বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতায় নাকাল গাজীপুর

Printed Edition

মো: আজিজুল হকগাজীপুর মহানগর

গত কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে শিল্পনগরী গাজীপুর মহানগরের জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। নগরজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কোথাও কোথাও মহাসড়কের ওপর দিয়েই পানি প্রবাহিত হতে দেখা গেছে। এতে ধীরগতিতে যানবাহন চলাচল করায় বিভিন্ন পয়েন্টে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। অফিসগামী মানুষ, শ্রমিক ও শিক্ষার্থীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। অনেকেই বাসাবাড়িতে পানিবন্দী হয়ে পড়েন।

শনিবার রাতে ও রোববার দিনভর থেমে থেকে ভারী বর্ষণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কসহ মহানগরের অধিকাংশ প্রধান ও অভ্যন্তরীণ সড়ক প্লাবিত হয়। শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানার সামনে পানি জমে শ্রমিকদের কর্মস্থলে পৌঁছাতে ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কয়েকটি মসজিদেও বর্ষার পানি ঢুকে পড়ে। নিচু এলাকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগ ছিল সবচেয়ে বেশি।

মহানগরের টঙ্গী, গাছা, পূবাইল, বাসন, কোনাবাড়ী ও কাশিমপুর এলাকার অসংখ্য সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি জমে যাওয়ায় স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। অনেক এলাকায় রিকশা, অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষকে ঘর থেকে বের হতে দেখা যায়নি।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় টঙ্গীর এরশাদ নগর (দত্তপাড়া পুনর্বাসন) এলাকাসহ প্রায় ১৭টি বস্তির বাসিন্দারা। জলাবদ্ধতার পানি ঘরে ঢুকে আসবাবপত্র, কাপড়চোপড়, খাদ্যসামগ্রী ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে যায়। অনেক পরিবারকে উচু স্থানে আশ্রয় নিতে কিংবা ঘরের ভেতরেই পানির সাথে বসবাস করতে হচ্ছে।

টঙ্গীর ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের কলেজ রোড, সফিউদ্দিন রোড, সুরতরঙ্গ রোড, মোক্তার বাড়ি রোড, মোল্লা বাড়ি রোডসহ অভিজাত আবাসিক এলাকাগুলোর অধিকাংশ সড়কও পানিতে তলিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় এসব সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-নালা দখল, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছরই সামান্য ভারী বর্ষণেই গাজীপুর মহানগরের বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধতায় ডুবে যায়। শিল্পনগরী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ এই মহানগরে স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো: শওকত হোসেন সরকার বলেন, ‘গাজীপুরে জলাবদ্ধতার বর্তমান সঙ্কট একদিনে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং দূরদর্শী নগর পরিকল্পনার অভাবের কারণেই আজ নগরবাসীকে এ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, অতীতে যারা এই নগর পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তারা চাইলে অনেক আগেই দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারতেন। কিন্তু জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার না দিয়ে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়ায় নগরবাসী কাক্সিক্ষত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

প্রশাসক বলেন, ‘গাজীপুর এখনো একটি নবীন সিটি করপোরেশন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রথম মেয়র অধ্যাপক এম এ মান্নান রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন এবং তাকে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ দেয়া হয়নি। পরবর্তী দু’টি নির্বাচনেও জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে দলীয় ব্যক্তিদের দায়িত্বে বসানো হয়েছিল। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে দলীয় বিবেচনায় সিটি করপোরেশন পরিচালিত হলেও নগরবাসীর প্রত্যাশিত উন্নয়ন হয়নি।’

মো: শওকত হোসেন সরকার অভিযোগ করে বলেন, ‘বিগত সরকারের আমলে টঙ্গীর কিছু এলাকায় সড়কের দুই পাশের জায়গা বিভিন্নভাবে ইজারা বা প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাওয়ায় রাস্তা সঙ্কুচিত হয়েছে। রাজউকের পরিকল্পিত শিল্প এলাকার অনেক সড়কের পাশে ঝুটের গুদাম গড়ে ওঠায় যান চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু এলাকায় মাদক সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডেরও বিস্তার ঘটেছে।’

বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় গৃহীত উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রশাসক বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি নগরীর অধিকাংশ ড্রেন আবর্জনায় ভরাট অবস্থায় দেখতে পান। বর্ষা মৌসুমের আগেই সেগুলো পরিষ্কারের বিশেষ কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়। এ ছাড়া নগরীর গুরুত্বপূর্ণ খালগুলোর খনন কার্যক্রমও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব খাল পুনঃখনন করা হবে। অচিরেই প্রতি ওয়ার্ডে পুকুর খনন ও পাড়ের সৌন্দর্য বর্ধনের কাজও শুরু হবে।

তিনি বলেন, ‘ড্রেন পরিষ্কারের কারণে এবার বৃষ্টির পানি আগের তুলনায় দ্রুত নেমে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও সাময়িক জলাবদ্ধতা তৈরি হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। খাল খনন ও ড্রেন পরিষ্কারের কাজ সম্পূর্ণ হলে জলাবদ্ধতার সমস্যা আরো অনেকটাই কমে আসবে বলে আমরা আশাবাদী।’