- ছাদভিত্তিক ২ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব
- প্রয়োজন প্রায় ১২ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ
বিশেষ সংবাদদাতা
তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটে অনেক গার্মেন্টস কারখানা উৎপাদন সমতার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। অথচ তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে প্রায় দুই হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজন প্রায় ১২ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ০৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সাড়ে ৬ শতাংশ সুদে বা সহজ শর্তে গ্রিন ফাইন্যান্স বা সবুজ অর্থায়ন পাওয়া গেলে আরো ১৩ শ’টি পোশাক কারখানা রুফটপ সোলারে যেতে প্রস্তুত। বর্তমানে প্রায় পাঁচ শ’ পোশাক কারখানা রুফটপ সোলারে বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে সিপিডি আয়োজিত পঞ্চম বাংলাদেশ-চীন নবায়নযোগ্য শক্তি ফোরামে ‘পোশাক খাতের শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ : চীনা প্রত্য বৈদেশিক বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল রুফটপ সোলার ইন আরএমজি সেক্টর’ শীর্ষক গবেষণা উপস্থাপন করেন সিপিডির রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আবরার আহমেদ ভূঁইয়া ও প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট নুর ইয়ানা জান্নাত। গবেষণায় তিন হাজার ৩২০টি পোশাক কারখানার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫০টি কারখানায় সরাসরি সমীা চালানো হয়, যা মোট পোশাক কারখানার প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ।
সিপিডির গবেষণায় বলা হয়, পোশাক খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার খুবই সীমিত। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের ৮৭৮টি কারখানা সমীায় দেখা গেছে, এসব কারখানার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার মাত্র তিন শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসছে। অথচ রুফটপ সোলারের মাধ্যমে পোশাক খাতের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৪ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ করা সম্ভব বলে গবেষণায় দাবি করা হয়েছে। ৩০০ কিলোওয়াট বা তার বেশি মতার দুই হাজার ৩০৩টি নন-অ্যাডাপ্টার কারখানায় সোলার প্যানেল স্থাপনে প্রায় ১৮৮ দশমিক দুই মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
গাজীপুরের এক হাজার ১২৪টি কারখানার ছাদে প্রায় ৭৩২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকার এক হাজার ২৪৭টি কারখানা থেকে ৩৯১ মেগাওয়াট, নারায়ণগঞ্জের ৫০০টি কারখানা থেকে ২৫২ মেগাওয়াট, চট্টগ্রামের ৩৫৯টি কারখানা থেকে ২০৯ মেগাওয়াট এবং ময়মনসিংহের ৪০টি কারখানা থেকে প্রায় ১৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। নরসিংদী, পাবনাসহ আরো ১২টি জেলার ৫০টি কারখানা থেকে প্রায় ১৬ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় খরচপ্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় মাত্র ৩.০৪ টাকা। জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনার তুলনায় এ খরচ অর্ধেকেরও কম। বিশ্বের বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের ওপর জোর দিচ্ছে। এইচঅ্যান্ডএম, ইনডিটেক্স, ওয়ালমার্ট, গ্যাপ ও এমঅ্যান্ডএসের মতো ক্রেতারা পোশাক কারখানাগুলোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহিত করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট নির্দেশনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ২০৩৫ সালের মধ্যে কারখানাগুলোতে ৩৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। তবে শিল্প রুফটপ সোলারে বিনিয়োগের েেত্র অর্থায়নকে বড় বাধা হিসেবে দেখছে সিপিডি। সিপিডি বলছে, সাড়ে ১০ শতাংশের বেশি সুদে বাণিজ্যিক অর্থায়ন হলে শিল্প রুফটপ সোলার প্রকল্প ব্যাংকগুলোর কাছে বিনিয়োগযোগ্য থাকে না। তাই সবুজ অর্থায়ন ও রেয়াতি ঋণের ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, প্রত্যেকেই ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের ভেতরে রয়েছে। এ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট আরো কমত, যদি আগেই শিল্পকারখানাগুলোতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ করা যেত। তিনি বলেন, ধীরে ধীরে পোশাক খাতে রুফটপ সোলারের রূপান্তর খুবই ইতিবাচক প্রচেষ্টা। এক দিকে এটি জ্বালানির ওপর চাপ কমাচ্ছে, অন্য দিকে ডিকার্বনাইজেশনের প্রতিশ্রুতিও পূরণ করছে।
ড. মোয়াজ্জেম বলেন, পোশাক খাতে সব মিলিয়ে প্রায় ৯ দশমিক ৭ মিলিয়ন বর্গমিটারে রুফটপ সোলার স্থাপন করা সম্ভব। এসব ছাদ থেকে প্রায় এক হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। রুফটপ সোলারে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন নেই। মাত্র ১৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার হলেই চলবে। রুফটপকে সোলারভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে রূপান্তরের জন্য অতিরিক্ত রিসোর্সের প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, সব কারখানা এখনই প্রস্তুত নয়। প্রায় ৫০০ কারখানা এখনই বিনিয়োগ করতে পারে। আরো এক হাজার ৩০০ কারখানা প্রয়োজনীয় সাপোর্ট পেলে রুফটপ সোলারে যেতে পারে। ৪০০টির বেশি কারখানার েেত্র আরো বেশি ইন্টারভেনশন প্রয়োজন। বিনিয়োগের শর্তগুলো পরিবর্তন করা গেলে বিনিয়োগে সম কারখানার সংখ্যা আরো বাড়বে। সাড়ে ৬ শতাংশ সুদে, ‘গ্রিন ফাইন্যান্স পাওয়া গেলে সবচেয়ে ভালো।
আলোচনায় হা-মীম গ্রুপের পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি বিভাগের প্রধান তনুল চক্রবর্তী বলেন, তাদের গ্রুপের কারখানাগুলোতে রুফটপ সোলারের ব্যবহার ইতোমধ্যে এগিয়েছে। তবে ছাদের সীমিত জায়গার কারণে কারখানার পুরো বিদ্যুৎ বা জ্বালানি চাহিদা সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, আমরা ২৯ দশমিক ২ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার করে ফেলেছি। এতে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার মাত্র ১৫ শতাংশ এবং পুরো জ্বালানি চাহিদার মাত্র ৬ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। এটাই বাস্তবতা।
কারখানার ছাদ পুরো জ্বালানি চাহিদা পূরণের মতো সম নয় উল্লেখ করে তনুল চক্রবর্তী বলেন, বেশির ভাগ কারখানা বহুতল হওয়ায় ছাদের জায়গা তুলনামূলক কম। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, জিরানি বাজারে আমাদের একটি কারখানার ছাদে মাত্র ২৭২ কিলোওয়াট সোলার স্থাপন করতে পেরেছি। অথচ কারখানাটির বিদ্যুৎ চাহিদা দেড় মেগাওয়াট।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপরে (বিডা) কান্ট্রি লিয়াজোঁ নুসরাত জাহান, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা ও অপারেশন) স্বপন বনিক, বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির (বিএসআর) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি জাহিদুল আলম, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক মিনহাজুল হকসহ সংশ্লিষ্টরা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।



