ইসরাইলি অবিরাম হামলায় বিপর্যস্ত লেবাননের সাধারণ মানুষ

অভিবাসী শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি অসহায় অবস্থায় রয়েছেন, রোগীরা মৃত্যুর প্রহর গুনছেন

Printed Edition
লেবাননের বৈরুতে সঙ্ঘাতের মাঝে অস্থায়ী শিবিরে তাঁবুর পাশে বসে আছেন এক বাস্তুচ্যুত নাগরিক : ইন্টারনেট
লেবাননের বৈরুতে সঙ্ঘাতের মাঝে অস্থায়ী শিবিরে তাঁবুর পাশে বসে আছেন এক বাস্তুচ্যুত নাগরিক : ইন্টারনেট

আলজাজিরা

ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের চতুর্থ সপ্তাহে এসে চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে লেবাননের সাধারণ মানুষ। গত দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো বড় ধরনের ইসরাইলি হামলার শিকার হয়ে দেশটি এখন ধ্বংসস্তূপ আর হাহাকারে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ লেবানন এবং বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলী (দাহিয়েহ) থেকে ইসরাইলি বাহিনীর গণ-উচ্ছেদ আদেশের পর দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

লেবানন সরকারের তথ্যমতে, ইসরাইলি উচ্ছেদ আদেশের ফলে বর্তমানে অন্তত ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত। জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম, স্থবির ব্যবসা-বাণিজ্য এবং নিরবচ্ছিন্ন বিমান হামলায় জনজীবন ওষ্ঠাগত। বিশেষ করে নারী, শিশু এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্তরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

দেশটিতে সিরীয় শরণার্থী এবং বিদেশী অভিবাসী শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি অসহায় অবস্থায় রয়েছেন। ডায়ালাইসিসের অপেক্ষায় থাকা ক্যানসার রোগী এবং ইনসুলিন সংরক্ষণ করতে না পারা ডায়াবেটিস রোগীরা মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। বাস্তুচ্যুত হওয়ার ফলে হাজার হাজার নারী তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা ও প্রসূতি সহায়তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

ইউএনএফপিএ’র প্রতিনিধি আনন্দিতা ফিলিপোজ আলজাজিরাকে বলেন, ‘এবারের সঙ্কটের গতি ও মাত্রা ২০২৪ সালের তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ। বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং গণ-উচ্ছেদের হার নজিরবিহীন।’

প্রাণহানি ও শিশু অধিকার লঙ্ঘন

লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত তিন সপ্তাহে ইসরাইলি হামলায় এক হাজার ৯৪ জন নিহত এবং তিন হাজার ১১৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অন্তত ৮১ জন নারী এবং ১২১ জন শিশু রয়েছে। ওয়ার্ল্ড ভিশন লেবাননের পরিচালক হেইডি ডিডরিচ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী শিশুদের সুরক্ষা পাওয়ার কথা থাকলেও তারা এই সহিংসতার প্রধান শিকারে পরিণত হচ্ছে।

দীর্ঘ দিনের অর্থনৈতিক সঙ্কট, কভিড-১৯ মহামারি, বৈরুত বিস্ফোরণ এবং একের পর এক যুদ্ধের ট্রমা লেবাননের মানুষকে মানসিকভাবে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। একটি জাতীয় প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে লেবাননের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে তিনজনই বিষণœতা, উদ্বেগ বা পিটিএসডিতে ভুগছেন।

মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার হটলাইন ‘১৫৬৪’-তে কলের সংখ্যা প্রতিদিন ৩০ থেকে বেড়ে ৫০-এ দাঁড়িয়েছে। ন্যাশনাল লাইফলাইনের অপারেশন ম্যানেজার জাদ চামউন বলেন, ‘আমরা গত দুই বছর ধরে নিকৃষ্টতম সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। মানুষ এখন কেবল বেঁচে থাকার লড়াই করছে। আমরা তাদের এই অন্ধকারের সঙ্গী হওয়ার চেষ্টা করছি, যা বর্তমানে অত্যন্ত ভারী হয়ে উঠেছে।’

ইসরাইল দক্ষিণ লেবানন দখল করে তথাকথিত ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ তৈরির ঘোষণা দেয়ায় সীমান্তসংলগ্ন একের পর এক গ্রাম ধ্বংস করা হচ্ছে। হিজবুল্লাহর পাল্টা হামলা এবং ইসরাইলের অব্যাহত আগ্রাসনে যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, যা পুরো লেবাননকে একটি দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।