নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
- রাতে ট্রাক আটক করে চাঁদা আদায়
- চাঁদা না দিলে গোডাউনে আগুন লাগানোর হুমকি
- ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানির বিশেষ সুবিধা প্রত্যাহার
নানা রকম সঙ্কটে পড়েছেন নারায়ণগঞ্জের হাজার কোটি টাকার সুতা ব্যবসায়ীরা। সুতা আমদানির নিত্যনতুন নিয়মের পাশাপাশি অনেক সমস্যার মধ্যে নিজেদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। সর্বশেষ ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে এতদিন যে বিশেষ সুবিধা দেয়া হতো, তা প্রত্যাহার করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। পাশাপাশি দেশের বৃহত্তম সুতা আমদানি-রফতানি কেন্দ্রে নারায়ণগঞ্জের টানবাজার। এখানে ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। চাঁদা না পেলে সুতার গোডাউন পুড়িয়ে দেয়ার হুমকিও পাচ্ছেন অনেকে। ফলে সুতা ব্যবসায়ীদের দিন কাটছে আতঙ্কে।
সূত্র জানায়, দেশের বৃহত্তম সুতা বিপণন কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জের টানবাজারে কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা চলে। এখানের প্রায় ৪ শতাধিক ব্যবসায়ী চাঁদাবাজদের কারণে আতঙ্কে রয়েছেন। প্রাণনাশের ভয় কিংবা ব্যবসা বাণিজ্য চরম হুমকির মুখে পড়তে পারে এমন আশঙ্কা থেকে অনেক ব্যবসায়ী ভয়ে মুখ খুলছেন না। নীরবে দিনের পর দিন চাঁদা দিয়ে যাচ্ছেন। চাঁদাবাজদের কারণে অনেক ব্যবসায়ী তাদের সুতা ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার চিন্তাভাবনা করছেন। সুতা ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদাবাজির খবর অনেক ভুক্তভোগী গোপনে সরকারের শীর্ষ মহলের কাছে জানিয়েছে।
ভুক্তভোগেী একাধিক সুতাব্যবসায়ী জানান, নারায়ণগঞ্জের টানবাজারের সুতাব্যবসায়ীদের বেশির ভাগই বহিরাগত। তারা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এসে এখানে সুতার ব্যবসা করে থাকেন। চাঁদাবাজরা তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতি কিংবা প্রাণের ক্ষতি করতে পারেন এমন আশঙ্কা থেকে ভয়ে অনেকে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সরাসরি মুখ খুলছেন না। চাঁদাবাজির কথা সুতা ব্যব্যসায়ীদের সংগঠন ইয়ার্ন মাচেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের কর্তাব্যক্তি অনেকের জানা থাকলেও অনেকটা নীরব তারা।
ইয়ার্ন মাচেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে জানান, চাঁদাবাজির কয়েকটা ঘটনা তারা জানতে পেরেছেন। তার সাথে কথা বলে অনুমান হয়েছে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কথা বলতে যেন তিনিও আতঙ্কগ্রস্ত।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, দীর্ঘদিনের সুতাব্যবসা-বাণিজ্যের এই এলাকায় নুতন সরকার আসার পর উত্থান ঘটেছে এক ‘চাঁদাভাবির’। সাবেক এক যুবদল নেতার স্ত্রীর রয়েছে একাধিক গ্রুপ। সুতা ব্যবসায়ীরা তাকে চান্দাভাবি হিসেবে জানে। অভিযোগ রয়েছে, তার নির্দেশে চাঁদাবাজদের একটা বিশাল গ্রুপ সুতা ব্যবসায়ীদের কাছে নিয়মিত চাঁদা আদায় করে থাকে। চাঁদাবাজদের রয়েছে একধিক সদস্য যারা রাতে সুতার গাড়ি আটক করে চাঁদা আদায় করে থাকে। ভয়ে প্রশাসনের কাছে এদের নাম বলতে সাহস পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা। তবে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করলে সুতার ব্যবসায়ীদের কাছে কারা চাঁদা নিচ্ছে জানতে পারবে।
টানবাজারের একটি মার্কেটের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে জানান, টানবাজার, মিনাবাজার ও কুটিরপাড়ায় প্রায় ৪ শতাধিক সুতাব্যবসায়ী চাঁদাবাজদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ। এদের ভয়ে কেউ কথা বলছে না। বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা নারায়ণগঞ্জের বাইরের জেলা থেকে এখানে এসে ব্যবসা করে থাকেন। ফলে ভয়ে অনেক কিছু হজম করতে হয়।
তিনি জানান, সুতাব্যবসায়ী ও গোডাউন মালিকের কাছ থেকে নানা অজুহাতে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। বিশেষ করে সুতার ট্রাক রাতের বেলায় এখানে মালামাল লোড-আনলোড করে থাকে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ধরেন একটা গাড়িতে ১০ লাখ টাকার সুতা রয়েছে ঐ সুতার মালিক ১০ লাখ টাকার সুতা গায়েব হওয়ার ভয়ে বাধ্য হয়ে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে থাকেন।
সূত্র জানায়, চাঁদাবাজদের রয়েছে মোটরসাইকেল বাহিনী। এই বাহিনী মিনাবাজার এলাকায় বৈঠক করে প্রতিদিন নিরূপণ করে কোন সুতার ব্যবসায়ী থেকে কোন পন্থায় কিভাবে চাঁদা আদায় করা যায়। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা বিষয়টি কেন্দ্রীয় বিএনপির হাইকমান্ডে অবগত করেছেন।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চাঁদা না দিলে তাদের গোডাউনে আগুন লাগিয়ে দেয়ার মতো ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১০ থেকে ১২ জন ব্যবসায়ী মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েছেন বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নাম প্রকাশ্যে আনতে রাজি নন তারা। তাদের আশঙ্কা, অভিযোগের কথাপ্রকাশ হলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগতভাবে তারা আরো হয়রানি কিংবা হামলার শিকার হতে পারেন।
এ দিকে নারায়ণগঞ্জে এ চাঁদাবাজির ব্যাপ্তিও বড়। চলতি বছরের এপ্রিলে রথ্যাব জানায়, দেশজুড়ে প্রায় ৬৫০ জন কথিত চাঁদাবাজের তালিকা করা হয়েছে, যার মধ্যে নারায়ণগঞ্জেই প্রায় ১১০ জনকে শীর্ষ চাঁদাবাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রথ্যাব তখন জানিয়েছিল, তালিকাটি যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। পরে পুলিশের পক্ষ থেকেও নারায়ণগঞ্জে চাঁদাবাজের একটি তালিকার কথা জানানো হয়।
এ দিকে নারায়ণগঞ্জে সদ্য যোগদান করা পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান অপরাধ দমনে জেলায় অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। নারায়ণগঞ্জ নগরীর টানবাজার এলাকায় পুলিশ সুপার মো: হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে সম্প্রতি অভিযান শেষে পুলিশ সুপার বলেন, নারায়ণগঞ্জে মাদকের বিস্তার, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও অবৈধ অস্ত্রের আধিক্যের বিষয়ে পুলিশ তথ্য পেয়েছে। এসব অপরাধ দমনে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি অন্যান্য সাধারণ অপরাধের বিরুদ্ধেও পুলিশের নিয়মিত অভিযান চলবে। এটি কন্টিনিউয়াস প্রসেস। শুধু একদিনে শেষ হবে না। কাজের মাধ্যমে এর প্রমাণ পাওয়া যাবে বলেও জানান তিনি।
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো: রায়হান কবির সাংবাদিকদের বলেন, জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এ ধারা বজায় রাখতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও যৌথবাহিনীর সমন্বয়ে মাদক, ছিনতাই ও চাঁদাবাজি প্রতিরোধে আরো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হবে। অস্ত্র উদ্ধার ও মাদকবিরোধী অভিযান আরো জোরদার করতে হবে, মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও নাসিকের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, কেউ চাঁদাবাজি করছে, কেউ মাদককারবারি করছে, কেউ ভূমিদস্যু করছে এগুলো কিন্তু এমপি সাহেব ও আমাদের কাছে খবর আছে। কিছুদিনের মধ্যে সারা দেশে সরকারি পক্ষ থেকে সাঁড়াশি অভিযান হবে এসব বিষয় নিয়ে। এই বিষয় নিয়ে আপনারা সচেতন থাকবেন, আপনারা জড়িত হবেন না। এতে বিএনপি হোক বা অন্য কোনো দলের হোক আইন সবার জন্য সমান। কেউ বিএনপি বলে পার পাবেন না। আমরা চাই না বিএনপির কোনো নেতাকর্মী এমন অপকর্মে জড়িত হোক আর কারাবরণ করুক।



