পতনেই পুঁজিবাজারের সপ্তাহ শুরু, পতন দিয়েই শেষ

- তৈরী পোশাক শিল্পকে পুঁজিবাজারমুখী করার উদ্যোগ

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সূচকের বড় পতনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া দেশের পুঁজিবাজার সপ্তাহ শেষও করেছে সূচকের পতনের মধ্য দিয়ে। গতকাল বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে দেশের দুই পুঁজিবাজারে সবগুলো সূচকের কমবেশি অবনতি ঘটে। এর আগে সপ্তাহের মোট পাঁচ কর্মদিবসের চারটিতেই পতন ঘটে সূচকের। মাঝখানে একদিন ঢাকা বাজারের প্রধান সূচকটি নামমাত্র উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হলেও বাজারের বাদবাকি সূচকগুলোর অবনতি ঠেকানো যায়নি। পুঁজিবাজারের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নেয়া নানা উদ্যোগও বাজারের চলমান এই সঙ্কট নিরসনে কোনো কার্যকর ফল বয়ে আনতে পারেনি।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজার খুবই স্পর্শকাতর জায়গা। দেশের অর্থনীতি গতিপ্রকৃতির সাথে সমন্বয় রেখেই পুঁজিবাজারের আচরণ নির্ণিত হয়। তাই পুঁজিবাজারকে অর্থনীতির আয়না বলা হয়। দেশের সার্বিক অর্থনীতি ভালো চললে পুঁজিবাজারও ভালো পারফর্ম করে। সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতের সঙ্কটে দেশের অর্থনীতি একপ্রকার স্থবির হয়ে আছে। এ অবস্থায় পুঁজিবাজার ভালো পারফর্ম করবে এমনটি আশা করা বাতুলতা মাত্র। কারণ তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো হয় শিল্প নয়তো সেবা খাতের। তাই বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতের চলমান যে সঙ্কট তার প্রভাব থেকে এ দু’টি খাত মুক্ত থাকতে পারে না। ফলশ্রুতিতে পুঁজিবাজারও তার স্বাভাবিক গতি ধরে রাখতে পারছে না।

প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ২২ দশমিক ৭১ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ৫৩৭ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল লেনদেন শেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৫১৫ দশমিক ১৫ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৭ দশমিক ৭১ ও ৫ দশমিক ৭৬ পয়েন্ট। দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ১ দশমিক ০৯ পয়েন্ট হারায়। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স হারায় যথাক্রমে ১১ দশমিক ১২ ও ১৪ দশমিক ৮৪ পয়েন্ট।

এ দিকে দেশের তৈরি পোশাক খাতের অর্থায়নের পরিধি বাড়াতে পুঁজিবাজারের সুযোগ কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যাংকঋণের পাশাপাশি খাতটিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে কাজে লাগানোর কথা বলছেন তারা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসি ও সুইসকন্ট্যাক্টের যৌথ উদ্যোগে ‘এক্সপ্যান্ডিং আরএমজিস ফাইন্যান্সিং হরাইজনস : অপরচুনিটিজ ইন দ্য ক্যাপিটাল মার্কেট’ শীর্ষক কর্মশালায় এসব কথা উঠে আসে। ডিএসইর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানা যায়।

কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার, প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ড. মো: আসিফুর রহমান, সুইসকন্ট্যাক্ট বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর সৈয়দা ইসরাত ফাতিমা, সুইসকন্ট্যাক্টের প্রগ্রেস প্রকল্পের টিম লিডার ফারজানা আমিন, ইন্সপায়ার প্রকল্পের টিম লিডার বিধোরা তাহমিন খান, বিকেএমইএর ডেপুটি সেক্রেটারি মো: হারুনূর রশিদ, বিএমবিএ ও লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্টসের সিইও ইফতেখার আলম এবং ডিএসইর মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ডিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার সাইয়িদ মাহমুদ জুবায়ের।

কর্মশালার শুরুতে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার বলেন, পুঁজিবাজার শুধু বিনিয়োগের মাধ্যম নয়; দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণে এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তিনি বলেন, পুঁজিবাজারকে শুধু আইপিও বা ইকুইটি মার্কেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বন্ডসহ বিভিন্ন ধরনের অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে দেশে কার্যকর বন্ড মার্কেট গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হলেও বর্তমান কমিশন ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের উদ্যোগে এ খাতে নতুন করে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

নুজহাত আনোয়ার আরো বলেন, বেসরকারি খাতের অর্থায়নের চাহিদা ও পুঁজিবাজারের অর্থায়ন সমতার মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান দূর করা জরুরি। একই সাথে অর্থায়নের েেত্র বিদ্যমান নীতিগত ও নিয়ন্ত্রক সীমাবদ্ধতাগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার এবং পুনঃঅর্থায়নের সুযোগ আরো কার্যকর করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন ও বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে পুঁজিবাজারের বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা এবং তা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেয়াই এ ধরনের আলোচনার মূল ল্য। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত ও প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে একটি কার্যকর, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে ডিএসই কাজ করছে।

সুইসকন্ট্যাক্টের টিম লিডার ফারজানা আমিন দুই দশক ধরে প্রতিষ্ঠানটি আরএমজি খাতের উন্নয়নে সহযোগিতা করে আসছে জানিয়ে বলেন, খাতটিতে টেকসই করতে ব্যাংকঋণের পাশাপাশি পুঁজিবাজারভিত্তিক অর্থায়নের সম্ভাবনাও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ছাড়া পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণে আগ্রহী আরএমজি খাতকে ভবিষ্যতে এন্ড-টু-এন্ড সহায়তা দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে রোল মডেল হিসেবে গড়ে তোলার ল্য রয়েছে, যাতে তাদের সাফল্য দেখে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও পুঁজিবাজারভিত্তিক অর্থায়নে উৎসাহিত হয়।

বিকেএমইএর ডেপুটি সেক্রেটারি মো: হারুনূর রশিদ বলেন, দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো অর্থায়ন এখনো ব্যাংকনির্ভর। ফলে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে না। এ অবস্থায় পুঁজিবাজার হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি কার্যকর বিকল্প উৎস। ভালো ও সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা হলে ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় রাখতে তালিকাভুক্তির পরও প্রতিষ্ঠানগুলোর টেকসই ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা জরুরি।

পরে নতুন বিধিমালার অধীনে সম্ভাব্য ইস্যুয়ারদের তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে বিএমবিএর সভাপতি ও লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্টসের সিইও ইফতেখার আলম আলোচনা করেন। তিনি আইপিওর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সুবিধা, পুঁজিবাজারের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ এবং ইকুইটি মূলধন সংগ্রহের বিভিন্ন সুযোগ তুলে ধরেন। তিনি মূল বোর্ডের আইপিও ও এসএমই বোর্ডের কিউআইওর যোগ্যতা, কোম্পানি মূল্যায়ন, তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়া, সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার, সাবস্ক্রিপশন, শেয়ার বরাদ্দ ও লকইন বিধানসহ দ্রুত ও কার্যকর আইপিও প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

সমাপনী বক্তব্যে ডিএসইর প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ড. মো: আসিফুর রহমান বলেন, উদ্যোক্তাদের পুঁজিবাজারে আসতে ডিএসইর অ্যাডভাইজরি সার্ভিসের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও ওয়ান-টু-ওয়ান কাউন্সেলিং দেয়া হচ্ছে। একই সাথে পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা, নির্ভরযোগ্য তথ্য আদান-প্রদান এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরায় ডিএসই কাজ করছে। অংশীজনদের সাথে সমন্বিতভাবে একটি স্বচ্ছ, গতিশীল ও প্রাণবন্ত পুঁজিবাজার গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।