ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির

গণভোট অধ্যাদেশে কোন ভোটের ফল আগে দেয়া হবে বলা হয়নি

গণভোটের ভিত্তিতে যদি নির্বাচন করতে হয় তাহলে একই দিন দু’টি ভোট হলেও অ্যাটলিস্ট ফলাফল কোনটি আগে তা নির্ধারিত করা উচিত ছিল। আমার মনে হয় সরকারের মধ্যে সর্ষের মধ্যে ভূত আছে। ফ্রি ফেয়ার একটা ইলেকশন ভারত হতে দিতে চায় না। আমাদের উপদেষ্টা পরিষদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন এটা হতে দিতে চান না। কিন্তু রাজনৈতিকদলগুলোর এ নির্বাচন করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

রাশিদুল ইসলাম
Printed Edition

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির বলেছেন, নির্বাচনকে অনিশ্চিত করার জন্য এখনো ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তিনি বলেন, গণভোট অধ্যাদেশ অনুমোদন করা হলেও তার কোথাও বলা নাই কোন ভোটের ফলাফল আগে দেয়া হবে। গণভোটের ভিত্তিতে যদি নির্বাচন করতে হয় তাহলে একই দিন দু’টি ভোট হলেও অ্যাটলিস্ট ফলাফল কোনটি আগে তা নির্ধারিত করা উচিত ছিল। আমার মনে হয় সরকারের মধ্যে সর্ষের মধ্যে ভূত আছে। ফ্রি ফেয়ার একটা ইলেকশন ভারত হতে দিতে চায় না। আমাদের উপদেষ্টা পরিষদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন এটা হতে দিতে চান না। কিন্তু রাজনৈতিকদলগুলোর এ নির্বাচন করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তাহলে ২০০৬-০৭ সালের সেই প্রতিধ্বনি আবার আসবে। সো মিডিয়ার যে ভূমিকা পালন করা উচিত দেশের গণতন্ত্র সুসংহত করার লক্ষ্যে, কিছু কিছু মিডিয়া তা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে। দেশকে অস্থিতিশীল জায়গায় ঠেলে দিচ্ছে।

তিনি বলেন, ঢাকা শহরে প্রতিদিন ২০ জন মানুষ মারা যাচ্ছে এটা নিয়ে মিডিয়া বড় ইন্টারেস্ট দেখাচ্ছে কিন্তু একথা বলছে না যে এ দেশে দুর্ভিক্ষ হওয়ার কথা ছিল, দুর্ভিক্ষ হয়নি। এ কথা বলছে না যে পুলিশের মনোভাব ফিরিয়ে আনার জন্য যে সংস্কার প্রয়োজন ছিল সেটা হয়নি। প্রতিটি ব্যাংকের ন্যূনতম রিজার্ভ ছিল না, এখন আমানতদারদের অর্থ দেয়া সম্ভব হচ্ছে। রেমিট্যান্স অব্যাহত থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ তলানী থেকে ফের সম্মানজনক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। নির্বাচন করার মতো টাকা ছিল না দেশে। অগ্রণী ব্যাংকের দু’টি লকার থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৮৩২ ভরি সোনার গয়না জব্দ করা হয়েছে এ নিয়ে মিডিয়ায় তেমন আলোচনা নাই। ব্যারিস্টার শাহরিয়ার নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন।

তিনি মিডিয়ার সমালোচনা করে বলেন, মিডিয়ার কাজ ফ্যাসিলেট করা, টিভি টকশোতে যারা আমন্ত্রিত অতিথি তারা তাদের মতামত দেবে। কিন্তু মিডিয়া দেখা যাচ্ছে এজেন্ডা নিয়ে আসছে ইদানীং, এটা খুব ভয়ঙ্কর হয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের আগে এটা খুব বিপজ্জনক হয়ে যাচ্ছে।

নয়া দিগন্ত : রাজনীতিতে বিদেশী শক্তির প্রভাব বা প্রতিবেশী দেশ থেকে অনেক সময় ডিকটেশন দিতে দেখা যায়, বাংলাদেশে তারা এমন বা তেমন নির্বাচন দেখতে চায়, তো মিডিয়া কি না বুঝে অগোচরে কারো পারপাস সার্ভ করছে?

ব্যারিস্টার শাহরিয়ার : অগোচরে করার কোনো সুযোগ নেই। জেনেশুনে তারা, এটা প্যাট্রোনাইজ করে খুবই পরিকল্পিতভাবে করা হচ্ছে। এখানে তিন চারটা বয়ান হচ্ছে। যেমন হঠাৎ করে দুইটা বয়ান আসছে। একটা বয়ান হচ্ছে যে মব হচ্ছে। যেকোনো দাবি-দাওয়ার আন্দোলনকে বলা হচ্ছে মব। কারণ মবটা যদি একবার তারা বলতে পারে তাহলে ৩৬ জুলাইয়ের আন্দোলনটাও ছিল মব, এটা তারা বলতে পারবে, এটা তারা সুপরিকল্পিতভাবেই করছে। দ্বিতীয় আরেকটা জিনিস হচ্ছে এই সরকার কোনোভাবেই দেশ ভালো চালাতে পারেনি, বেশির ভাগ মানুষ হতাশ। এই বয়ান দিয়ে এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাচ্ছে যে আগেই ভালো ছিলাম। তো এই দুইটাকে যদি এসটাবলিস্ট করা যায় তাহলে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন হবে। এবং সেই এজেন্ডাকে নিয়ে খুবই তীক্ষèভাবে আগানো হচ্ছে। আরেকটা আগানো হচ্ছে, এ দেশে যে সংস্কারের এত কথা আমরা বলে আসছি, যেটা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে চাচ্ছি, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সংবিধানে এমন সংস্কার করেছিলেন, কিন্তু এখন ’৭২-এর সংবিধান, অন্য দেশের এজেন্ডার যে সংবিধান, সেই সংবিধান রাখার জন্য এখন যাতে গণভোট পাস না হয়, এরকম একটা পরিবেশ সৃষ্টির পেছনে অবশ্যই ভারতের প্রভাব রয়েছে, আওয়ামী লীগের সব পেশাজীবীতো আর পালিয়ে যায়নি, আমরাতো অনেককে চিনি, জানি, তারাতো উপস্থাপনা করছে, তাদের দেখছি, আমরাতো ভেবেছিলাম তাদের মধ্যে একটা অনুশোচনা আসবে, পরিবর্তন দেখব। কিন্তু দৃশ্যত পরিবর্তন না হয়ে আক্রমণাত্মক হচ্ছে।

নয়া দিগন্ত : আপনি শেখ মুজিবুর রহমানের শপথ না নিয়ে ক্ষমতা নেয়ার কথা বলছেন, তো এখন বলা হচ্ছে উনি লিখিতভাবে শপথ নিয়েছিলেন?

ব্যারিস্টার শাহরিয়ার : বিষয়টি আমিও দেখেছি। দ্যাখেন হাতে লিখে কোনো দিন শপথ হয় না। দ্বিতীয়ত. ওই লিখিত শপথ দেখবেন ওখানে কাঁচা হাতের লেখা। ওখানে লেখা হয়েছে, উনি (শেখ মুজিবুর রহমান) লিখেছেন- আমি সংবিধানকে সমুন্নত রাখব। তখনতো কোনো সংবিধান ছিল না। তৃতীয়ত. শপথ যে পড়ায় তার স্বাক্ষর থাকে উপরে, আর যে শপথ পড়বে তার স্বাক্ষর থাকবে নিচে। ওখানে দেখবেন আবুল হাশেমের নাম। উনি কি সেখানে উপস্থিত ছিলেন? আবার সৈয়দ নজরুল ইসলাম যত নির্দেশ দিয়েছেন তা গেজেট আকারে পাস হয়েছে। তো একই শপথ নেয়া হলো যেটা গেজেট আকারে পাস হলো, তো একই শপথ পড়াবেন যেটি গেজেট আকারে পাস হবে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। তো শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফেরার পর তো অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নজরুল ইসলাম পদত্যাগ করবেন। শপথ অনুষ্ঠানে নজরুল ইসলামের পদত্যাগের পর শেখ মুজিবুর রহমান শপথ নেবেন, এ জিনিস তো কখনোই হয়নি। নিঝুম মজুমদারের দেয়া একটি ছবি দেখেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন। সেই ছবিটা ব্যবহার করা হয়েছে।

নয়া দিগন্ত : আপনি প্রশ্ন তুলেছেন মিডিয়ার কাজ অ্যাসাসিনেশন করা না, তো করলে জবাবদিহিতা করবে কার কাছে মিডিয়া?

ব্যারিস্টার শাহরিয়ার : অবশ্যই মিডিয়াকে জবাবদিহিতায় আওতায় আসতে হবে। কিন্তু সমস্যাটা হয়ে যাচ্ছে কি, সবাইকেই জবাবদিহিতার মধ্যে আসতে হয়, কিন্তু বিষয় হচ্ছে এজেন্ডা নিয়ে, একটা দেশ যখন সন্ধিক্ষণ পার করছে, তখন এই ধরনের জিনিসগুলো আশা করা উচিত না। মিডিয়া মানুষের কনসেপশন ক্যারি করতে পারছে না। সাধারণ মানুষের চাহিদা ধারণ করতে পারছে না। আমার প্রশ্ন হচ্ছে যিনি সাংবাদিক তিনি তো নির্ভীক, যিনি মানুষের পক্ষে কথা বলবেন, তাকে কেন দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে? পলিটিশিয়ান চলে যাবে কারণ সে করাপ্টেড, কিন্তু আমাদের যে হাত বদল হলো ছত্রিশের পরে, এগুলো কেন হবে? সাংবাদিকতা তো মহান পেশা, সাংবাদিকরা মিরর অব দি সোসাইটি। তারা হচ্ছে, সমাজের আয়না। তফাজ্জ্বল হোসেন মানিক মিয়া, ইত্তেফাকের সেই সময়ে কেন তফাজ্জ্বল হোসেন মানিক মিয়া হলেন, এরা তো এক একটা নাম, লিডারশিপ ছিলেন সারা পৃথিবীতে।

নয়া দিগন্ত : ভারতীয় মিডিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে অব্যাহতভাবে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে, এটা মোকাবেলায় আমাদের মিডিয়া কিছু করছে কি?

ব্যারিস্টার শাহরিয়ার : চট্টগ্রামে জামায়াত নেতা শাজাহান সাহেব কী বললেন সেটা নিয়ে মিডিয়া যত আগ্রহী, অজিত দোভাল কী বলতেছে, তাদের ডিফেন্স মিনিস্টার কী বলতেছে, প্রতিদিন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রপাগান্ডা তৈরি হচ্ছে সেটা মিডিয়ায় আসছে না। এই যে বাসে আগুন দেয়ার সংস্কৃতি এটাকে এনডিটিভি ২০১৩ সালে দেখিয়েছে। এসব অপকর্ম করছে জামায়াত শিবির, এই আগুনসন্ত্রাস সবসময় সৃষ্টি করেছে নানকেরা, এটা নিয়ে কেউ আলোচনা করতে আগ্রহী না। প্রবাসীদের এনআইডি নেই, তারা পাসপোর্ট দিয়ে ভোটার হবেন, এনআইডি ছাড়া কোনো প্রবাসী ভোটার হতে পারছে না, আছে মাত্র তিন দিন, এটা নিয়ে আমাদের মিডিয়ায় আলোচনা করতে আগ্রহী না, চিকেন নেক নিয়ে ভারতের যে আগ্রাসী মনোভাব এটা নিয়ে মিডিয়া কথা বলছে না, আন্তর্জাতিক চুক্তি আছে আপনি সীমান্তের সাত মাইলের মধ্যে কোনো গ্যারিসন করতে পারবেন না, ভারত যেসব গ্যারিসন করছে তা সাড়ে তিন মাইলের মধ্যে, এখানে জেনেভা আইন লঙ্ঘন হচ্ছে তো মিডিয়ায় তো এসব আলোচনায় আসছে না।

নয়া দিগন্ত : ফ্যাসিস্ট শাসকের পতনের পর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা দেখা যাচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর রিকনসিলেশনের কথা শোনা গিয়েছিল...

ব্যারিস্টার শাহরিয়ার : জিয়াউর রহমান রিকনসিলেশন করেছেন। বামফ্রন্ট আর ও মুসলিম লীগের মধ্যে দিয়ে। যেমন শাহ আজিজুর রহমানরা বারবার বলেছেন তাদের রাজনৈতিক স্ট্যান্ডটা তখন ভুল ছিল। আজকে রাজনৈতিক অবস্থান তো ভুল থাকুক, আরো মিথ্যা দিয়ে তাদের অবস্থানকে সঠিক ছিল এটা প্রতিষ্ঠার জন্য মব সংস্কৃতির কথা বলা হচ্ছে। ছত্রিশ জুলাইয়ের আন্দোলনকে মব প্রমাণ করার জন্য তারা সুপরিকল্পিতভাবে এসব করছে। তাদের এই আধিপত্যের কারণে ড. ইউনূস থেকে শুরু করে, এনসিপি থেকে শুরু করে সবাই জুলাই আন্দোলনকে বলছে বিপ্লব, এখন সবাই বিপ্লব থেকে সরে আসছেন অভ্যুত্থানে। এই যে অনুশোচনা নেই, রিকনসিলেশন করবেন কার সাথে? তারপর কনসেপ্ট তৈরি করা হচ্ছে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক। কোনো দলেরই ভোট ব্যাংক থাকে না। একটা পলিসির ওপর নির্ভর করে মানুষ ভোট দেয়।

নয়া দিগন্ত : ভারত ইনক্লুসিভ নির্বাচনের কথা বলে, আবার নির্বাচিত সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, ভবিষ্যতে তো এ শঙ্কা রয়েছে?

ব্যারিস্টার শাহরিয়ার : দেখেন ২০১৩ সালে সুষমা স্বরাজ ঢাকা সফর করে যাওয়ার আগে এয়ারপোর্টে বলে গিয়েছিলেন, গণতন্ত্র মানে হচ্ছে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল নিয়ে নির্বাচন করা। তো সেই সময় তার ইনক্লুসিভ নির্বাচন কোথায় ছিল? আজকে যে দ্বিচারিতা, আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার জন্য ইন্ডিয়া সব সময় চায় পার্টিকুলার একটা দলের সাথে সম্পর্ক গড়তে। ভারতের সম্পর্ক বাংলাদেশের মানুষের সাথে না। প্রতিবেশী বড় দেশ হিসেবে ভারতের উচিত এ দেশের মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা। কিন্তু আওয়ামী লীগকে দিয়ে বাংলাদেশকে যেহেতু সবসময় ভারত করদরাজ্য করতে পেরেছে তাই এ দেশের মানুষের সাথে কোনো সম্পর্ক ভারতের গড়ে উঠেনি।

নয়া দিগন্ত : এই করদ রাজ্য করতে যেয়ে ভারত এ দেশের মানুষের আস্থা হারিয়েছে, বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়ছে...

ব্যারিস্টার শাহরিয়ার : শুধু বাংলাদেশ কেন? শ্রীলঙ্কা, নেপাল, পাকিস্তান বা কোনো প্রতিবেশী দেশের সাথে ভারত নিরপেক্ষ অংশীদারত্ব সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেনি। বাংলাদেশকে শুধু ব্যবহার করা হতো। ইভেন মিয়ানমারের সাথেও ভারতের স্বাভাবিক সম্পর্ক নাই।

নয়া দিগন্ত : তার মানে সার্ক সক্রিয় হচ্ছে না?

ব্যারিস্টার শাহরিয়ার : সার্ক তো ভারতের কারণেই সক্রিয় হচ্ছে না। আমরা তো ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো হতে পারতাম। ভারত যে সিমলা চুক্তি করেছিল সে চুক্তির ল্যাংগুয়েজ বিপজ্জনক, তারা আগের ভারত বর্ষের মতো করে কথাবার্তা বলেছে। বাংলাদেশের অস্তিত্ব নিয়ে ভারত কথা বলেনি। একটা মানুষ সিমলা চুক্তি নিয়ে কথা বলে না। আমার স্বাধীনতা যে সিমলা চুক্তির মধ্যে দিয়ে গিফটেড স্বাধীনতা, সিমলা চুক্তিতে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধকে ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধ হিসেবে দাবি করে রেখে দিলো ঐতিহাসিকভাবে এ কথা আমাদের কোনো মিডিয়া বলতে চায় না।