- ঘুষ নিয়ে অনুমতি দেয়ার দাবি মালিকদের
- কোনো অনুমোদন দেয়া হয়নি : বিআরটিএ
- ভারতীয় বাসের আধিপত্য
নেই আইনগত বৈধতা। নেই কোনো অনুমোদন। তবুও দেশজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নানা প্রতিষ্ঠানের দ্বিতল বিশিষ্ট স্লিপার বাস। অসামঞ্জস্য চেসিস, সাসপেনশন ও ব্রেকিং সিস্টেমের কারণে যখন একের পর এক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে তখনই টনক নড়েছে কর্তৃপক্ষের।
এসব বাস সম্পর্কে জানতে চাইলে আদালতে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি বিআরটিএর পক্ষ বলা হচ্ছে ‘স্লিপার বাসের কোনো অনুমোদন দেয়া হয়নি’। শুধু তাই নয়, দেশে কোনো স্লিপার বাস চলাচল করে এমন তথ্যই জানা নেই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের। অথচ বিআরটিএর তালিকা অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়াই দেশের রাস্তায় ৮২৯টি স্লিপার বাস চলাচল করছে। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, এসব বাসের অনুমোদন দিলো কারা?
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিআরটিএর উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে বেআইনিভাবে স্লিপার বাস তৈরি এবং রাস্তায় নামার অনমুতি দিয়েছে। যার কারণে পরিবহন মালিকরা অধিক লাভের আশায় অল্প সময়ের মধ্যে তাদের সিঙ্গেল ডেকের বাসগুলোকে ডাবল ডেকের স্লিপার বাসে পরিণত করে রাস্তায় নামিয়েছে। একটি নয়, দু’টি নয়, শত শত বাস নামানো হচ্ছে। একের পর এক দুর্ঘটনায় হতাহতের পর আদালতকে জানানো হচ্ছে স্লিপার বাসের বিষয়ে বিআরটিএ কোনো অনুমোদন দেয়ইনি। সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বাসগুলো রাস্তায় চলাচল করছে। অথচ স্লিপার বাস মালিকদের অভিযোগ, লাখ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে স্লিপার বাস তৈরির অনুমতি দিয়েছে চিআরটিএ কর্মকর্তারা। এখন আদালতের কাছে নিজেদের দোষ ঢাকতে বাস কোম্পানির উপর দোষ চাপানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিজেদের মতো করে কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে চেসিস, সাসপেনশন ও ব্রেকিং ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। যার কারণে চালক অল্পতেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। এটি শুধু কাগজপত্রের বৈধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, যাত্রী নিরাপত্তার সাথেও সরাসরি সম্পর্কিত।
ডাবল ডেকার স্লিপার বাস : ঝকঝকে রং, বিলাসবহুল অভ্যন্তর, আলাদা কেবিন ও শোয়ার ব্যবস্থা। দূরপাল্লার যাত্রায় আরামের নতুন মাত্রা যোগ করেছে স্লিপার কোচ। বাড়তি ভাড়া দিয়েই এসব বাসে উঠছেন যাত্রীরা। ভেতরে সিঙ্গেল ও ডাবল ক্যাবিনে রয়েছে বালিশ, কম্বল, চার্জার পয়েন্ট, জুতার তাক। এ ছাড়া প্রাইভেসির জন্য রয়েছে পর্দা। কোনো কোনো বাসে থাই গ্লাসের স্লাইড ডোর ব্যবহার করা হয়েছে। এই বাস নিয়ে যাত্রীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। কেউ বলছেন, ক্যাবিন থাকায় দুরের যাত্রায় সুন্দরভাবে ঘুমিয়ে যাওয়া যায়। এতে শরীর খুব বেশি ক্লান্ত হয় না। তবে বেশির ভাগ বাসের বিছানা নোংরা, অপরিষ্কার। কোনো বাসের ক্যাবিনে উৎকট গন্ধ এমনকি ছারপোকার অস্থিত্বও রয়েছে। এসব অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ যাত্রীদের অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলে। আবার কোনো কোনো বাসের সাসপেনশন ভালো না হওয়ায় ঝাঁকুনিতে ঘুম হয় না।
অনিয়ন্ত্রিত এসব বাসের একের পরে এক দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, মৃত্যু ও আহতদের আহাজারিতে টনক নড়ছে প্রশাসনের। স্লিপার কোচের বৈধতা নিয়ে ২০২৫ সালে হাইকোর্টে রিট হয়। রিটকারী আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খানের মামলায় বিষয়টি আদালতের নজরে আসে। চলতি বছরের ২০ আগস্ট শুনানিতে বিআরটিএ আদালতকে জানায়, দেশের সড়কে ৮২৯টি অবৈধ স্লিপার বাস চলাচল করছে। তবে কোনো স্লিপার বাস চলাচলের অনুমোদন তারা দেয়নি। একই সাথে রেজিস্ট্রেশন ছাড়া চলাচলরত বাসের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও ব্যবস্থা নেয়ার কথা আদালতকে জানিয়েছে সংস্থাটি। এ অবস্থায় বুধবার হাইকোর্ট স্পষ্ট করে বলেছেন, বিআরটিএর অনুমোদন ছাড়া মহাসড়কে স্লিপার বাস চলতে পারবে না।
অনুমোদন ছাড়া স্লিপার বাস চলছে কিভাবে : আদালতে দেয়া বিআরটিএর বক্তব্যের পর পরিবহন বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, অনুমোদন না থাকলে এসব স্লিপার বাস সড়কে নামল কিভাবে? সাধারণ বাস হিসেবে নিবন্ধিত হয়ে থাকলে পরে সেগুলোর কাঠামো পরিবর্তন করা হলো কিভাবে? পরিবর্তিত কাঠামো নিয়ে ফিটনেস সনদ ও রুট পারমিট নবায়নই বা হলো কিভাবে।
জানা গেছে, বিদেশ থেকে আমদানি করা অনেক চেসিস মূলত একতলা বাস তৈরির উপযোগী। পরে স্থানীয় গ্যারেজ বা বডি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে ওই চেসিসের ওপর পরিবর্তিত কাঠামো বসিয়ে তৈরি করা হচ্ছে স্লিপার কিংবা ডাবল ডেকার বাস। একটি বাসের উচ্চতা, প্রস্থ, মোট ওজন, আসনসংখ্যা ও কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করা হলে এর সাথে সরাসরি যুক্ত থাকে কারিগরি অনুমোদন ও নিরাপত্তা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদিত নকশা ও কাঠামোর বাইরে গিয়ে অনেক বাসকে রূপান্তর করা হয়েছে। কোথাও একতলা বাসের ওপর বসানো হয়েছে দোতলা কাঠামো। কোথাও সাধারণ আসন খুলে তৈরি করা হয়েছে শোয়ার জায়গা। এতে একই চেসিসে বদলে যাচ্ছে বাসের উচ্চতা, ওজন, ভারসাম্য ও যাত্রী ধারণক্ষমতা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর গাবতলী, আমিনবাজার, মানিকনগর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে স্লিপার কোচের কাঠামো তৈরি ও পরিবর্তনের কাজ চলে আসছে প্রকাশ্যেই। সাম্প্রতিক অভিযানে এর কিছু বাস্তব চিত্রও সামনে এসেছে। তবে বাসের চেসিস আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান থেকেও বডি তৈরির ইতিহাস রয়েছে।
৮২৯টি স্লিপার বাসের মধ্যে ৮৫ ভাগ বাসের চেসিস ভারতের অশোক লেল্যান্ড ও টাটা কোম্পানির তৈরি। মাত্র তিন থেকে চার লাখ টাকা ডাউনপেমেন্ট দিয়ে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের এসব বাসের চেসিস নেয়া হয়। এরপর ৮ থেকে ২০ লাখ টাকা খরচ করে রাস্তায় নামানো হয় একটি নতুন বাস। সস্তায় কেনা এসব বাসের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, গত ১৫ বছরে দেশের ভারতীয় বাসের বাজার প্রসারিত করতে জাপান, কোরিয়া, জার্মানিসহ অন্যান্য দেশের গুণগত মানসম্পন্ন বাস আমদানিকে নিরুতসাহিত করা হয়েছে। ব্যাপক অবৈধ সুবিধা নিয়ে বিআরটিএর কর্মকর্তারা উন্নতমানের বাসগুলোর রেজিস্ট্রেশন দিতে গড়িমসি করেছে, যার কারণে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে ভারতীয় বাস।
বাংলাদেশ স্লিপার এসি বাস মালিক সমিতির কয়েকজন নেতা বলেন, বিআরটিএর অনুমোদন না পেয়ে এত বাস নামলো কিভাবে। কিছু কর্মকর্তা যাচাই-বাছাই না করে ব্যক্তিগত স্বার্থে এসব বাসের নিবন্ধন ও রুট পারমিট দিয়েছেন। তারা ম্যানেজড হয়েই এসব গাড়ি রাস্তায় চলতে দিয়েছে। নেতারা আরো বলেন, প্রতিটি বাসের পেছনে তাদের লাখ লাখ টাকা ইনভেস্ট করতে হয়েছে। কোনো কোনো বাসে কোটি টাকাও খরচ হয়েছে, যার বেশির ভাগই ব্যাংক লোন নিয়ে করা। বিআরটিএর অনুমোদন ছাড়া কোনো মালিক এত টাকা ইনভেস্ট করেননি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিটি বাসের নিবন্ধনের সময় প্রকৃত কাঠামো কী ছিল, পরে কাঠামো পরিবর্তনের কোনো আবেদন করা হয়েছিল কি না, হলে কে অনুমোদন দিয়েছেন, ফিটনেস পরীক্ষায় কী উল্লেখ ছিল এবং রুট পারমিটের নথিতে কী তথ্য রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ একদিকে মালিক সমিতির অভিযোগ, অন্য দিকে বিআরটিএ বলছে তারা স্লিপার বাসের অনুমোদনই দেয়নি। এ দুই বক্তব্যের মাঝখানে রয়েছে ৮২৯টি বাস এবং সেসব বাসে চলাচলকারী অসংখ্য যাত্রী।
৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে কাঠবোঝাই ট্রাকের পেছনে স্লিপার কোচের ধাক্কায় তিন যাত্রী নিহত ও অন্তত পাঁচজন আহত হন। দুর্ঘটনায় বাসটির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। মার্চে দিনাজপুরের বিরামপুরে দাঁড়িয়ে থাকা বালুবাহী ট্রাকে স্লিপার বাসের ধাক্কায় দুজন নিহত ও ছয়জন আহত হন। ১৭ আগস্ট কুমিল্লার দাউদকান্দির ইলিয়টগঞ্জে সামনে থাকা একটি গাড়িতে ধাক্কার পর রয়েল কক্স পরিবহনের স্লিপার কোচে আগুন ধরে যায়। বাসটি পুরোপুরি পুড়ে গেলেও যাত্রীরা দ্রুত বের হয়ে যাওয়ায় প্রাণহানি হয়নি। ৪ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় কুয়াকাটাগামী আইকনিক পরিবহনের একটি ডাবল ডেকার স্লিপার বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের পুকুরে পড়ে যায়। এতে ১৫ জন আহত হন। দীর্ঘদিনের অভিযোগের পর আগস্টে স্লিপার কোচের বিরুদ্ধে দৃশ্যমানভাবে কঠোর অবস্থান নেয় বিআরটিএ। এদিকে ২৯ আগস্ট তেজগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনুমোদনহীন ডাবল ডেকার স্লিপার কোচের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন।
বিআরটিএর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, স্লিপার কোচ নামে যে কোনো যান আছে, তা তিনি জানতেনই না। তবে গতকাল তার বক্তব্য নিতে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই বা অজও) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো: সাইফুন নেওয়াজ নয়া দিগন্তকে বলেন, একটি সিঙ্গেল ডেকের বাস আমদানি করে তাকে মোডিফিকেশন করে ডাবল ডেকার হিসোবে তৈরি করা হচ্ছে। এতে ওই বাস সার্বিকভাবে প্রতিটি ধাপে তার নিয়ন্ত্রণক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। কারণ একটি বাস তৈরির সময় তার গতি, উচ্চতা, ব্যাসার্ধ, ধারণ ক্ষমতাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে নিয়ন্ত্রণক্ষমতা তৈরি করা হয়। সেখানে তাকে যদি নিজেদের মতো করে মডিফাই করা হয় তাহলে যেকোনো ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ হারাবে এটাই স্বাভাবিক। তিনি প্রশ্ন করেন, অনুমোদন ছাড়া এতগুলো বাস রাস্তায় নামলো কিভাবে?
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের রোড সেফটি প্রকল্পের সমন্বয়কারী শারমিন রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, বিআরটিএর অনুমোদন ছাড়া এতগুলো বাস চলে কিভাবে। অনুমোদন না থাকলেও বিআরটিএর তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে ডাবল ডেকার বাস রয়েছে। তবে সেগুলো তৈরি করা হয়েছে ডাবল ডেকার হিসেবে। কিন্তু আমাদের দেশের বেশির ভাগ বাস সিঙ্গেল ডেকারকে মোডিফাই করে ডাবল ডেকার করা হয়েছে। এটাই ভয়ের বিষয়। তিনি বলেন, এ দেশে ডাবল ডেকার বাস চলাচলের জন্য উপযুক্ত রাস্তা ও চালকের অভাব রয়েছে। আন্তর্জাতিক রেটিং অনুযায়ী আমাদের দেশে থ্রি স্টারের উপরে কোনো রাস্তা নেই। তার উপরে রাস্তায় অনুমোদনহীন থ্রি হুইলার, নসিমন, করিমন চলাচল করে থাকে। এর মধ্যে ডাবল ডেকার বাস চলানো যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্র্ণ। এসব বাস নিয়ে সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।



