতিটি পথে, প্রতিটি কারখানার ফটকে ঘুরে বেড়াচ্ছে।