- ডায়ালাইসিস, অক্সিজেন চলছে
- নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন চিকিৎসকরা, দিচ্ছেন সর্বোচ্চ সাপোর্ট
- শারীরিক অবস্থা বিদেশে নেয়ার উপযোগী নয়
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়নি। নিউমোনিয়ার ফলে তার হার্ট ও ফুসফুসে যে ইনফেকশন হয়েছে, সেটি নিয়ন্ত্রণে আনতে চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। শরীরে অতিরিক্ত পানি জমে যাওয়ায় তা কমাতে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করা হচ্ছে। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে দেয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন। তবে তার শরীর ক্রিয়াশীল রয়েছে। হাত-পা কিছুটা নাড়াচাড়া করতে পারছেন। দুই-একটি কথাও বলছেন। শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে বেগম জিয়াকে আবারো বিদেশে নেয়া হতে পারে। পরিবার ও দল সেই প্রস্তুতি শুরু করেছে। তবে বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থা বিদেশে নিয়ে যাওয়ার উপযোগী নয় বলে গতকাল বিকেলে জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
মেডিক্যাল বোর্ডের একাধিক চিকিৎসক ও বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত ২৩ নভেম্বর হার্ট ও ফুসফুসে সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হবার পর থেকেই বেগম জিয়াকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। প্রথমে তাকে কেবিনে রাখা হলেও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে পরে সিসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। মেডিক্যাল বোর্ডের চিকিৎসকরা বলতে গেলে নির্ঘুম দিনরাত পার করছেন। স্বাস্থ্যের প্যারামিটারগুলো ২৪ ঘণ্টাই মনিটর করা হচ্ছে।
বোর্ডের একজন চিকিৎসক আলাপকালে জানিয়েছেন, ধারাবাহিক ডায়ালাইসিসে আছেন বেগম খালেদা জিয়া। কারণ তার শরীরে অতিরিক্ত পানি জমেছে। এই অবস্থার মূল কারণ হলো হৃৎপিণ্ডের মাইট্রাল ভাল্ব শক্ত হয়ে গেছে, ফলে হৃৎপিণ্ড রক্ত পাম্প করে শরীরের অঙ্গে পাঠাতে পারছে না। পাম্প করার সময়ে রক্ত ভাল্ব দিয়ে লিক করে শরীরে থেকে যাচ্ছে, যা থেকে ওনার ডান দিকের হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। এর পাশাপাশি তিনি সংক্রমণজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ায় এক জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যে পরিস্থিতিতে সংক্রমণের বিরুদ্ধে ওনার শরীর অত্যধিক ও ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। এর বাইরে তীব্র অগ্ন্যাশয় প্রদাহে আক্রান্ত হওয়ায় তার অবস্থা জটিল হয়ে গেছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান জানিয়েছেন, চিকিৎসকরা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তার মেডিক্যাল বোর্ডে বিদেশী চিকিৎসকেরাও রয়েছেন। তারাও বেগম জিয়ার স্বাস্থ্যের প্যারামিটারগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। যখন যে চিকিৎসার প্রয়োজন হচ্ছে তা দেয়া হচ্ছে।
এ দিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন গতকাল শনিবার এক ফেসবুক পোস্টে বলেছেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার সামান্য উন্নতি হলেই তাকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে পরিবারের। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের জন্য কাতার দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
মাহদী আমিন লিখেছেন, ‘আমরা যতটুকু শুনেছি, দেশবাসীর দোয়া ও ভালোবাসায় সিক্ত আপসহীন নেত্রীর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তাকে লন্ডনে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার পরিকল্পনা করছে জিয়া পরিবার। এই বছরেই লন্ডনের যে হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের অধীনে চার মাস থেকে তিনি অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন, তাদের সাথে ইতোমধ্যে যোগাযোগ করেছেন তারেক রহমান ও তার স্ত্রী।’ এ জন্য সেখানে নিতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত একটি বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করার উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মাহদী আমিন লিখেন, খালেদা জিয়া এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও তার চিকিৎসা মূলত দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি চিকিৎসকদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন তারেক রহমান ও তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান।
খালেদা জিয়ার সাবেক প্রেস সেক্রেটারি মারুফ কামাল খানও গতকাল এক ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন, ‘শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার উল্লেখ করার মতো তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। নানান জটিল রোগে আক্রান্ত ম্যাডাম জিয়ার নিউমোনিয়া ও আরো কিছু গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়ায় তাকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার হৃদযন্ত্র ও ফুসফুস সংক্রমিত হওয়ায় শ্বাসকষ্ট ছাড়াও অগ্ন্যাশয় ও বৃক্কে পানি জমেছে এবং তা ঝুঁকি নিয়ে অপসারণ করছেন চিকিৎসকগণ। তিনি সেখানে করোনারি কেয়ার ইউনিটে রয়েছেন চিকিৎসকদের সার্বক্ষণিক নিবিড় পর্যবেক্ষণে। তার চিকিৎসক টিম ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও গণচীনের বিশেষজ্ঞ রোগ-বিশারদদের সাথে অনলাইনে যোগাযোগ রেখে তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিচ্ছেন। তার যুক্তরাজ্য প্রবাসী পুত্র, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা সমন্বিত উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে লন্ডন কিংবা সিঙ্গাপুর নিতে আগ্রহী। গণচীনের তরফ থেকেও তাকে সে দেশে নেয়ারও প্রস্তাব রয়েছে। পরিবার ও দলের তরফ থেকে এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সের জন্য কুয়েত ও সিঙ্গাপুরে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তবে সব কিছুই নির্ভর করছে সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা
গতকাল অসুস্থ খালেদা জিয়ার খোঁজখবর নিতে এভারকেয়ার হাসপাতালে গিয়ে সাংবাদিকদের নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, খালেদা জিয়াকে সিঙ্গাপুর বা ইউরোপে নেয়ার প্রস্তুতি চলছে। তবে এখন তিনি ফ্লাই করার মতো শারীরিক পরিস্থিতিতে নেই।
হাসপাতালে ভিড় না করার অনুরোধ : খালেদা জিয়াকে দেখতে গিয়ে হাসপাতালের অন্যান্য রোগী এবং খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় সমস্যা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
গতকাল এক জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘অনেকে আবেগ থেকে হাসপাতালে যাচ্ছেন, শ্রদ্ধা থেকে যাচ্ছেন সেটা আমরা জানি। তবুও এর ফলে যাতে অন্যান্য রোগীর অসুবিধা না হয় এজন্য হাসপাতালে ভিড় না করার অনুরোধ করছি। নিজ নিজ অবস্থানে থেকে তার রোগমুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করার আহ্বান জানাচ্ছি।’
খালেদা জিয়ার পরিবার এবং বিএনপির পক্ষ থেকে এমন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিএনপির নেতারা ছাড়াও খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে গতকাল হাসপাতালে যান বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহসহ আরো অনেকে। হাসনাত আব্দুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আল্লাহ যেন বেগম খালেদা জিয়াকে শেখ হাসিনার ফাঁসি দেখার সৌভাগ্য দেন।’ তিনি বলেন, ‘আল্লাহ যেন ওই জিনিসটা (শেখ হাসিনার ফাঁসি) বেগম খালেদা জিয়াকে দেখায়, যার কারণে তার আজকে এই পরিণতি হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে সঠিক চিকিৎসা নিতে দেয়নি। যদি কোনো ডাক্তার তার চিকিৎসা করতে আসতেন, তখন তাকে হয়রানি করা হতো। এভাবে ক্রমেই তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে।’
এনসিপি নেতা আরো বলেন, ‘দল-মত নির্বিশেষে দেশবাসী বেগম খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া করছে। তিনি যাতে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং ফ্যাসিস্ট খুনি হাসিনার ফাঁসি যেন তিনি দেখতে পান আপনারা সবাই তার জন্য দোয়া করবেন।’
এ দিকে বেগম জিয়ার সুস্থতার জন্য দল-মত নির্বিশেষে দোয়া অব্যাহত রয়েছে। বেগম জিয়ার সুস্থতা কামনায় ফেসবুকে শুক্রবার থেকে পোস্ট দিচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। বলতে গেলে, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন দেশের সবাই।



