আদালতের রায়ে নতুন গতি পায় কোটা সংস্কার আন্দোলন

ফিরে দেখা জুলাই’২৪

Printed Edition

হারুন ইসলাম

জুলাইয়ের বৃষ্টিভেজা এক সকাল। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দিকে তাকিয়ে ছিল হাজারো শিক্ষার্থীর চোখ। সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা বাতিল করে ২০১৮ সালে জারি করা পরিপত্র বহাল থাকবে, নাকি আবার ফিরে আসবে পুরনো ব্যবস্থা- সেই প্রশ্ন ঘিরে তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা। আদালতের সিদ্ধান্ত প্রকাশের কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই অনিশ্চয়তা রূপ নেয় আন্দোলনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন শিক্ষার্থীরা, আর অল্প সময়ের মধ্যেই সেই সমাবেশ পৌঁছে যায় শাহবাগে। বৃষ্টি, যানজট কিংবা হলগুলোতে ছাত্রলীগের কড়া নজরদারি, হুমকি কিছুই থামাতে পারেনি তাদের। ৪ জুলাই ২০২৪ ছিল সেই দিন, যেদিন রায় থেকে ন্যায্য অধিকার বঞ্চিত হওয়ায় কোটা আন্দোলন নতুন গতি পায়। দিন শেষে আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দেন গণমিছিল ও দেশব্যাপী ছাত্রধর্মঘটের কর্মসূচির। জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোর ইতিহাসে এই দিনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে আছে।

ঘটনার শুরু আরো আগে। সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করে ২০১৮ সালে জারি করা সরকারি পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। ৪ জুলাই সেই আপিলের শুনানি ছিল সর্বোচ্চ আদালতে। সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, করিডোর, ক্যাম্পাস এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের চোখ ছিল আদালতের দিকে।

সকালের শুনানিতে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের ওপর তাৎক্ষণিক স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকৃতি জানান। আদালত জানান, হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সরকার চাইলে নিয়ম অনুযায়ী লিভ টু আপিল করতে পারবে। আদালতের এই সিদ্ধান্ত অনেক শিক্ষার্থীর কাছে প্রত্যাশিত ছিল না। খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তেই ক্যাম্পাসে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়। আন্দোলনকারীরা জানান, এটি ছিল তাদের আন্দোলন আরো বিস্তৃত করার একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। পূর্বনির্ধারিত আলটিমেটাম অনুযায়ী বেলা প্রায় ১১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। কেউ এসেছেন টিএসসি থেকে, কেউ হল থেকে, কেউবা এসেছেন চাকরিপ্রত্যাশী পরিচয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছোট ছোট দল মিলে বড় সমাবেশে রূপ নেয়।

সমাবেশ থেকে একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে শাহবাগের দিকে এগিয়ে যায়। বেলা গড়ানোর সাথে সাথে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মোড়ে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। দুপুরের পর থেকে কার্যত বন্ধ হয়ে যায় শাহবাগ হয়ে চলাচল করা যানবাহন। বাংলামোটর, কাকরাইল, সায়েন্স ল্যাবরেটরি এবং মৎস্যভবনমুখী সড়কে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। শাহবাগের সেদিনের দৃশ্য ছিল অন্যরকম। সেদিন কারো হাতে জাতীয় পতাকা, কারো হাতে প্ল্যাকার্ড। কেউ রেইনকোট পরে বসে আছেন, কেউ ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন। আবার অনেকে বৃষ্টিতে ভিজেই সড়কে বসে স্লোগান দিচ্ছিলেন। ওই দিনের ছবিতে দেখা যায় এক নারী শিক্ষার্থীর হাতে ধরা একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘যোগ্যতার সাথে বৈষম্য নয়।’ আরেকটিতে লেখা ছিল, ‘মেধার বাংলাদেশ চাই।’ অনেকের পিঠে, বুকে কিংবা টি-শার্টে বড় করে লেখা ছিল, ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা।’

স্লোগানগুলোও ছিল আন্দোলনের ভাষা হয়ে ওঠা কিছু বাক্য। ‘একাত্তরের বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’, ‘কোটার কবর দাও’, ‘বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ’, এসব স্লোগান ঘুরে ফিরে উচ্চারিত হচ্ছিল। আন্দোলনকারীরা বারবার একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চেয়েছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিল, এই আন্দোলন মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে নয়। বরং তারা এমন একটি নিয়োগব্যবস্থা চান, যেখানে সুযোগের প্রধান ভিত্তি হবে মেধা ও যোগ্যতা।

বিকেলের দিকে সমাবেশে বক্তব্য দেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের পরিপত্র পুনর্বহালের ক্ষমতা এখনো নির্বাহী বিভাগের হাতে রয়েছে। সরকার চাইলে সিদ্ধান্ত নিয়ে সঙ্কটের সমাধান করতে পারে। তিনি আরো বলেন, আন্দোলনের লক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অস্বীকার করা নয়, বরং বৈষম্যহীন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবি জানানো।

শাহবাগে অবস্থান চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মোড়ের বিভিন্ন প্রান্তে পুলিশ সদস্যদের অবস্থান নিতে দেখা যায়। তবে দিনের বেশির ভাগ সময় তারা সরাসরি হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকে। বিকেল ৫টার দিকে কিছু পুলিশ সদস্যকে হেলমেট পরে অবস্থান নিতে দেখা গেলে আন্দোলনকারীদের মধ্যে সাময়িক উদ্বেগ তৈরি হয়। কয়েকজন শিক্ষার্থী হাত ধরে মানববন্ধনের মতো একটি মানবঢাল তৈরি করেন। যদিও শেষ পর্যন্ত কোনো সংঘর্ষ হয়নি। পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবেই নিয়ন্ত্রণে ছিল।

শাহবাগের আন্দোলনই ছিল না সেদিনের পুরো গল্পে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একই দাবিতে বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়। রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আগারগাঁও সড়কে অবস্থান নেন। কয়েক ঘণ্টার জন্য ওই এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রায়সাহেব বাজার এলাকায় অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। পুরান ঢাকার ব্যস্ত সড়কগুলোতে এর প্রভাব পড়ে।

অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবস্থান নেন। ফলে মহাসড়কে যান চলাচল কিছু সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন।

রাজশাহীতেও একই দৃশ্য দেখা যায়। ভারী বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান নেন।

দক্ষিণাঞ্চলেও আন্দোলনের প্রভাব স্পষ্ট ছিল। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে অবস্থান নেন। অন্য দিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়ক অবরোধ করেন। কয়েক ঘণ্টার জন্য সেখানেও যান চলাচল ব্যাহত হয়।

দিন গড়ানোর সাথে সাথে আন্দোলনের দাবিগুলোও আরো স্পষ্টভাবে সামনে আসে। শিক্ষার্থীরা বলছিলেন, ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল রাখতে হবে। সংবিধানসম্মত সীমিত সংরক্ষণ ছাড়া পুরো কোটাব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। একই ব্যক্তি বা পরিবার যেন একাধিকবার কোটা-সুবিধা নিতে না পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। যেসব কোটা পদ শূন্য থাকবে, সেগুলো মেধার ভিত্তিতে পূরণ করতে হবে। পাশাপাশি দুর্নীতিমুক্ত ও মেধাভিত্তিক সরকারি চাকরি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

আন্দোলনকারীদের মতে, তখন এটি শুধু একটি চাকরির প্রশ্ন ছিল না; বরং এটি ছিল সমান সুযোগের প্রশ্ন। বহু শিক্ষার্থী এই মনে করেই আন্দোলনে এসেছিলেন যে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় দীর্ঘ প্রস্তুতির পরও তারা একটি অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছেন। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক উত্তেজনাও সেদিন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। বিভিন্ন হলে তৎকালীন সরকার সমর্থক ছাত্রসংগঠন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে দেখা যায়। ওই সময় আন্দোলনে অংশগ্রহণ থেকে শিক্ষার্থীদের বিরত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছিল এমন অভিযোগও ওঠে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হলে এ নিয়ে চাপা উদ্বেগ ছিল। আন্দোলনের সাথে যুক্ত অনেক শিক্ষার্থী সহপাঠীদের সাথে যোগাযোগ রেখে চলছিলেন, কেউ একা চলাফেরা না করার পরামর্শ দিচ্ছিলেন। সেদিন সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল আন্দোলনের অন্যতম মুখ সারজিস আলমকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি। তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হল ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে তার সহপাঠীরা রাত পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন এবং নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান।

এই ঘটনা আন্দোলনের ভেতরে নতুন আবেগের জন্ম দেয়। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে এটি ছিল আন্দোলনের প্রতি চাপ সৃষ্টির একটি প্রতীকী উদাহরণ। এদিকে একই সময়ে আরেকটি ইস্যু দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। সরকারের নতুন পেনশন স্কিমের প্রতিবাদে শিক্ষক ও কর্মচারীদের কর্মবিরতি চলছিল। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আগে থেকেই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। তার সাথে কোটা আন্দোলনের উত্তাপ যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে।

বিকেলের শেষ ভাগে শাহবাগের সমাবেশ থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। আন্দোলনকারীরা জানান, পরদিন অনলাইন ও অফলাইনে গণসংযোগ কর্মসূচি পালন করা হবে। ৬ জুলাই দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে গণমিছিল অনুষ্ঠিত হবে। আর ৭ জুলাই পালিত হবে দেশব্যাপী ছাত্রধর্মঘট, যেখানে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের আহ্বান জানানো হয়।

এই ঘোষণা ছিল আন্দোলনের নতুন পর্যায়ে প্রবেশের ইঙ্গিত। কারণ এর আগে আন্দোলন মূলত সমাবেশ, মানববন্ধন ও অবরোধকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু ছাত্রধর্মঘটের ডাক স্পষ্ট করে দেয় যে আন্দোলনকারীরা এখন সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একই প্ল্যাটফর্মে আনার চেষ্টা করছেন।

সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটের দিকে শাহবাগের অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়। ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে। কিন্তু দিনের আলো নিভে গেলেও আন্দোলনের উত্তাপ থামেনি। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ফিরে গেলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেঞ্জার গ্রুপ এবং হলের বারান্দায় আলোচনা চলতে থাকে পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে।

পরে ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে অনেকেই বলেছেন, ৪ জুলাই ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এর আগে আন্দোলন ছিল মূলত কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। কিন্তু এই দিনের পর আন্দোলন আরো সংগঠিত, আরো বিস্তৃত এবং আরো দৃশ্যমান রূপ নিতে শুরু করে।

জুলাইয়ের সেই বৃষ্টিভেজা দিনটি তাই কেবল একটি অবরোধ কর্মসূচির দিন ছিল না। এটি ছিল তরুণদের ক্ষোভ, প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের এক প্রকাশ। শাহবাগের ভেজা রাস্তায় বসে থাকা সেই শিক্ষার্থীরা হয়তো তখনো জানতেন না, সামনে আরো উত্তাল দিন অপেক্ষা করছে। কিন্তু ৪ জুলাইয়ের সন্ধ্যায় তারা যখন নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে ঘরে ফিরছিলেন, তখন তাদের চোখে ছিল একটি বিশ্বাস, তাদের কণ্ঠ একদিন না একদিন শোনা হবেই।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে তাই ৪ জুলাই ২০২৪ একটি আলাদা তারিখ হয়ে আছে। এটি ছিল এমন একটি দিন, যেদিন একটি দাবি রাজধানীর একটি মোড় পেরিয়ে সারা দেশের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছিল; আর যেদিন ছাত্রসমাজ ঘোষণা দিয়েছিল, তাদের আন্দোলন এখন আর থামার নয়।