সাড়ে ৬ মাস পর শাহজালাল সার কারখানা চালু হচ্ছে কাল

তিন দফায় সাড়ে ১৩ মাস বন্ধ থাকায় দেড় হাজার কোটি টাকার ক্ষতি

Printed Edition
সাড়ে ৬ মাস পর শাহজালাল সার কারখানা চালু হচ্ছে কাল
সাড়ে ৬ মাস পর শাহজালাল সার কারখানা চালু হচ্ছে কাল

আবদুল কাদের তাপাদার সিলেট

দীর্ঘ সাড়ে ছয় মাস বন্ধ থাকার পর প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ইউরিয়া সার কারখানা শাহজালালে। আগামীকাল ৯ অক্টোবর থেকে আবার উৎপাদন শুরু হচ্ছে কারখানায়। গত ১ অক্টোবর পেট্রোবাংলার স্থানীয় কোম্পানি জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড ফেঞ্চুগঞ্জে অবস্থিত শাহজালাল ইউরিয়া সার কারখানার গ্যাস সংযোগ দেয়। এরপর কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসে কারখানায়। কর্মমুখরতায় ফিরেছেন কারখানার কর্মকর্তা কর্মচারীরা। চলতি বছরের ১৪ মার্চ ওভারহোলিংয়ের কাজ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় এ সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া হয়। ১৫/২০ দিনের মাথায় ওভারহোলিংয়ের কাজ শেষ হলেও গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় এতদিন কারখানা আর চালু করা সম্ভব হয়নি। এর আগেও ২০২৪ সালে দু’দফায় কারখানা ১২৫ দিন বন্ধ ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কারখানা বন্ধ থাকলে প্রতিদিন ৫ কোটি টাকার ক্ষতি সাধিত হয়। এই হিসেবে তিন দফায় সাড়ে ১৩ মাস বন্ধ থাকায় ক্ষতি হয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা।

এ দিকে, কারখানার হিসাব বিভাগ জানিয়েছে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কারখানার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্ধেকে নেমে আসে। গত অর্থবছরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল তিন লাখ ৮০ হাজার টন। উৎপাদন হয়েছে এক লাখ ৯০ হাজার টন।

চলতি অর্থবছর ( ২০২৫-২৬) লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তিন লাখ টন।

শাহজালাল সার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী আশরাফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে জানান, গ্যাস সংযোগের পর এখন আমরা স্টার্ট আপ বা চালুকরণ প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত আছি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় গ্যাস সংযোগের পরও কিছু সময় লাগছে। ইউরিয়া সার উৎপাদনের ঠিক আগে আগেই অ্যামেনিয়া গ্যাস উৎপাদন শুরু হয়েছে।

শাহজালাল সার কারখানার জি এম( এডমিন) এ টি এম বাকি নয়া দিগন্তকে জানান, দীর্ঘদিন পর কারখানায় উৎপাদন শুরু হওয়ায় প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। চলতি অর্থ বছর আর কোনো সমস্যা না হলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সহজ হবে। সার কারখানায় অব্যাহত উৎপাদনের জন্য প্রতিদিন ৪০ এম এম সি এফ টি গ্যাসের প্রয়োজন হয়।

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা সদরে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকায় নির্মিত দেশের অন্যতম বৃহত্তম শাহজালাল ইউরিয়া সার কারখানা শিল্প মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ ক্যামিকাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) আওতাধীন একটি প্রতিষ্ঠান।

গত বছরের মার্চ থেকে চলতি সালের ৮ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দফা বন্ধ ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই কারখানা। ২০২৪ সালের ১৩ মার্চ যান্ত্রিক ত্রুটি ও গ্যাসসঙ্কটের কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এ দফায় কারখানাটি বন্ধ থাকে ১০১ দিন। পরে একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর গ্যাসসঙ্কটের কারণে আবার কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায় এবং ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে আবার উৎপাদনে যায়। ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘদিন ওভারহোলিং না করায় যান্ত্রিক ত্রুটির কবলে পড়ে এই সার কারখানা। চলতি বছর ১৪ মার্চ উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ১৫ দিনের মাথায় যান্ত্রিক ত্রুটি কাটিয়ে উঠলেও গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় উৎপাদন শুরু করা যায়নি।

জানা গেছে, (বিসিআইসি)’র ছয়টি বৃহৎ ইউরিয়া সার কারখানায় দেশের চার শ’ হিমাগারের অ্যামোনিয়া গ্যাস উৎপাদন হতো আগে। শাহজালাল সার কারখানার টেকনিক্যাল বিভাগ জানায়, তরল অ্যামোনিয়া হচ্ছে ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়া সারের মধ্যবর্তী একটি প্রোডাক্ট। ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়ার মূল কাঁচামাল প্রাকৃতিক গ্যাস (মিথেন) বাতাস ও পানি। দেশের অন্যান্য ইউরিয়া সার কারখানায় হিমাগার ও অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত তরল অ্যামোনিয়া উৎপাদন হতো কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গ্যাস সঙ্কটজনিত কারণে দেশের অন্যান্য পাঁচটি সার কারখানা বন্ধ রাখা হয়। এ ক্ষেত্রে সিলেটের শাহজালাল সার কারখানাও গ্যাসসঙ্কটে কিছুদিন বন্ধ রাখলেও বিগত বছর থেকে চালু রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে একের পর এক তিন দফায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়ায় তরল অ্যামোনিয়া সঙ্কট দেখা দেয়।

শাহজালাল সার কারখানায় পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হয় ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে। দৈনিক ১৭৬০ মেট্রিক টন দানাদার ইউরিয়া ও ১০০০ মেট্রিক টন অ্যামোনিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে। চায়নার ‘মেসার্স কমপ্ল্যান্ট’ ফেঞ্চুগঞ্জে শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড নামে এই সার কারখানা স্থাপন করে। এতে ব্যয় হয় প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এই কারখানা থেকে বিসিআইসির এনলিস্টেড ৭৯ জন ডিলার দেশের হিমাগার ও অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য নিয়মিত তরল অ্যামোনিয়া সংগ্রহ করতেন। বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত তরল অ্যামোনিয়া সংগ্রহের এই প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল।

শাহজালাল সার কারখানায় পাঁচ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার দু’টি অ্যামোনিয়ার রিজার্ভ ট্যাংক রয়েছে। অ্যামোনিয়া থেকেই ইউরিয়া সার তৈরি করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছরের মধ্য মার্চে বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত গড়ে দৈনিক হাজার টনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল সার কারখানার উৎপাদন। হ্রাসের জন্য সময়মতো ওভারহোলিং (পুনঃসংস্কার) না হওয়াকে দায়ী করা হয়েছে।