ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতা যত বাড়ছে, ততই সামনে আসছে ভোট কেনাবেচা ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ। বিভিন্ন এলাকায় নগদ টাকা বিতরণ, উপহার দেয়া, গোপনে ভোটারদের সাথে যোগাযোগসহ নানা অভিযোগ সামনে আসছে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে। যদিও সেখানে বেশির ভাগ অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। এ দিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলছে, সুস্পষ্ট অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই আচরণবিধি কার্যকর রয়েছে। এই সময়ে প্রার্থী বা তাদের সমর্থকদের কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা, উপহার বা প্রতিশ্রুতি দেয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে। কিন্তু বিভিন্ন এলাকায় এর ব্যত্যয়ের অভিযোগ উঠছে। বিশেষ করে রাজধানী ও কয়েকটি বিভাগীয় শহরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিও নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
নির্বাচন ঘিরে ভোট কেনাবেচা ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ কিছু অপতথ্যও ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন ফেসবুক পোস্ট, ইউটিউব ভিডিও ও অনলাইন পেজে দাবি করা হয়েছে- নির্দিষ্ট এলাকায় রাতের আঁধারে বিপুল পরিমাণ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। কিছু পোস্টে এমনও দাবি করা হয়েছে যে প্রশাসনের কিছু সদস্য নীরবে এসব কার্যক্রমে সহায়তা করছেন। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
রাজধানীর বাইরেও একাধিক আসনে রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নগদ অর্থ বিতরণ, সংখ্যালঘু ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলেছে। যদিও অভিযুক্ত পক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। স্থানীয় প্রশাসন অবশ্য কোনো অভিযোগের সত্যতা পায়নি।
গতকাল ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির বেলাল উদ্দিনকে সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকাসহ আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যদিও তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। জামায়াতের দাবি, তার ব্যবসায়িক টাকা নিয়ে তিনি যাচ্ছিলেন। ঢাকা এয়ারপোর্ট তাকে অনাপত্তিপত্র দিয়েছে। কুমিল্লাতেও একই ঘটনা ঘটেছে। জামায়াতের এক সমর্থককে দুই লাখ টাকা সমেত ধরা হয়েছে। যদিও তার ব্যাপারেও সুস্পষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, সরাসরি নগদ অর্থ দেয়া যেমন অপরাধ, তেমনি পরোক্ষভাবে সুবিধা দেয়াও আচরণবিধির লঙ্ঘন। নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে কেউ ভোটারদের টাকা, উপহার বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা দিতে পারবেন না। এমনকি নির্বাচনের আগে জনসাধারণের মাঝে অনুদান বিতরণও নিষিদ্ধ। আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে জরিমানা, প্রার্থিতা বাতিল বা কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। তবে শুধু টাকা দেখলেই তাকে আটক করা, নতুন ইস্যুর জন্ম দেয়া। এখানে প্রশাসনকে ক্লারিফিকেশন (পরিষ্কার বার্তা) দিতে হবে। ব্যাংকসহ সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কারো কাছে নগদ টাকা থাকাটা স্বাভাবিক। এখানে সব কিছুই খতিয়ে দেখা উচিত।
সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গেছে, অচেনা স্থানে নগদ টাকা গোনা হচ্ছে বা খামে ভরা হচ্ছে- এগুলোকে নির্বাচনী তহবিল থেকে ভোট কেনার প্রস্তুতি বলে প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু ভিডিওগুলোর সময়, স্থান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। একইভাবে, একটি অডিও ক্লিপে কথোপকথনের অংশ ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে কথিতভাবে ভোটারদের প্রভাবিত করার পরিকল্পনার কথা শোনা যায়। পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেন, অডিওটি সম্পাদিত এবং বিকৃত। এ ছাড়া কিছু ভুয়া তালিকা সামাজিক মাধ্যমে ঘুরছে, যেখানে নির্দিষ্ট দলের নামে কথিত ‘ভোটার পেমেন্ট তালিকা’ প্রকাশ করা হয়েছে। তালিকায় মোবাইল নম্বর ও টাকার অঙ্ক উল্লেখ থাকলেও যাচাই করে দেখা গেছে, অনেক নম্বরই অকার্যকর বা ভিন্ন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত। কয়েকজন ভোটার প্রকাশ্যে বলেছেন, তাদের নাম ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক জানান, ভোট কেনাবেচার অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লেনদেন গোপনে হয়। তবে ভিডিও, অডিও, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য বা প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য প্রমাণ হিসেবে কাজে আসতে পারে। তারা বলেন, অভিযোগ থাকলে দ্রুত তদন্ত করা জরুরি। নইলে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। তবে কারো কাছে টাকা পাওয়া গেলেই অভিযুক্ত হিসেবে আটক করা আইনি কাঠামোতে ঠিক নয়।
নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আবুল ফজল মো: সানাউল্লাহ বলেছেন, অভিযোগ এলে তা স্থানীয় নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচার কমিটিতে পাঠানো হয়। প্রমাণ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিছু রাজনৈতিক নেতা অভিযোগ করেছেন- ইসি অবহিত থাকার পরও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তবে ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রমাণ ছাড়া সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া যায় না। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেবে কমিশন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভোট কেনাবেচার অভিযোগ নতুন কিছু নয়। অতীতেও বিভিন্ন নির্বাচনে এ ধরনের অভিযোগ উঠেছে। তবে এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে ঘটনা দ্রুত প্রকাশ্যে চলে আসে। এতে এক দিকে স্বচ্ছতা বাড়ছে, অন্য দিকে গুজব ছড়ানোর ঝুঁকিও থাকছে। তাই প্রতিটি অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে দেখা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, নির্বাচনের আগে উত্তেজনা বাড়ানোর জন্য প্রতিপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে অভিযোগ তুলছে। তবে নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, অভিযোগ যতই হোক, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।


