আবুল কালাম
বাংলাদেশ ভ্রমণে অভ্যন্তরীণ পর্যটকের আগ্রহ বাড়লেও পিছিয়ে রয়েছে বিদেশীরা। পরিসংখ্যান বলছে বর্তমানে ভ্রমণে দেশীয় পর্যটকদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে কক্সবাজার ও সিলেট। তার পরেই বান্দরবান, সুন্দরবন, কুয়াকাটা, সোনারগঁাঁ, রাঙামাটি, দিনাজপুর ও টেকনাফ স্থান পেয়েছে। আর দেশের পর্যটকদের জন্য আন্তর্জাতিক গন্তব্যের মধ্যে শীর্ষে স্থান পেয়েছে মালয়েশিয়া, দ্বিতীয় থাইল্যান্ড এবং তৃতীয় মালদ্বীপ। তারপরেই রয়েছে শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর ও সৌদি আরব, নেপাল, ভারত, ভুুটান ও ইন্দোনেশিয়া।
অন্য দিকে অনেক সম্ভাবনার পরও বাংলাদেশের প্রতি বিদেশেী পর্যটকদের আগ্রহ বাড়েনি। পর্যটন বিশ্লেষকরা বলছেন, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব, নিরাপত্তা সঙ্কটসহ নানা কারণে বিদেশী পর্যটকদের কাছে আগ্রহ হারাচ্ছে বাংলাদেশ।
দেশের শীর্ষ ভ্রমণ, পর্যটন ও অ্যাভিয়েশন প্রকাশনা দ্য বাংলাদেশ মনিটর গত মাসে পরিচালিত জরিপ ফলাফলে পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ার তথ্যটি জানায়। জরিপ পরিচালিত সংস্থাটি জানায় অনলাইন ভোটিংয়ের মাধ্যমে এ র্যাঙ্কিং নির্ধারিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় গত ২০ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত অনলাইন জরিপে ১৫ হাজার দুই শ’ পাঠক অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন নিয়মিত ভ্রমণকারী, পর্যটনশিল্পের পেশাজীবী ও ভ্রমণপ্রেমীরা। বাংলাদেশ ট্রাভেল, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫-এর অংশ হিসেবে অনলাইন জরিপটি পরিচালিত হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ফলাফলের মাধ্যমে বাংলাদেশী পর্যটকদের ভ্রমণ আগ্রহের বৈচিত্র্য স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এতে প্রমাণিত সহজ যোগাযোগ, প্রতিযোগিতামূলক খরচ এবং বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা প্রদানকারী আঞ্চলিক গন্তব্যগুলোর প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। পাশাপাশি প্রকৃতি ও ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় অভিজ্ঞতামূলক ও টেকসই পর্যটনের প্রতিও ঝোঁক বাড়ছে।
পরিসংখ্যানে দেশীয় গন্তব্যের তালিকায় কক্সবাজার বড় ব্যবধানে প্রথম স্থান অধিকার করে, যা দেশের প্রধান সমুদ্রসৈকত শহর হিসেবে এর অব্যাহত জনপ্রিয়তাই তুলে ধরে। চা বাগান ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত সিলেট দ্বিতীয় এবং পাহাড়, ঝরনা ও প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য বিখ্যাত বান্দরবান তৃতীয় স্থানে রয়েছে।
অন্য দিকে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ও ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন চতুর্থ স্থানে রয়েছে। পঞ্চম স্থানে আছে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্যের জন্য পরিচিত কুয়াকাটা। ঐতিহ্য ও খাদ্য সংস্কৃতির জন্য খ্যাত পুরান ঢাকা ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেছে। শীর্ষ ১০ গন্তব্যের মধ্যে রয়েছে সোনারগঁাঁ, রাঙামাটি, দিনাজপুর ও টেকনাফ।
জরিপে আন্তর্জাতিক গন্তব্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় হিসেবে স্থান পাওয়া মালয়েশিয়ার বিষয়ে বলা হয়, দেশটির ভিসা সহজ নীতি, ভালো বিমান যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা এবং বিনোদন, কেনাকাটা ও চিকিৎসা পর্যটনের বিস্তৃত সুযোগের কারণে প্রচুর বাংলাদেশী ভ্রমণ করেন। আর থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ, নেপাল, ভারত, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরবের ও ইন্দোনেশিয়ার বিষয়ে তাদের ভাষ্য, স্বল্প দূরত্বের অবকাশ যাপনের গন্তব্যগুলোর প্রতি ধারাবাহিক আগ্রহকে প্রতিফলিত করে। অন্য দিকে বিনোদন, ব্যবসা ও ধর্মীয় ভ্রমণের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ চাহিদার ইঙ্গিত দেয়। ফলে সেখানে যেতে বাংলাদেশীরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
অন্য দিকে ২১ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত জরিপ বলছে, ভ্রমণের জন্য পর্যটকদের পছন্দের প্রথমে রয়েছে ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও জুন মাস। আর সবচেয়ে বেশি ভ্রমণকারীদের মধ্যে রয়েছেন সিলেট বিভাগের মানুষ। আর সবচেয়ে কম ময়মনসিংহের মানুষ। ভ্রমণের জন্য পর্যটকদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে ডিসেম্বর মাস। তাদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় পছন্দের মাস হলো জুন ও জানুয়ারি। দেশের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে পর্যটকেরা কক্সবাজার, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ও পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে যেতেই বেশি পছন্দ করেন। অন্য দিকে জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার গত বছরের তথ্যানুযায়ী, প্রতি বছর পাশের দেশ ভারতে এক কোটির বেশি পর্যটক এলেও বাংলাদেশে এ সংখ্যা পাঁচ লাখের নিচে। বাংলাদেশের এমন করুণ অবস্থার কারণ হিসেবে ভিসা জটিলতা, আন্তর্জাতিক প্রচারণার অভাব, পর্যাপ্ত অবকাঠামোর ঘাটতি, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা এমনকি দেশের রাজনৈতিক অবস্থাকেও দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা।
বিদেশী পর্যটকদের আগ্রহ না বাড়ার বিষয়ে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) সাবেক সভাপতি শিবলুল আজম কোরাইশী নয়া দিগন্তকে বলেন, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, দেশীয় বিমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা,প্রচারের অভাব, নিরাপত্তা ও বিদেশী পর্যটকদের কাছে সুরক্ষা ব্যবস্থা অনেক বড় বিষয়। উন্নত সেবা ও তথ্যের অভাব যেমন রয়েছে তেমনি পর্যটকের জন্য বাড়তি খরচ একটি বড় বোঝা। এ সব সমস্যার সমাধান না হলে এর উন্নয়ন অসম্ভব। টোয়াবের সচিব নিজাম উদ্দিন বলেন, বিদেশী পর্যটক না এলে এ খাতের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য পূরণ হবে না। যেহেতু বাংলাদেশ এখনো অনেক দেশের লাল তালিকায় রয়েছে তাই পর্যটক আসছেন না। তা ছাড়া ভিসা জটিলতায়ও পর্যটক প্রতিকূলতায় রয়েছেন।



