মৌসুমি বায়ু ও লঘুচাপে ব্যাপক বর্ষণ, বাড়তে পারে বন্যার বিস্তৃতি

আবহাওয়াবিদরা আবারো চলতি মাসের ১৯ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে আরেকটি লঘুচাপ সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন। সেই লঘুচাপের প্রভাবে আবারো ভারী বর্ষণের সৃষ্টি হলে চলতি বন্যার সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটে বরং চরম অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে আবহাওয়া অফিস গতকাল রোববার জানিয়েছে, ঢাকার ভারী বর্ষণ আজ সোমবারের মধ্যে অনেকটা কমে যাবে, তবে হালকা বৃষ্টি থাকবেই।

হামিম উল কবির
Printed Edition

মৌসুমি বায়ু ও লঘুচাপের প্রভাবে প্রায় সারা দেশেই ব্যাপক বর্ষণ। অভ্যন্তরীণ বৃষ্টিজনিত পানি ও ভারতীয় এলাকা থেকে ধেয়ে আসা ঢলের পানিতে বন্যার বিস্তৃতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ গত ৩ জুলাই শক্তি সঞ্চয় করে মৌসুমি নি¤œচাপে পরিণত হয়ে স্থলভাগে উঠে তা দুর্বল হয়ে লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। এর সাথে আবার পশ্চিমা লঘুচাপের জলীয়বাষ্প যোগ হয়ে সারা দেশেই ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হচ্ছে গত কয়েক দিন ধরে। আবহাওয়াবিদরা আবারো চলতি মাসের ১৯ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে আরেকটি লঘুচাপ সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন। সেই লঘুচাপের প্রভাবে আবারো ভারী বর্ষণের সৃষ্টি হলে চলতি বন্যার সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটে বরং চরম অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে আবহাওয়া অফিস গতকাল রোববার জানিয়েছে, ঢাকার ভারী বর্ষণ আজ সোমবারের মধ্যে অনেকটা কমে যাবে, তবে হালকা বৃষ্টি থাকবেই।

এ দিকে দেশের বড় শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহর ভারী বর্ষণে অতি দ্রুততম সময়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে। এই দুই শহরের কোনো কোনো রাস্তায় কোমরসম পানি হয়ে যাচ্ছে এবং তা থাকছে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত। ড্রেনেজ সিস্টেমগুলো অনেকাংশে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এক সাথে অনেক বেশি বর্ষণ হওয়ায় পানি সরতে পারছে না। ফলে এই দু’টি শহর অচল হয়ে পড়ছে একটানা কয়েক ঘণ্টা। ভারী বর্ষণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনে পানি প্রবেশ করে বিকল হয়ে পড়ে থেকে রাস্তায় ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি করছে। পানি ও যানজটের কারণে ঢাকা শহরে যানবাহনগুলো উল্টোপথে চলতে থাকায় আরো বেশি যানজেটর সৃষ্টি হয়েছে গতকাল রোববার। ঢাকার কোনো কোনো এলাকায় রাস্তা উপচে পানি ঢুকে পড়েছে বাড়ির নিচতলায়, তাতে ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এইতো গেল মূল ঢাকার অবস্থা কিন্তু নি¤œাঞ্চলের অবস্থা বর্ণনাতীত। রাস্তা বন্ধ হয়ে যানজটের সৃষ্টি, বাড়িঘরে নিয়মিতই পানি ঢুকে যাচ্ছে ড্রেনেজ সিস্টেম সাময়িক বন্ধ থাকায়। কোনো কোনো এলাকায় ওয়াসার লোকজনকে ড্রেনেজ সিস্টেম সচল করতে দেখা গেছে এই বর্ষণের মধ্যে।

কানাডার সাসকাচুয়ার বিশ^বিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ মোস্তফা কামাল পলাশ নয়া দিগন্তকে বলেন, এবারের লঘুচাপের গতি ছিল খুবই ধীর। ধীর গতি থাকায় লঘুচাপের প্রভাব কাটতে দেরি হচ্ছে। সে কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। লঘুচাপের ব্যাপারটি ছাড়াও সক্রিয় মৌসুমি বায়ু, উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাবেও এবার বৃষ্টি বেড়েছে। আবার তাপমাত্রারও একটি প্রভাব রয়েছে বৃষ্টিপাত বাড়ার পেছনে। এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রা বাড়লে বায়ুতে জলীয়বাষ্প বেড়ে যায় ৭ শতাংশ। শিল্প বিপ্লবের পর এ ১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বেড়েছে। যে কারণে বায়ুতে আগের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি জলীয়বাষ্প থাকছে। তা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লঘুচাপ, নি¤œচাপ ও ঘূর্ণিঝড় আগে যে গতিতে অগ্রসর হতো এখন এর চেয়ে আরো বেশি ধীরগতিতে অগ্রসর হচ্ছে। গত ৩ জুলাই বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপের সৃষ্টি হলেও তাও এখন পর্যন্ত (গতকাল ১২ জুলাই) পর্যন্ত অব্যাহত আছে এবং এর প্রভাব শেষ হতে পারে ১৪ জুলাইতে গিয়ে। চলতি ভারী বর্ষণ শেষ হতে পারে ১৪ জুলাই। তবে চলতি মাসের ১৯ থেকে ২০ তারিখের দিকে বঙ্গোপসাগরে আরেকটি লঘুচাপের সৃষ্টি হতে পারে বলে মোস্তফা কামাল পলাশ জানিয়েছেন।

রাজধানী ঢাকার অবস্থা : রাজধানী ঢাকায় গতকাল সকাল থেকে থেমে থেমে ভারী বৃষ্টির কারণে প্রধান প্রধান সড়কে সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘ যানজট। মতিঝিল, শান্তিনগর, মালিবাগ, মিরপুর, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, রামপুরা, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। অফিসগামী মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে পানির মধ্য দিয়ে হেঁটে কর্মস্থলে পৌঁছেছেন। মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং গণপরিবহনের অনেকগুলোই পানি ঢুকে বিকল হয়ে পড়ে ছিল।

শুধু রাজধানী নয়, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকাতেও একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অনেক স্থানে কৃষিজমি পানির নিচে চলে গেছে। সবজি, আমন ধানের বীজতলা এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নি¤œাঞ্চলের বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় অনেক পরিবারকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ভারী বৃষ্টিপাত প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা জলাবদ্ধতাকে আরো প্রকট করে তুলছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল ও জলাধার ভরাট, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নালা-নর্দমায় বর্জ্য জমে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ সঙ্কুচিত হওয়ায় অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে স্বল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।

এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে দ্রুত জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘তাৎক্ষণিকভাবে ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখা, খাল-নালা পরিষ্কার করা এবং পানি দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে দীর্ঘমেয়াদে নগর পরিকল্পনা করতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, খাল পুনরুদ্ধার এবং আধুনিক ড্রেনেজ অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় প্রতি বর্ষা মৌসুমেই একই ধরনের দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।’ বর্ষা বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের অংশ হলেও প্রতি বছর একই ধরনের জলাবদ্ধতা ও নগরে অচলাবস্থা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, শুধু প্রাকৃতিক কারণ নয়, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও পরিকল্পনার ঘাটতিও এই সঙ্কটকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলছে। তাই তাৎক্ষণিক ত্রাণ বিতরণের পদক্ষেপের পাশাপাশি টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই হতে পারে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ভোগ কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

চট্টগ্রামে কেন বেশি বৃষ্টি ও বন্যা?

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট একটি লঘুচাপ ক্রমান্বয়ে মৌসুমি নি¤œচাপ হয়ে স্থলভাগে উঠে যায় এবং পরে এটা দুর্বল হয়ে স্থল লঘুচাপে পরিণত হয়। এটা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি ধীরগতির ছিল। গত ৩ জুলাই উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও এর সংলগ্ন উড়িষ্যা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে সৃষ্ট লঘুচাপটি সাগরে অবস্থানকালীনই মৌসুমি নি¤œচাপ হয়ে ৬ জুলাই উড়িষ্যা উপকূলে স্থল নি¤œচাপে পরিণত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। লঘুচাপের কারণে বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা জলীয়বাষ্প সরাসরি উড়িষ্যা উপকূল থেকে চট্টগ্রাম ও আরাকান অঞ্চলের পাহাড়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে উপরে উঠে ঠাণ্ডা হয়ে মেঘের সৃষ্টি করছে এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলেই ভারী বর্ষণের সৃষ্টি করছে। এই প্রক্রিয়াটি খুবই ধীরগতির বলে জলীয়বাষ্প বারবার সেই চট্টগ্রামের পাহাড়ে আঘাত করে মেঘ হয়ে বৃষ্টি ঝরাচ্ছে। এর সাথে আবার যোগ হয়েছে মৌসুমি বায়ুর জলীয়বাষ্প। দুই প্রক্রিয়ার কারণে বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভারী বর্ষণ হচ্ছে। শুধু সেখানেই থাকছে না, বিপুল জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু ভারতের ত্রিপুরার পাহাড়ি ভূমিতে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে পরে মেঘালয়ের পাহাড়ে গিয়ে বাধা পাচ্ছে এবং সেই অঞ্চলেই বৃষ্টি ঝরিয়ে বাংলাদেশের শেরপুর থেকে সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ হয়ে ভারতের উত্তর দিনাজপুরের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে বিহার প্রদেশের দিকে। এটা ওরোগ্রাফিক প্রক্রিয়ায় (কোনো এলাকায় আর্দ্র বায়ু যখন কোনো পর্বত বা পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ওপরের দিকে গিয়ে তখন তা শীতল ও ঘনীভূত হয়ে) মেঘের সৃষ্টি করে এবং পর্বতের সেই একই ঢালে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। এই প্রক্রিয়াটি সক্রিয় থাকায় চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় দৈনিক ১০০ থেকে ২০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত ঘটাচ্ছে। বৃষ্টির এত পানি ওই এলাকার ড্রেন, খাল ও নদীগুলো বয়ে নিতে পারে না বলে বন্যা হচ্ছে। চট্টগ্রাম শহরে টানা কয়েক দিন ধরে দৈনিক ১০০ থেকে ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়ায় আবহাওয়াবিদদের মধ্যে বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে।