নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশের প্রতিটি বাহিনীকেই আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা জরুরি। সাহস, দক্ষতা, কৌশল ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে কারো পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। কারণ বর্তমানে আর্থ-সামাজিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ বিকেশের ফলে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। সাইবার যুদ্ধ, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, ড্রোন যুদ্ধ কিংবা তথ্যযুদ্ধ এসব নতুন নতুন ক্ষেত্রগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। গতকাল রোববার দুপুরে ঢাকা সেনানিবাসে প্রেসিডেন্ট গার্ডস রেজিমেন্টের (পিজিআর) সদর দফতরে ৫১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
জনগণ নিজেদের যাতে সরকার প্রধান থেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করে সেভাবে নিরাপত্তা কৌশল বিন্যাস করা জরুরি মন্তব্য করে পিজিআর-এর উদ্দেশ্যে তারেক রহমান বলেছেন, একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রায়ই জনসভা এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে হয়। ফলে সেই সকল অনুষ্ঠানে আপনাদেরও দায়িত্ব পালন করতে হয়। এই ধরনের অনুষ্ঠানে ব্যাপক জনসমাগমের মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই কিছুটা জটিলতাপূর্ণ। এসব কর্মসূচির পালনের সময় একদিকে সরকার প্রধানের নিরাপত্তাব্যবস্থা বজায় রাখা অপর দিকে নাগরিক জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত রাখা এই দু’টির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই আপনাদের নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন করতে হয়। আপনাদের প্রতি আমার আহ্বান নিরাপত্তা কৌশল এমনভাবে বিন্যাস করা জরুরি জনগণ যাতে নিজেদেরকে সরকার প্রধান থেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করেন। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে আমি জনগণের বিশ্বাস এবং ভালোবাসার ওপর আমার আস্থা এবং নির্ভরতা বজায় রাখতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পিজিআর-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে আমার জীবনের সবচেয়ে শোকাবহ এবং হৃদয়বিদারক ঘটনা, আমার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের কথা মনে পড়ছে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণের সময় কর্তব্য পালনরত পিজিআর-এর কয়েকজন সদস্যও শহীদ হয়েছিলেন। আজকের এই বিশেষ দিনে আমি পিজিআর-এর সেই সকল শহীদদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি। দায়িত্ব পালনের সময় তাদের নির্মম মৃত্যুর মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের নিরাপত্তার প্রতি অটল আনুগত্য, কর্তব্যপরায়ণতা ও জীবন উৎসর্গের যে চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হয়েছে এটি অবশ্যই পিজিআর-এর সদস্যদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
নিজের স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার বাবা-মা দু’জনই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মেয়াদে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকায় সঙ্গতকারণেই পিজিআর-এর কার্যক্রমের সাথে আমি কিশোর বেলা থেকেই পরিচিত। পিজিআর-এর কাজটি অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং। কারণ রাষ্ট্র ঘোষিত অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের নিরাপত্তা প্রদানের পাশাপাশি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার দায়িত্বপালন করাও আপনাদের অন্যতম কর্তব্য। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আপনাদেরকে নানা রকমের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। এইসব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আপনাদের বিশ্বস্ততা দায়িত্ববোধ এবং কর্তব্যপরায়ণতার বৈশিষ্ট্য আপনাদের নিঃসন্দেহে একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে পরিচিত করেছে। সুশৃঙ্খলতার স্বীকৃতিস্বরূপ পিজিআর চলতি বছর ‘ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড’ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হওয়ায় বাহিনীর সদস্যদের অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সশস্ত্রবাহিনীর পাশাপাশি পিজিআর কিংবা এসএসএফ-এর মতো সফিস্টিকেটেড বাহিনীগুলোকেও সরকার আরো আধুনিকায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ বিষয়ে যথানিয়মে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি, সশস্ত্রবাহিনী যদি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ থেকে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা অনুসরণ এবং পেশাদারিত্ব বজায় রাখেন, তাহলে দেশের সার্বভৌমত্ব আর কখনই হুমকির সম্মুখীন হবে না ইনশাআল্লাহ।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এ কে এম শামছুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল হাসান মাহমুদ খান, ভারপ্রাপ্ত নৌবাহিনীর প্রধান, পিজিআর-এর কমানডেন্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলাম আরিকুল আলমপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী পিজিআর সদর দফতরে একটি গাছের চারা রোপণ করেন এবং পরিদর্শন বইতে স্বাক্ষর করেন।
‘কার্বন ক্রেডিট’ পরিকল্পনা : দেশে ‘কার্বন ক্রেডিট’ বাড়ানোর কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গতকাল বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক এক প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশনা দেন।
প্রধানমন্ত্রী উপ প্রেসসচিব হাসান শিপলু বলেন, প্রধানমন্ত্রী কার্বন নিঃসন কমিয়ে কার্বন ক্রেডিট বিভাবে বাড়ানো যায় সেই বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করেছেন। কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত, নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় বাড়ানোর কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। কার্বন ক্রেডিট অর্জনের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান উপ প্রেস সচিব।
বৈঠকে কার্বন ক্রেডিট, কার্বন ট্রেডিং, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, শিল্প খাতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রয়োগ, জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়ন, বন সংরক্ষণ এবং ব্যাপক বৃক্ষরোপণ প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে কর্মকর্তারা জানান, কার্বন নিঃসরণ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সুযোগ বাড়বে। পরিবেশ সুরক্ষার একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা হচ্ছে ‘কার্বন ক্রেডিট’। বায়ুমণ্ডলে এক মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বা সমপরিমাণ গ্রিন হাউজ গ্যাসের নিঃসরণ কমানো বা অপসারণের বিপরীতে একটি কার্বন ক্রেডিট দেয়া হয়।
বৈঠকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী সাইমুম পারভেজসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব ও অন্যান্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
স্মারক ডাক টিকেট উন্মোচন : জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬ উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকেট উন্মোচন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে এই স্মারক ডাকটিকিট প্রধানমন্ত্রীর উন্মোচন করেছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেসসচিব মো: সুজাউদ্দৌলা তিনি বলেন, উন্নত পল্লী সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন করেছেন। ১০ টাকা মূল্যমানের স্মারক ডাকটিকিটের সাথে একটি উদ্বোধনী খাম ও পাঁচ টাকা মূল্যমানের একটি ডাটা কার্ডও প্রকাশ করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ও সচিব শহীদুল হাসান, ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব বিলকিস জাহার রিমি এ সময় উপস্থিত ছিলেন। আজ ৬ জুলাই সোমবার জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস। বাংলাদেশ ডাকবিভাগ প্রতি বছর বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট, উদ্বোধনী খাম ও ডাটাকার্ড প্রকাশ করে থাকে।
ছবি প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা : সরকারি অনুষ্ঠানে ব্যানার-ফেস্টুন-বিলবোর্ডে ‘প্রধানমন্ত্রীর ছবি’ প্রকাশ করা যাবে না। এই ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞার আরোপ করে পরিপত্র জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। গতকাল দুপুরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এই পরিপত্র জারি করা হয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব তানিয়া আফরোজ স্বাক্ষরিত পরিপত্রে বলা হয়েছে যে, সরকারি কোনো অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রস্তুতকৃত ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ডে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ছবি (থ্রি ডি বা অন্য কোনো আঙিকে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হলো। সরকারি অনুষ্ঠানে ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড প্রস্তুতের ক্ষেত্রে অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তুকে প্রাধান্য দিয়ে প্রয়োজনীয় ও সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করতে হবে। ব্যানার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ডের নকশা এমন ভাবে তৈরি করতে হবে যাতে অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে ও বার্তা ও বিষয়বস্তু সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। পরিপত্রটি গুরুত্বপূর্ণ বিধায় অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে পরিপত্র বলা হয়।
গতকাল সকালে গুলশানের বাসা থেকে সচিবালয়ে আসার পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেখতে পান সড়কে একটি মন্ত্রলালয়ে আয়োজিত কর্মসূচি উপলক্ষে ব্যানার-ফেস্টুনে নিজের ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে। পরে প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে নিজের দফতরে এসে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে ডেকে এই নিদের্শনা দেন।



