কিছু কর্মকর্তার ষড়যন্ত্রে ধ্বংসের মুখে তাঁতশিল্প

তাঁতশিল্প চরম সঙ্কটের মুখে। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের বিতর্কিত কয়েক কর্মকর্তার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সারা দেশের অধিকাংশ তাঁত কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রায় ৩০ লাখ তাঁতি ও ৬০ লাখ তাঁত শ্রমিক ভয়াবহ দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক শতাব্দীর পুরনো দেশীয় তাঁতশিল্প সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প চরম সঙ্কটের মুখে। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের বিতর্কিত কয়েক কর্মকর্তার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সারা দেশের অধিকাংশ তাঁত কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রায় ৩০ লাখ তাঁতি ও ৬০ লাখ তাঁত শ্রমিক ভয়াবহ দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক শতাব্দীর পুরনো দেশীয় তাঁতশিল্প সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘ দিন ধরে তাঁতিরা বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের সহায়তায় সুতা, রঙ ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্য আমদানি করে স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন। এতে উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম থাকায় তারা টিকে থাকার সুযোগ পেতেন। কিন্তু গত দেড় বছর ধরে তাঁত বোর্ড কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই তাঁতিদের জন্য সুতা আমদানি সুপারিশ বন্ধ করে রেখেছে। ফলে তাঁতিরা খোলা বাজার থেকে দ্বিগুণ দামে কাঁচামাল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে যেখানে একটি কাপড় তৈরিতে গড়ে ৫০০ টাকা খরচ হতো, বর্তমানে সেই একই কাপড়ে খরচ হচ্ছে প্রায় এক হাজার টাকা। উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তাঁত পণ্যের দামও বাড়ছে, ফলে বাজারে দেশীয় তাঁতপণ্যের চাহিদা কমে যাচ্ছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাঁতিদের ওপর। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার হাজার তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছে।

তাঁত নেতারা অভিযোগ করেন, তাঁতিদের উৎপাদন ক্ষমতা দুর্বল করার লক্ষ্যে আওয়ামী দোসর হিসেবে পরিচিত একটি কুচক্রী মহল প্রশাসনের ভেতরে থেকে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট দফতরে প্রভাব খাটিয়ে তাঁতিদের জন্য প্রযোজ্য এসআরও (স্ট্যাটিউটরি রেগুলেটরি অর্ডার) বন্ধের পাঁয়তারা করছে।

এই ষড়যন্ত্র অবিলম্বে বন্ধ না হলে তাঁতশিল্প সম্পূর্ণভাবে মুখ থুবড়ে পড়বে।

বাংলাদেশ জাতীয় তাঁতি সমিতির সম্পাদক ফজলুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, নতুনভাবে বাংলাদেশ জাতীয় তাঁতি সমিতি অনুমোদনের পর থেকে এখন পর্যন্ত তাঁত বোর্ড আমাদের কোনো ধরনের আমদানি সুপারিশ বা মালামাল বণ্টন করেনি। শুধু নানা প্রক্রিয়া ও জটিলতা তৈরি করে মাসের পর মাস বৈঠক চলছে, কিন্তু বাস্তব কোনো সিদ্ধান্ত নেই। প্রায় দুই বছর আগে আমদানি করা সুতা, রঙ ও রাসায়নিক দ্রব্য সময়মতো বণ্টন না করায় সেগুলোর মান নষ্ট হয়ে গেছে, যার পুরো ক্ষতির বোঝা বহন করতে হচ্ছে দরিদ্র তাঁতিদের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছরের (২০২৪) জুন মাসে নরসিংদীর আমিরগঞ্জ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড প্রাথমিক তাঁতি সমিতির নামে প্রায় দুই কোটি টাকার সুতা, রঙ ও রাসায়নিক আমদানি করা হয়। এসব মালামাল বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের লিয়াজোঁ অফিসের গোডাউনে সংরক্ষণ করা হলেও ডিজিএম ও সংশ্লিষ্ট সদস্যরা বণ্টনের অনুমতি না দেয়ায় সেগুলো গোডাউনেই পচে নষ্ট হয়ে যায়।

একইভাবে সিরাজগঞ্জের দু’টি তাঁতি সমিতির আমদানিকৃত মালামালও দীর্ঘ দিন ধরে গোডাউনে পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার পথে রয়েছে।

তাঁতি নেতা আবদুল বাতেন নয়া দিগন্তকে বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক জারীকৃত নতুন এসআরও অনুযায়ী যেসব শর্ত আরোপ করা হয়েছে, তাঁতিরা সেগুলো সম্পূর্ণভাবে পরিপালন করেই আমদানি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। এর বাইরে নতুন কোনো শর্ত চাপিয়ে দেয়া হলে তা সাধারণ তাঁতিদের পক্ষে মানা সম্ভব নয়। তিনি অভিযোগ করেন, অত্যন্ত সুকৌশলে কিছু বিতর্কিত কর্মকর্তা তাঁতিবিরোধী মতামত মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলছেন।

তাঁতি নেতারা বলেন, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডে এখনো আওয়ামী দোসররা বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে।

বিশেষ করে তাঁত বোর্ডের সদস্য দেবাশীষ নাগ (এস অ্যান্ড এম), উপমহাব্যবস্থাপক রতন চন্দ্র সাহা (এসসিআর)-সহ কয়েকজন কর্মকর্তা তাঁতিদের জন্য প্রযোজ্য এসআরও বাস্তবায়নে সরাসরি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের কারণেই গত দেড় বছর ধরে তাঁতিরা প্রয়োজনীয় সুতা, রঙ ও রাসায়নিক দ্রব্য আমদানি করতে পারছেন না। এসব কর্মকর্তার প্রভাবেই চেয়ারম্যান আমদানি সুপারিশ কার্যকর করছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।

তাঁত নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এ বিষয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সারা দেশের তাঁতিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন। তাঁতশিল্প রক্ষায় এটি এখন সময়ের দাবি।