নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা রক্ষার প্রশ্নে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, জনগণের রায়ের বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি জটিলতা দীর্ঘায়িত হলে জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা বাধাগ্রস্ত হবে।
গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরাম’ আয়োজিত আলোচনা সভায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলমসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানটি জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিকে সামনে রেখে আয়োজন করা হয়। এর আগে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন তথা সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে সরকারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
বিএনপি নায়ক হতে পারত, এখন ভিলেন : তাজুল
আলোচনা সভায় মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বিএনপির কঠোর সমালোচনা করে বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি বারবার জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু সরকার গঠনের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও সনদের একটি অক্ষরও বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাজুল ইসলাম বলেন, ‘বিএনপি নায়ক হতে পারত, কিন্তু তারা এখন ভিলেনে পরিণত হয়েছে।’
তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি তাদের ৩১ দফার প্রথম দফার সাথেও বেইমানি করে জাতীয় আকাক্সক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিচ্ছে। একই সাথে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার অভিযোগ, বিরোধী দলও সংসদে তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারছে না।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা এই সরকারের বিরুদ্ধে নই। দেশের স্বার্থে প্রয়োজন হলে আবার বিএনপিকে নির্বাচিত করব। তাও আপনারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করুন।’
তাজুল ইসলাম বলেন, জাতীয় সংস্কার ও জুলাই সনদ নিয়ে জনগণের মধ্যে যে আস্থা ও প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছে, তা রক্ষায় দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
‘জুলাইকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টা’
সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকারকে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে। তার দাবি- যারা জুলাই ও অন্তর্বর্তী সরকারকে বিতর্কিত করতে চান, তাদের বক্তব্যের সাথে আওয়ামী লীগের বয়ানের মিল রয়েছে।
তিনি বলেন, বিষয়টি শুধু ‘আওয়ামী লীগ দিল্লিতে বসে কাজ করছে’-এভাবে দেখলে হবে না বরং আওয়ামী লীগ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চায়। যারা জুলাই ও অন্তর্বর্তী সরকারকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছেন, তাদের পুরো বয়ানই আওয়ামী লীগের বয়ান বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শফিকুল আলম আরো বলেন, অনেকে অন্তর্বর্তী সরকারকে কটাক্ষ করে আনন্দ পান। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার কোনো রাজনৈতিক সরকার ছিল না- এ বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা দরকার।
তিনি দাবি করেন, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে দেশে ভিন্ন মতের প্রায় ৪০ জনকে হত্যার ঘটনা ঘটেছিল। বিভিন্ন ব্যক্তিকে বাসায় ডেকে হত্যা, খানকায় হত্যাকাণ্ড এবং বাউলদের চুল কেটে দেয়ার ঘটনাও তিনি বক্তব্যে তুলে ধরেন। একই সাথে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখনো সংখ্যালঘুদের জন্য পুরোপুরি নিরাপদ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারেনি।
‘জাতীয় ঐক্য ধরে রাখতে হবে’
গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, দেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্য জরুরি। তার মতে, আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে জাতীয় ঐক্য ধরে রাখতে হবে।
এর আগে ফোরামের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য সৃষ্টি হলেও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে এখন মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। সংগঠনটির আয়োজিত সংলাপগুলোতে নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল, আইনজীবী ও জুলাই আন্দোলনের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন।
মূল বিরোধ বাস্তবায়নের পদ্ধতিতে
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বর্তমান বিতর্কের একটি বড় জায়গা হলো- জনগণের গণভোটের রায় কিভাবে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে কার্যকর করা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব নয়। অন্য দিকে সনদ বাস্তবায়নের দাবিদারদের বক্তব্য, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে, সেটিকে দীর্ঘসূত্রতায় ফেলা যাবে না।
ফলে বিতর্কটি এখন শুধু ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে কি না’- সেখানেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং প্রশ্ন উঠেছে, কোন প্রক্রিয়ায়, কোন সময়সীমায় এবং কার অংশগ্রহণে সনদ বাস্তবায়িত হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন বিএনপি সরকারের জন্যও একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। কারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর জনগণের কাছে দেয়া সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হলে তাদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। একই সাথে সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দল যদি দীর্ঘ সময় ধরে পরস্পরকে দায়ী করতে থাকে, তাহলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছিল, সেটিও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের শনিবারের আলোচনায় বক্তাদের বক্তব্যে তাই একটি বিষয়ে প্রায় অভিন্ন সুর ছিল- রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও গণভোট ও জুলাই সনদের রায়কে ফেলে রাখা যাবে না। এখন দেখার বিষয়, সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো সেই রায় বাস্তবায়নে কত দ্রুত কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য পথ বের করতে পারে।



