ভোটের ২২ দিন আগে ৮ ইউএনও বদলির আদেশের নেপথ্যে

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

গত ২০ জানুয়ারি দেশের আট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বদলি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বদলির প্রজ্ঞাপনের পরের দিনই গত বুধবার বদলি আদেশে অবমুক্তির তারিখ বা তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্তির আদেশ অংশটুকু বাতিল করা হয়। এর পরের দিন গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বদলির আদেশটিই বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাত্র ২২ দিন আগে এমন বদলির আদেশ এবং তা বাতিলের নেপথ্য কী রহস্য থাকতে পারে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভোটের প্রচারণা শুরুর সময় হঠাৎ এমন আদেশে মাঠ প্রশাসনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

জনপ্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, আট উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বদলি নিয়ে নাটকীয়তার নেপথ্যে রয়েছে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের তদবির। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এর মধ্যে দু’-একজন বাদে বাকি কর্মকর্তারা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছিলেন। এতে ঐ রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের বদলির তদবির শুরু করেন। তাদের এ বদলির তদবিরে সহযোগিতা করেন নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা উপসচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি উইংয়ের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদায় কর্মরত থাকা দলটির সমর্থক সিন্ডিকেট। এ দুই প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অন্ধকারে রেখেই তাদের বদলি আদেশ দেয়া হয়েছিল। যদিও প্রতিষ্ঠান দু’টির প্রধানরা এ দুই কর্মকর্তা দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত বলে গুঞ্জন আছে। তার পরেও বিভিন্ন পক্ষের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাদের বদলি আদেশ বাতিল করা হয়।

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, আট ইউএনওর বদলির প্রজ্ঞাপনের পরের দিনই প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও একজন নির্বাচন কমিশনারের সাথে সাক্ষাৎ করে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা। তারা ভোটের ২২ দিন আগে আট ইউএনওকে বদলির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে তারা কিছু জানেন না বলে জানান। পরে তাদের প্রজ্ঞাপন দেখালে তারা অবস্থান পরিবর্তন করে অনুমোদনের বিষয়টি স্বীকার করেন।

জারি করা আদেশে বরগুনার পাথরঘাটার ইউএনও ইসরাত জাহানকে ভোলার চরফ্যাশনে, চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের ইউএনও মো: আল-আমীনকে ফরিদপুরের নগরকান্দায়, পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার ইউএনও রেহেনা আক্তারকে বগুড়ার ধুনটে, হবিগঞ্জের বাহুবলের ইউএনও লিটন চন্দ্র দে-কে চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে ইউএনও হিসেবে বদলি করা হয়েছিল।

এ ছাড়া বগুড়ার ধুনটের ইউএনও প্রীতিলতা বর্মনকে হবিগঞ্জের বাহুবলে, ফরিদপুরের নগরকান্দার ইউএনও মেহরাজ শারবীনকে নেত্রকোনার কলমাকান্দায়, নেত্রকোনার কলমাকান্দার ইউএনও মাসুদুর রহমানকে পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ায় এবং ভোলার চরফ্যাশনের ইউএনও মো: লোকমান হোসেনকে বরগুনার পাথরঘাটায় বদলি করা হয়েছিল।

আদেশ বলা হয়েছে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে ন্যস্তকৃত কর্মকর্তারা নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য ‘দ্য কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর-১৮৯৮’ এর সেকশন ১৪৪ অনুযায়ী ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবেন। এ ছাড়া বদলি করা কর্মকর্তাদের ২২ জানুয়ারির মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যোগদান না করলে ওই তারিখের অপরাহ্ণে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিক অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) বলে গণ্য হবেন।

১৭ জানুয়ারি বিকেলে নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার লেংগুড়া বাজারে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমানের ভাই পরভেজসহ কয়েকজন মিলে সরকারি জায়গা দখল করে ঘর তুলছিলেন। উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাসুদুর রহমানকে স্থানীয়রা খবর দিলে তিনি গিয়ে ঘটনার সত্যতা পেয়ে পারভেজকে আটক করেন। এ ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় ইউপি চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান গিয়ে ইউএনওকে শাসিয়ে বলেন, ‘এখানে কার অনুমতিতে এসেছেন। আমি এ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, আমার ইউনিয়নে মোবাইলকোর্ট করতে হলে আমাকে বলতে হবে।’ ইউএনও প্রশ্ন করেন, এটা কোন আইনে আছে? তখন চেয়ারম্যান বলেন, এটা ইউনিয়ন পরিষদ আইনে আছে।

এ ঘটনায় পরদিন (১৮ জানুয়ারি) লেংগুড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান ভূঁইয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এর একদিন পর ২০ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে কলমাকান্দা উপজেলার ইউএনও মাসুদুর রহমানকে পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার ইউএনও হিসেবে বদলি করে।

তিন মাস আগে বগুড়ার ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন হওয়া প্রীতিলতা বর্মন ১৯ জানুয়ারি ধুনট হাসপাতালের সরকারি জমি দখল করে দোকান নির্মাণের খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন। এতে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি উইং-এর সিন্ডিকেটকে দিয়ে তাকে সেখান থেকে বদলি করায়।

আল-আমিন এক বছর ধরে অত্যন্ত সুনাম ও নিরপেক্ষতার সাথে জীবননগরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয় প্রভাবশালী পক্ষের সাথে বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিতে তারা একইভাবে এপিডি উইং-এর সিন্ডিকেটকে দিয়ে তাকে সেখান থেকে বদলি করানোর চেষ্টা করে। একইভাবে ফরিদপুরের নগরকান্দার ইউএনও মেহেরাজ শারবীন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের কারণে একটা বিশেষ গোষ্ঠীর চক্ষুশুল হলে তাকেও বদলি করার আদেশ দেয়া হয়।