বান্দরবান প্রতিনিধ
পাহাড়ের মেঘ-ছুঁই জনপদ বান্দরবানে জ্বালানি তেলের তীব্র সঙ্কটে স্থবির হয়ে পড়েছে পর্যটন খাত। এই সঙ্কটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে জেলার প্রধান অর্থনৈতিক খাত পর্যটনে। তেলের অভাবে যানবাহন ও নৌ-চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় মাঝপথেই ভ্রমণ সংক্ষেপ করে জেলা ছাড়ছেন পর্যটকরা। অন্যদিকে, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে এর সরাসরি ভুক্তভোগী হচ্ছেন পর্যটন এলাকা নির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা থেকে হোটেল-মোটেল ও রেস্তরাঁর মালিকরা।
জ্বালানি তেলে চালিত যানবাহন নির্ভর এ পর্যটনখাতে সরাসরি বহুমুখী সঙ্কটের প্রভাব পড়েছে। সরেজমিন দেখা গেছে, জেলা শহরের পেট্রল পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি। পাম্পগুলো থেকে ‘রেশনিং’ পদ্ধতিতে তেল দেয়া হচ্ছে। মোটরসাইকেলপ্রতি সর্বোচ্চ ২০০ টাকার অকটেন এবং চাঁদের গাড়ি বা জিপে ১০ থেকে ১৫ লিটার করে ডিজেল মিলছে। তবে জেলা শহরের বাইরে দুর্গম উপজেলাগুলোতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ।
অভিযোগ রয়েছে চাহিদা পরিমাণ তেল পাচ্ছে না গ্রাহকরা। যার প্রভাব পড়েছে পর্যটকদের ওপর। পরিবহনগুলো চাহিদামতো তেল না পাওয়ায় পর্যটকদের বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও ভাড়া দ্বিগুণের বেশি নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া হোটেল-মোটেল ভাড়াসহ রেস্তরাঁর খরচ বেড়ে গেছে। ফলে বেশির ভাগ পর্যটক গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না। জানা গেছে অনেকে পূর্ব থেকে বুকিং করা হোটেল-মোটেল চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে লোকসানের মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রুমা, থানচি ও আলীকদমে কোথাও কোথাও প্রতি লিটার অকটেন ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই সুযোগে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী তেল মজুদ করে চড়া দাম হাঁকাচ্ছেন। তেলের সঙ্কটে থানচি থেকে তিন্দু-রেমাক্রি নৌপথে ইঞ্জিনচালিত বোটের ভাড়া ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। একইভাবে পর্যটকবাহী ‘চাঁদের গাড়ি’ বা জিপগুলোও আদায় করছে অতিরিক্ত ভাড়া।
ঈদের ছুটিতে বান্দরবানে পর্যটকের ঢল নামলেও তেলের এই হাহাকার সব আনন্দ মাটি করে দিয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে আসা পর্যটক দিদারুল আলম ও শাহজাহান জানান, তারা আটজন থানচি যাওয়ার জন্য বান্দরবানে এসেছেন। সঙ্কটের কথা মাথায় রেখে চট্টগ্রাম থেকেই সাথে করে তেল নিয়ে এসেছেন। তবে তাদের পরিচিত আরো দু’টি দল জ্বালানি না পেয়ে জেলা শহর থেকেই ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে।
হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি সঙ্কটের কারণে পর্যটন খাত এবার মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। দুর্গম এলাকায় যাতায়াত করা যাচ্ছে না বলে অনেক পর্যটক আগেভাগেই বান্দরবান ছেড়েছেন। বর্তমানে হোটেল-মোটেলগুলো প্রায় ফাঁকা।
পাহাড়িকা ফিলিং স্টেশনের মালিক সুব্রত দাশ জানান, সরবরাহ কম থাকায় কয়েক দিন পাম্প বন্ধ রাখতে হয়েছিল। বর্তমানে মাত্র চার থেকে সাড়ে চার হাজার লিটার ডিজেল ও অকটেন বরাদ্দ পাওয়া গেছে, যা চাহিদার তুলনায় নগণ্য। সরবরাহ না বাড়লে এই রেশনিং পদ্ধতিতেও তেল দেয়া সম্ভব হবে না।
জ্বালানি সঙ্কটের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় শাকসবজিসহ প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম চড়া। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি জানান, সঙ্কট নিরসনে পাম্পগুলোতে ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে তদারকি করা হচ্ছে যাতে কেউ অবৈধ মজুদ করতে না পারে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের জ্বালানি তেলের ডিপোতে চিঠি দিয়ে দ্রুত সরবরাহ বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত এই সঙ্কট সমাধান করা না গেলে শুধু পর্যটন নয়, পাহাড়ের সামগ্রিক অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়বে। দ্রুত তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করে পর্যটন নগরীর প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন পর্যটন নির্ভার স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।



