ঘন কুয়াশায় লবণ উৎপাদন ব্যাহত

দেড় মাসে উৎপাদন মাত্র ৯ হাজার ৪৩৮ মেট্রিক টন

এস এম রহমান, পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)
Printed Edition

ঘন কুয়াশার কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমের দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও দেশে লবণ উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৯ হাজার ৪৩৮ মেট্রিক টন, যা গত মৌসুমের একই সময়ের তুলনায় প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ।

বিসিক লবণ প্রকল্প সূত্র জানায়, গত মৌসুমে (২০২৪-২৫) ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত লবণ উৎপাদন হয়েছিল ৩০ হাজার ৬৪১ মেট্রিক টন। অথচ চলতি মৌসুমে গত ৪ জানুয়ারি একদিনে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৬১৪ মেট্রিক টন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিসিক লবণ প্রকল্পের জেনারেল ম্যানেজার জাফর ইকবাল ভূঁইয়া।

এদিকে উৎপাদন কম থাকলেও লবণের বাজারমূল্য চরমভাবে পড়ে গেছে। গতকাল (৫ জানুয়ারি) মাঠ পর্যায়ে প্রতি মণ লবণ বিক্রি হয়েছে মাত্র ২৩০ টাকায়, যেখানে গত বছর একই সময়ে দাম ছিল ২৭০ টাকার বেশি। অথচ কৃষকদের হিসাবে চলতি মৌসুমে প্রতি মণ লবণ উৎপাদন খরচ পড়ছে ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকারও বেশি।

চাষিরা জানিয়েছেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে ঘন কুয়াশার কারণে মাঠে লবণ জমাট বাঁধছে না। ফলে গত বছরের তুলনায় উৎপাদন হয়েছে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। গত বছর এই সময়ের মধ্যে প্রায় শতভাগ জমিতে লবণ উৎপাদন শুরু হলেও চলতি মৌসুমে এখনো মাত্র ৭০ শতাংশ জমি লবণ উৎপাদনের উপযোগী করা সম্ভব হয়েছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার লবণ চাষিরা বলছেন, লবণ নীতিমালা-২০২২ এখনো কার্যকর না হওয়া, মাঠে উৎপাদিত লবণের সরকারি পাইকারি মূল্য নির্ধারণ না করা এবং শিল্প কারখানার নামে অতিরিক্ত লবণ আমদানির কারণে তারা টানা দুই বছর ধরে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে মৌসুম শুরু হলেও অনেক চাষি এখনো মাঠে নামেননি।

গত মৌসুমে (২০২৪-২৫) ২৬ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে লবণ উৎপাদন হয়েছিল ২২ লাখ ৫১ হাজার ৬৫১ মেট্রিক টন- ঘাটতি ছিল ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৩৪৯ মেট্রিক টন। সাধারণত ঘাটতির সময় পণ্যের দাম বাড়লেও লবণের ক্ষেত্রে ঘটছে উল্টো চিত্র। চাষিরা অভিযোগ করছেন, সারা বছর গড়ে প্রতি মণে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।

চলতি মৌসুমে সরকার ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। প্রতি বছর ১৫ নভেম্বর থেকে পরবর্তী বছরের ১৫ মে পর্যন্ত লবণ উৎপাদন মৌসুম ধরা হয়। বর্তমানে চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, পটিয়া এবং কক্সবাজার জেলায় প্রায় ৬৩ হাজার ১৯৮ একর জমিতে লবণ চাষ হয় এবং এতে ৪১ হাজার ৩৫৫ জন চাষি যুক্ত।

বিসিক সূত্র জানায়, দেশে শিল্প কারখানায় বছরে প্রায় ৫-৬ লাখ মেট্রিক টন সোডিয়াম সালফেট প্রয়োজন হয়, যা দেশে উৎপাদিত হয় না। পাশাপাশি সোডিয়াম ক্লোরাইড (ভোজ্য লবণ) ব্যবহার করেও বিভিন্ন শিল্প রাসায়নিক তৈরি হয়। এসব চাহিদার কথা বলে সরকার সোডিয়াম সালফেট ও বিদেশী সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানির সুযোগ দেয়। অভিযোগ রয়েছে, এই সুযোগে আমদানিকারকরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত লাখ লাখ মেট্রিক টন লবণ এনে বাজারে ছাড়ছে। ফলে উৎপাদনে ঘাটতি থাকলেও বাজারে কৃত্রিম প্রাচুর্য দেখিয়ে লবণের দাম কমিয়ে রাখা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের লবণ চাষিরা অবিলম্বে লবণ নীতিমালা বাস্তবায়ন, মাঠপর্যায়ে পাইকারি মূল্য নির্ধারণ এবং লবণ আমদানিতে কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রশ্ন- দেশে উৎপাদন ব্যাহত হলেও যদি দাম না বাড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে লবণ চাষ টিকবে কিভাবে?