প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের অবহেলা বৃদ্ধ মায়ের করুণ বিদায়

কেউ নেয়নি খোঁজ মৃত্যুর ৭ দিন পর পচা লাশ উদ্ধার

আব্দুল কাইয়ুম
Printed Edition

এক সময় সন্তানদের পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন, জীবনের শেষ দিনগুলোতে চরম অবহেলা আর একাকীত্বের অন্ধকারে হারিয়ে গেলেন ৭৫ বছর বয়সী মা নূর জাহান বেগম। রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে একটি ফ্ল্যাট থেকে তার পচা-গলা এবং পোকায় ধরা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। একই ফ্ল্যাটের পাশের রুমে থাকলেও মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি জানতেন না মেয়ে। এমনকি প্রতিষ্ঠিত ছেলেরাও দীর্ঘদিন ধরে মায়ের কোনো খোঁজ রাখেননি।

জীবনের শেষ সময়ে নূর জাহান বেগম ছিলেন সম্পূর্ণ একা। নিজের ফ্ল্যাটে তার লাশ পড়ে ছিল সাত দিন। কেউ খোঁজও নেয়নি। কেউ দরজায় কড়া নাড়েনি। কেউ ফোন করে জানতে চায়নি মা, তুমি কেমন আছো? শেষ পর্যন্ত প্রতিবেশীরা পচা গন্ধ পেয়ে বুঝতে পারেন, এই বৃদ্ধা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন অনেক আগেই। ভেতর থেকে একটা তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছিল পুরো করিডোরে। যে মা সন্তানদের একটুখানি নিরাপদ রাখতে নিজের পুরোটা জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন, শেষ সময়ে তার কপালে হাত বুলিয়ে দেয়ার মতো কেউ ছিল না। শরীরটা পচে-গলে গেছে, খেয়েছে পোকা।

পুলিশ জানায়, ওই বৃদ্ধা তার মেয়ের কাছে থাকতেন। মেয়ে তার পাশের রুমেই থাকতো। মেয়েটা মানসিকভাবে হয়তো একটু অসুস্থ। বাসাটি একদম নোংরা। সেখানে একটা রুমে বৃদ্ধা ওই নারী থাকতেন। তার দেখাশোনার জন্য একজন নার্সকে ডাকা হয়েছিল। নার্স এসে দেখেন ওই বৃদ্ধা অনেক আগেই মারা গেছেন। পরে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বরে কল করে বিষয়টি জানান তিনি। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই বৃদ্ধার পোকা ধরা লাশ দেখতে পায়। মায়ের সাথে একই বাসায় পাশাপাশি রুমে বসবাস করলেও মৃত্যুর বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবগত করেননি মেয়ে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, উদ্ধারের অন্তত সাত থেকে আট দিন আগে তার মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওই বৃদ্ধার সন্তানের কেউ মৃত্যুর বিষয়টি জানে না। বড় ছেলে এ কে এম আনিসুর রহমান সরকারের একজন যুগ্ম সচিব। অন্য আরেক সন্তান কে এম আশিকুর রহমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক, এক সন্তান কে এম আতিকুর রহমান কানাডা প্রবাসী এবং মেয়ে ফাতেমা নাসরিন সুলতানা স্কুলের শিক্ষিকা। নূর জাহান বেগমের ছেলেরা আলাদা থাকতেন। মায়ের সাথে কোনো যোগাযোগ ছিল না তাদের। তবে মায়ের পাশের কক্ষে বসবাস করা মেয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ। ওই বৃদ্ধার স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন।

এ ঘটনা জানাজানির পর সোশ্যাল মিডিয়ায় সচেতন মানুষরা মন্তব্য করেন, আমরা সন্তানদের বড় মানুষ বানাতে চাই, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, সচিব বানাতে চাই। কিন্তু একটা বিষয় যেন ভুলে যাচ্ছি বাবা-মায়ের পাশে থাকার শিক্ষা। সাফল্য তখনই অর্থহীন হয়ে যায়, যখন সেই সাফল্যের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মানুষ নিজের জন্মদাত্রী মায়ের নিঃসঙ্গতা দেখতে পায় না। তার নীরব মৃত্যু আমাদের সমাজকে একটা কঠিন প্রশ্ন করে গেছে। আমরা কি সত্যিই উন্নত হচ্ছি, নাকি শুধু প্রতিষ্ঠিত হচ্ছি? মা-বাবা বৃদ্ধ হলে তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন টাকা নয়, প্রয়োজন একটু সময়, একটু খোঁজখবর, আর আপনজনের উপস্থিতি। যাদের মা-বাবা এখনো বেঁচে আছেন, আজই একটা ফোন করুন। সম্ভব হলে গিয়ে জড়িয়ে ধরুন। কারণ, একদিন ফোন দেয়ার মানুষটিই হয়তো আর থাকবেন না।

এ বিষয়ে জানতে নূর জাহান বেগমের মেয়ে ফাতেমা নাসরিন সুলতানার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

পল্লবী থানার ওসি মো: হাসান বাসির বলেন, ওই বৃদ্ধার দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা নার্স রোববার জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন দিলে ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ পচা-গলা, পোকায় ধরা লাশটি উদ্ধার করে। ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ দেখতে পায়, পুরো বাসাটি নোংরা, অগোছালো, দুগর্ন্ধে ভরা। লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। স্বজনরা এরই মধ্যে লাশ দাফন করেছে। এ ঘটনায় মৃত নারীর মেয়ে বাদি হয়ে থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করেছেন।

বৃদ্ধার পরিবারের অন্য সদস্যদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কি বলবো, এবনরমাল টাইপ (অস্বাভাবিক ধরনের) সব ভাইবোনরা। উনার যে ছেলে বুয়েটের টিচার, তাকে বললাম আপনার বড় ভাইয়ের মোবাইল নম্বর দেন, তিনি আমাকে দেখি একটা সিটি সেল নম্বর বের করে দিছেন। সেই ২০১১ সালে যে সিটি সেল বন্ধ হয়ে গেছে। মানে ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের কোনো যোগাযোগ নাই। তার কাছে তার ভাইয়ের কোনো কারেন্ট ফোন নম্বর নেই।

এমন ঘটনা নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ও ইউজিসির সদস্য মো: আনোয়ার হোসেন বলেন, এ ধরনের মৃত্যুর বিষয়টি আমাদের জন্য খুবই কষ্টের। ভোগবাদ বা নিজেকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অন্যকে বাদ দিয়ে চিন্তা করতে ব্যস্ত সমাজের মানুষ। এসব করতে গিয়ে কিভাবে টাকা আয় করতে হয় সেই চিন্তায় মগ্ন থাকে। মানুষ যখন মানসিক ও মূল্যবোধের জায়গা থেকে সরে নিজেকে নিয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত থাকে তখন অন্যকে নিয়ে ভাবার সময় তাদের কাছে থাকে না। এসব কারণেই মিরপুরের ঘটনাটি ঘটেছে।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে অভিভাবকরা তাদের সন্তানকে পড়াশোনা করানোর আগেই চিন্তা করেন কোন বিষয়ে পড়ালে বেশি টাকা আয় করা যাবে। এতে করে আদর্শ ও নীতি নৈতিকতা থেকে তারা দূরে সরে যায়। তাই শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনা দরকার। যে শিক্ষা নীতি নৈতিকতার সাথে সম্পর্কিত নয়, সেটি কখনো কাজে আসবে না। পারিবারিক মূল্যবোধ ও আদর্শ ফিরিয়ে আনতে পারলে এমন কার্যক্রম কমে আসবে।