বেকারত্ব ও শিক্ষা খাতের নৈরাজ্যে চরম অনিশ্চয়তায় তরুণ প্রজন্ম

দেশে বেকারত্বের হার তুলনামূলকভাবে কম দেখালেও উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেই বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ এবং বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ। সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক জরিপে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বেকারের সংখ্যা ধরা হয়েছে ২৬ লাখ ৬০ হাজার। তবে এই পরিসংখ্যান নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, সরকারের হিসাব প্রকৃত বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না। ১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশে মাত্র ২৬-২৭ লাখ বেকার এই সংখ্যা বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক।

Printed Edition

হারুন ইসলাম

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এই বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ওপর ভর করেই দীর্ঘদিন ধরে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক সুফলের স্বপ্ন দেখেছিল দেশ। ধারণা ছিল, সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে তরুণ শক্তিকে কাজে লাগানো গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে, কমবে দারিদ্র্য ও বৈষম্য। কিন্তু বাস্তবতায় সেই সম্ভাবনা ক্রমেই অনিশ্চয়তায় পরিণত হচ্ছে। বেকারত্ব, নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং শিক্ষা খাতের নৈরাজ্যে তরুণ প্রজন্ম আজ গভীর হতাশা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

শিক্ষা বৈষম্য ও কর্মসংস্থানের সঙ্কটকে কেন্দ্র করে যে গণ-অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে, তার পর তরুণদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনিক ধীরগতি, নীতিগত অস্পষ্টতা ও বাস্তব সংস্কারের অভাবে সেই প্রত্যাশা দ্রুতই ভেঙে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হতাশা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শুধু ব্যক্তিগত জীবনের নয়, সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।

বেকারত্বের প্রকৃত চিত্র : সংখ্যার আড়ালে বাস্তবতা

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বেকারত্বের হার তুলনামূলকভাবে কম দেখালেও উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেই বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ এবং বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ। সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক জরিপে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বেকারের সংখ্যা ধরা হয়েছে ২৬ লাখ ৬০ হাজার।

তবে এই পরিসংখ্যান নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, সরকারের হিসাব প্রকৃত বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না। ১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশে মাত্র ২৬-২৭ লাখ বেকার এই সংখ্যা বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক। মূল সমস্যা ‘বেকার’-এর সংজ্ঞা নিয়ে। যারা কোনোভাবে খণ্ডকালীন বা অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে যুক্ত, কিংবা নিজের যোগ্যতার তুলনায় অনেক নিচু মানের কাজে নিয়োজিত তারা সরকারি হিসেবে বেকার নন। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠী কার্যত ছদ্মবেকার।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দেশে প্রায় এক কোটির মতো মানুষ পড়াশোনা করছেন না, আবার স্থায়ী ও মানসম্মত কাজেও নেই। প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ নতুন মানুষ প্রবেশ করলেও তাদের বড় একটি অংশের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। সরকারি হিসাবে বেকারের সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকার অর্থ হচ্ছে যত মানুষ শ্রমবাজারে ঢুকছে, ঠিক ততজনই কোনো না কোনোভাবে কাজে যুক্ত হচ্ছে। কিন্তু কাজের মান, আয় ও নিরাপত্তা প্রশ্নের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব ও আন্দোলনের প্রেক্ষাপট

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল প্রেক্ষাপট ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার ও কোটা বাতিলের দাবি। কারণ শিক্ষিত তরুণদের মধ্যেই বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। কিছু গবেষণায় যা প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও চাকরি না পাওয়া কিংবা দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার পেছনে ছুটতে থাকা তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা জমতে থাকে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শুধু কর্মসংস্থানের সঙ্কট নয়; এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা। এক দিকে প্রতি বছর লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট তৈরি হচ্ছে, অন্য দিকে শিল্প ও সেবা খাতে সেই দক্ষতার চাহিদা তৈরি হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত তরুণরা এক ধরনের ‘ওয়েটিং রুমে’ আটকে যাচ্ছেন।

নিয়োগ জট ও ‘ফ্রাইডে সিনড্রোম’

চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য আরেক বড় সঙ্কট হয়ে উঠেছে নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিশৃঙ্খলা। প্রায়ই দেখা যায়, শুক্রবার বা ছুটির দিনে একই সময়ে একাধিক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যাকে চাকরিপ্রত্যাশীরা বলছেন ‘ফ্রাইডে সিনড্রোম’। এতে বাধ্য হয়ে একজন প্রার্থীকে একাধিক পরীক্ষার মধ্যে একটি বেছে নিতে হয়। বাকি পরীক্ষাগুলোর আবেদন ফি ও প্রস্তুতির খরচ সম্পূর্ণই অপচয় হয়ে যায়।

চাকরিপ্রত্যাশীরা জানান, বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে একেকটি পরীক্ষার আবেদন ফি ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা, যা নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বড় বোঝা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে রেলওয়ে, খাদ্য অধিদফতরসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের হাজার হাজার পদের পরীক্ষা দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা। বিসিএস পরীক্ষার দীর্ঘসূত্রতা, প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষা বাতিলের ঘটনা সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) প্রতি আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি করেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) বিভিন্ন পর্যবেক্ষণেও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব, অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এসেছে, যা তরুণদের হতাশা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

শিক্ষা খাতে ব্যয়বৃদ্ধি ও সেশন জট

শুধু চাকরি নয়, শিক্ষা খাতেও তরুণরা চরম অনিশ্চয়তার মুখে। অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির প্রভাবে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সেমিস্টার ফি, সেশন চার্জ ও উন্নয়ন ফি বাড়িয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ফি বৃদ্ধির পেছনে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে মধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্ত পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা চালিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন, কেউ কেউ বাধ্য হচ্ছেন মাঝপথে শিক্ষাজীবন ছাড়তে।

অন্য দিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক সংস্কার, আবাসন সঙ্কট ও প্রশাসনিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফলে সেশন জট দীর্ঘায়িত হচ্ছে। হলের সিট বণ্টনে রাজনৈতিক দখলদারিত্ব, গবেষণা ও একাডেমিক পরিবেশের ঘাটতি এবং শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষার্থীরা।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে সঙ্কট ও সমাধানের পথ

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকি বলেন, “আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও চাকরির বাজারের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতি বছর হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে, কিন্তু তাদের দক্ষতা বাজারের চাহিদার সাথে মিলছে না। এটিই ‘স্কিল মিসম্যাচ’। এখনই কারিকুলাম সংস্কার ও শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা না আনলে আমরা একটি ‘বোঝা প্রজন্ম’ তৈরি করব।”

শ্রমবাজার ও অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুস সালাম বলেন, “বেকারত্ব এখন জাতীয় দুর্যোগে রূপ নিচ্ছে। বেসরকারি খাতে চাকরির নিরাপত্তা নেই, বেতন কাঠামোও বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে তরুণদের সরকারি চাকরির প্রতি অতি মাত্রায় ঝোঁক তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিয়োগ প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে থমকে যাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু এটি দীর্ঘায়িত হলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে। শুধু চাকরি দিয়ে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সম্ভব নয়; উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।”

লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট ইমতিয়াজ মির্জা মনে করেন, কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দ্রুত ফলদায়ক কাঠামো দরকার। তিনি বলেন, “কো-অপ এডুকেশন প্রোগ্রাম এখানে একটি ‘গেম চেঞ্জার’ হতে পারে। এতে সরকারকে সরাসরি লাখ লাখ চাকরি তৈরি করতে হবে না; বরং নীতিনির্ধারক ও ফ্যাসিলিটেটরের ভূমিকা নিতে হবে। যারা কো-অপ সুযোগ দেবে, তাদের প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে।”

তিনি আরো বলেন, “শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে, মেধাবীরা দেশ ছাড়ছেন। এর মূল কারণ শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের ফারাক। কো-অপ এডুকেশন এই ফারাক কমাতে পারে। তরুণেরা দেশেই থাকতে চান, কিন্তু চান মেধার সঠিক ব্যবহার ও ন্যায্য মূল্য। কো-অপ হতে পারে কর্মসংস্থান, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ব্রেইন ড্রেইন রোধের একটি সমন্বিত সমাধান।”

অনিশ্চয়তার ভবিষ্যৎ

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সঙ্কট অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ তার জনমিতিক সুফল হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। হতাশ তরুণ প্রজন্ম সামাজিক অস্থিরতা, মেধাপাচার ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণ হয়ে উঠতে পারে। এখনই শিক্ষা সংস্কার, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা বিকাশে সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ আরো অনিশ্চিত হয়ে উঠবে।