রুট ও সময়ের পরিবর্তন এক নজরে
সূচক - বর্তমান রুট (আখাউড়া হয়ে) - প্রস্তাবিত রুট (কর্ড লাইন) - সম্ভাব্য সাশ্রয়
রেলপথের দূরত্ব -- প্রায় ৩২০ কিমি. -- ২৩০-২৪০ কিমি. -- ৮০-৯০ কিমি.
যাত্রীবাহী ট্রেনের সময় -- ৫-৬ ঘণ্টা -- ৩-৩.৫ ঘণ্টা -- ২-২.৫ ঘণ্টা
পণ্যবাহী ট্রেনের সময় -- ১২-১৫ ঘণ্টা -- ৭-১০ ঘণ্টা -- ৪-৫ ঘণ্টা
দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে যোগাযোগব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী বিপ্লবের প্রস্তুতি চলছে। নারায়ণগঞ্জ হয়ে কুমিল্লা পর্যন্ত বহুল প্রতীক্ষিত রেলের ‘কর্ড লাইন’ (সরাসরি সংযোগপথ) নির্মাণের মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার। এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রাজধানী ঢাকা থেকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের রেলপথে দূরত্ব বর্তমানের তুলনায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার কমে যাবে। ফলে যাত্রীবাহী ট্রেনের যাতায়াতের সময় বর্তমানের পাঁচ-ছয় ঘণ্টা থেকে কমে মাত্র তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টায় নেমে আসবে।
সম্প্রতি বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রকল্পের অগ্রগতির কথা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, ইতোমধ্যে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রাথমিক কাজ শেষ হয়েছে এবং রুটও নির্ধারণ করা হয়েছে।
রুট বিশ্লেষণ : দূরত্ব ও সময়ের তুলনামূলক চিত্র
বর্তমানে ব্রিটিশ আমলে তৈরি ঐতিহ্যবাহী রেলপথের কারণে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার ট্রেনগুলোকে টঙ্গী, ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আখাউড়া হয়ে দীর্ঘ প্রায় ৩২০ কিলোমিটার পথ আঁকাবাঁকা হয়ে পাড়ি দিতে হয়। অথচ ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কপথের দূরত্ব মাত্র ২৪৮ কিলোমিটার।
প্রস্তাবিত কর্ড লাইনটি নির্মিত হলে ট্রেনগুলো ঢাকা থেকে সরাসরি নারায়ণগঞ্জ (শ্যামপুর) হয়ে কুমিল্লার লালমাই রুটে প্রবেশ করবে।
গতিবৃদ্ধি ও ক্রসিংয়ের জটলা থেকে মুক্তি
রেলওয়ের প্রকৌশল ও অপারেশন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান রুটে টঙ্গী থেকে ঢাকা (কমলাপুর) পর্যন্ত অংশটি রেলের অন্যতম ব্যস্ত করিডোর। এই অংশে প্রায় ৩৪টি ক্রসিং রয়েছে। অতিরিক্ত ট্রাফিক ও ক্রসিংয়ের ঝামেলার কারণে এই জোনে ট্রেনের গতিবেগ ঘণ্টায় ৪০-৪৫ কিলোমিটারে নেমে আসে, যেখানে স্ট্যান্ডার্ড গতি হওয়া উচিত অন্তত ৮০ কিলোমিটার। নতুন কর্ড লাইনটি চালু হলে এই ৩৪টি ক্রসিংয়ের জটলা পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে, যা রেলের সামগ্রিক গতি ও শিডিউল বিপর্যয় রোধে ভূমিকা রাখবে।
রোলিং স্টকের সর্বোচ্চ ব্যবহার : সঙ্কট মোকাবেলার মোক্ষম অস্ত্র
বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ে ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) এবং বগির (রোলিং স্টক) তীব্র সঙ্কটে ভোগছে। কর্ড লাইন প্রকল্প এই সঙ্কটের একটি দারুণ কৌশলগত সমাধান হতে পারে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের যুগ্মপরিচালক (অপারেশন) মো: শহীদুল ইসলাম এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গাণিতিক বিশ্লেষণ দিয়েছেন, ‘সময় সাশ্রয় হলে সঙ্কটের মধ্যে একই ইঞ্জিন ও রেক যেখানে দিনে দু’বার চলাচল করে, সেখানে তা চারবারও যাতায়াত করতে পারবে। অর্থাৎ, নতুন কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই শুধু ভ্রমণের সময় কমিয়ে এনে একই সম্পদ দিয়ে দ্বিগুণ ট্রেন চালানো সম্ভব হবে।’
লজিস্টিকস খাতের রূপান্তর ও ধীরাশ্রম আইসিডি
এই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য কেবল যাত্রীসেবা নয়, বরং দেশের লজিস্টিকস ও পণ্য পরিবহন খাতের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়া।
মেগা প্রকল্পের সাথে সংযোগ : প্রস্তাবিত কর্ড লাইনটি সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দর, বে-টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রেনগুলোকে গাজীপুরে নির্মাণাধীন ধীরাশ্রম ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর (আইসিডি) সাথে যুক্ত করবে।
পুরনো রুটের উপযোগিতা : কর্ড লাইন চালু হলে নতুন রুটটি দিয়ে দ্রুতগতির যাত্রীবাহী ট্রেন এবং জরুরি কার্গো চলবে। অন্য দিকে, আখাউড়া-ভৈরব হয়ে পুরনো রুটটি ধীরাশ্রম আইসিডিতে ভারী পণ্যবাহী ট্রেন পরিবহনের জন্য ডেডিকেটেডলি ব্যবহার করা যাবে। বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন এ বিষয়ে বলেন, ‘ট্রেনে যাতায়াতের সময় ও খরচ কমলে ব্যবসায়ীরা সড়কের ওপর থেকে চাপ কমিয়ে রেলমুখী হবেন। এটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট এবং কার্বন নিঃসরণ দুটোই নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনবে।’
আর্থিক খতিয়ান : পণ্য পরিবহনে ধস ও কর্ড লাইনের জরুরি প্রয়োজনীয়তা
রেলওয়ের সাম্প্রতিক আর্থিক পরিসংখ্যান বলছে, লোকোমোটিভ সঙ্কট এবং দীর্ঘ দূরত্বের কারণে রেলের পণ্য পরিবহন খাত থেকে আয় আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। আয় হ্রাস : গত অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে পণ্য পরিবহন খাতে রেলের আয় ছিল ১২২.৭৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১১১.২৭ কোটি টাকায়।
চাহিদা ও জোগানের ঘাটতি : বর্তমানে প্রতিদিন ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ১২ থেকে ১৫টি পণ্যবাহী ট্রেনের বাণিজ্যিক চাহিদা থাকলেও রেলওয়ে মাত্র দুই থেকে তিনটি ট্রেন চালাতে সক্ষম হচ্ছে।
এই চরম ব্যবসায়িক মন্দা এবং লজিস্টিকস ঘাটতি দূর করতে কর্ড লাইনের দ্রুত বাস্তবায়ন ছাড়া বিকল্প নেই বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
পাঁচ দশকের দীর্ঘসূত্রতা ও বর্তমান অগ্রগতি
১৯৭০ এর দশক অর্থাৎ স্বাধীনতার পর থেকেই এই কর্ড লাইন নির্মাণের প্রস্তাব বারবার উঠেছে। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং বড় বড় সড়ক লবির চাপের কারণে প্রকল্পটি গত ৫০ বছর ধরে ফাইলের চাপায় বন্দী ছিল। অবশেষে ২০২০ সালে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে নেয়া একটি মাস্টারপ্ল্যানের অধীনে এই কর্ড লাইনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ পুনরুজ্জীবিত করা হয়। চারটি বিকল্প পথরেখার মধ্যে প্রাথমিকভাবে নারায়ণগঞ্জের শ্যামপুর থেকে কুমিল্লার লালমাই পর্যন্ত রুটটি সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক বলে বিবেচিত হয়েছে। বর্তমান অবস্থা ও পরবর্তী ধাপ : এ ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক মো: আবিদুর রহমান জানিয়েছেন, বর্তমানে চূড়ান্ত সম্ভাব্যতা যাচাই এবং বিশদ নকশা প্রণয়নের কাজ পুরোদমে চলছে। আগামী বছরের (২০২৭) জুনের মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত করে একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
কিছু অনুত্তরিত প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ
প্রকল্পটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক হলেও জাতীয় বাজেটে এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক এখনো ধোঁয়াশায় রয়ে গেছে।
অর্থায়নের উৎস : এই মেগা প্রকল্পের বিশাল ব্যয়ভার নিজস্ব অর্থায়নে নাকি কোনো বিদেশী দাতা সংস্থা (যেমন এডিবি, জাইকা বা বিশ্বব্যাংক) বা জিটুজি ভিত্তিতে আসবে, তা এখনো নির্দিষ্ট করা হয়নি।
ভূমি অধিগ্রহণ : ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং শিল্পাঞ্চলের মধ্য দিয়ে রেললাইন নেয়ার জন্য বিশাল ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে, যা প্রকল্প বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
বাস্তবায়নের সময়সীমা : কাজ শুরুর পর ঠিক কত বছরের মধ্যে এই প্রকল্প শেষ হবে, তার কোনো স্পষ্ট রোডম্যাপ এখনো দেয়া হয়নি।
সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সরকার যদি এই ‘কর্ড লাইন’ দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে তা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা মাল্টিমোডাল লজিস্টিকস হাব হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানকে সুসংহত করবে।



