বিশেষ কারাগারে বন্দী ফ্যাসিস্ট এমপি-মন্ত্রীরা ভোট দেবেন না

মনির হোসেন
Printed Edition

কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারে আটক ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট এমপি ও মন্ত্রীসহ ভিআইপি পদমর্যাদার কোনো বন্দীই এবার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবেন না বলে কারা কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছেন। তবে কেন ভোট দেবেন না সে ব্যাপারে তারা কোনো কথা বলছেন না। সব মিলিয়ে দেশের ৭৪ কারাগারে আটক বন্দীদের মধ্যে পাঁচ হাজার ৯৪০ জন আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেয়ার জন্য নিবন্ধন শেষ করেছেন। যদিও নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, ছয় হাজার ২৮৫ জন বন্দী এবার কারাগার থেকে রেজিস্ট্রেশন করেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যার পর কারা অধিদফতরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে জানান, ৭৪টি কারাগারে আটক বন্দীদের মধ্যে মোট পাঁচ হাজার ৯৪০ জন বন্দী নির্ধারিত অ্যাপের মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে রেজিস্ট্রেশন করেছেন। তবে এদের মধ্যে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর সাবেক এমপি, মন্ত্রী ও ডিভিশন পাওয়া (পুলিশ, সরকারি কর্মকর্তা) বন্দীদের কেউই পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো কারাগার থেকে ভোট দেয়ার বিষয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে আগ্রহ দেখাননি। তাদেরকে বারবার অনুরোধ করার পরও তারা কারা কর্তৃপক্ষের অনুরোধে সাড়া দেননি বলেও ওই কর্মকর্তা জানান।

এ প্রসঙ্গে জানতে গতকাল রাতে কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো: তায়েফ উদ্দিন মিয়ার সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করার পরও তিনি টেলিফোন রিসিভ করেননি।

ওই কারাগার সংশ্লিষ্ট একাধিক কারা কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, এই কারাগারে ডিভিশনপ্রাপ্ত যতজন বন্দী রয়েছেন তাদের একজনও ভোট দেয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন করেননি। কেন করেননি জানতে চাইলে তারা এর জবাব না দিয়ে শুধু আমাদের বলেছেন, আমরা ভোট দেবো না। পরে আমরা লোক দিয়ে তাদের ভোটার হওয়ার জন্য অনুরোধ করি। কিন্তু তারা বারবারই একই কথা বলেন, আমরা রেজিস্ট্রেশনও করব না, আমরা ভোটও দেবো না। ভোট না দেয়ার কারণও বলব না।

যেসব ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দীকে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে রেজিস্ট্রেশনের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছিল তাদের মধ্যে সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক এমপি হাজী মো: সেলিম, পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সুলতান মনসুর, আবদুর রাজ্জাক, পলকসহ অনেকেই একইভাবে বলেছেন, আমরা কারাগার থেকে ভোট দেবো না। জানান ওই সব কর্মকর্তা।

উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার ইতিহাসে এবারই প্রথম দেশের ৭৪ কারাগারে আটক বন্দীদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এর আগে অনলাইনে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্দীদের রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।

কারাগার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী ছয় হাজার ২৮৫ জন বন্দীর রেজিস্ট্রেশন করানো হলেও গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশনকৃত বন্দী অবস্থান করছিলেন পাঁচ হাজার ৯৪০ জন। অন্যরা জামিনে বেরিয়ে গেছেন।

কারাগারের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, কারাগারে আটক বন্দীদের মধ্যে বেশির ভাগই হাজতি। জামিন হলেই তারা যেকোনো সময় মুক্তি পেয়ে বের হয়ে যাবেন। তবে কারাগারে আটকদের মধ্যে অধিকাংশই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী রয়েছেন। এ ছাড়া পুরনো কয়েদিসহ খুন, ডাকাতি, ছিনতাইসহ অন্যান্য মামলার আসামি রয়েছেন। তাদের অনেকেই ভোট প্রয়োগের জন্য রেজিস্ট্রেশনে আগ্রহ দেখান কম।

বন্দীদের নিবন্ধন কম হওয়ার বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষ বলছেন, তারা যেকোনো সময় জামিন পেয়ে কারাগার থেকে ছাড়া পেতে পারেন। তাই তারা কারাগার থেকে ভোট দিতে অনলাইনে নিবন্ধন করেননি। আবার বন্দীদের মধ্যে যারা পুরনো বন্দী রয়েছেন, তাদের অনেকেরই জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিবন্ধন জটিলতা রয়েছে। আর বন্দীর একটি অংশ ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। তারা ভোট না দেয়ার সিন্ডিকেট করেছে। এর ফলে নিবন্ধনে সাড়া কম।

গতকাল রাত সাড়ে ৮টায় কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোহাম্মদ মোতাহের হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

উল্লেখ্য, বিশেষ কারাগারে মোট ১৯৩ জন ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দী রয়েছেন। তাদের প্রতিদিন কারা অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে সকাল, দুপুর ও রাতের খাবার দেয়ার পাশাপাশি চিকিৎসা সুবিধা দেয়া হচ্ছে। সারা দেশে মোট বন্দীর সংখ্যা গতকাল পর্যন্ত ৮০ হাজারের বেশি রয়েছে বলে কারাগার সূত্র জানিয়েছে।