নয়া দিগন্ত ডেস্ক
নাফ নদীর মোহনায় তখন সন্ধ্যা নামছিল। জালের ভেতর ঝিকমিক করছিল রুপালি মাছ। দূরে সেন্টমার্টিনের দিক থেকে আসা বাতাসে লবণাক্ত গন্ধ। এমন সময় আচমকা ইঞ্জিনের তীব্র শব্দে কেঁপে ওঠে ছোট্ট ট্রলারটি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চার দিক ঘিরে ফেলে কালো রঙের স্পিডবোট। হাতে ভারী অস্ত্র, মুখে কাপড় বাঁধা কয়েকজন লোক চিৎকার করতে করতে ট্রলারে উঠে পড়ে। এরপর হাত বেঁধে চোখে কালো কাপড় পরিয়ে তুলে নেয়া হয় ইলিয়াস মাঝি ও তার দুই ছেলেকে।
টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের জেলে ইলিয়াস মাঝি এখনো সেই ভয়াবহ মুহূর্ত ভুলতে পারেননি। ছয় মাস পর বাড়ি ফিরলেও তার চোখেমুখে এখনো বন্দিজীবনের আতঙ্ক। কথা বলতে বলতে থেমে যান বারবার। গলায় জমে ওঠে কান্না।
তিনি বলেন, ‘মারধরে আমার দুইটা দাঁত পড়ে গেছে। সারাক্ষণ পায়ে শিকল বাঁধা থাকতো। পাথর টাঙানো, ক্ষেতের কাজ, ক্যাম্প পরিষ্কার সব করাইত। একটু বসলে রড দিয়ে মারত।’
তার গল্প শুধু একজন জেলের নয়; এটি এখন পুরো উপকূলের গল্প। নাফ নদী থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত বাংলাদেশের জেলেদের জীবনে নতুন আতঙ্কের নাম আরাকান আর্মি। জাগো নিউজ।
সমুদ্র এখন জীবিকার নয়, ভয়ের নাম
টেকনাফ, সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ কিংবা সেন্টমার্টিন এই উপকূলের হাজারো পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল। সমুদ্রই তাদের ভাতের থালা, সন্তানদের স্কুলের খরচ, পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
কিন্তু গত দুই বছরে সেই সমুদ্রই যেন মৃত্যুপুরী হয়ে উঠেছে।
জেলেরা বলছেন, গভীর সমুদ্রে দৃশ্যমান কোনো সীমারেখা নেই। জোয়ার-ভাটা, স্রোত ও মাছের অবস্থানের কারণে অনেক সময় নৌকা অজান্তেই সীমান্তের কাছাকাছি চলে যায়। আর সেই সুযোগেই আরাকান আর্মির স্পিডবোট এসে জেলেদের ধরে নিয়ে যায়।
চল্লিশোর্ধ নূরুল আলম মাঝি বলেন, ‘আগে দরিয়ার ভয় ছিল ঝড়। এখন সবচেয়ে বড় ভয় আরাকান আর্মি। কখন কোথা থেকে এসে ধরে নিয়ে যায়, সেই আতঙ্কে মাছ ধরি।’
ছয় মাস বন্দী থাকার পর ফিরে আসা নূরুল নিজের শরীরের ক্ষতচিহ্ন দেখিয়ে বলেন, ‘ওরা সবাইকে মারধর করে। কেউ রেহাই পায় না।’
বন্দিজীবনের নির্মম বাস্তবতা
আরাকান আর্মির হাতে আটক হওয়া জেলেদের বর্ণনায় উঠে এসেছে ভয়ঙ্কর এক বাস্তবতা।
প্রথম কয়েকদিন খাবার না দিয়ে রাখা, পরে আধাসিদ্ধ ভাত, শুঁটকি কিংবা সিদ্ধ কলাগাছ খেতে দেয়া, পায়ে শিকল বেঁধে শ্রম করানো এসব যেন সেখানে নিয়মিত ঘটনা।
শাহপরীর দ্বীপের যুবক জাহাঙ্গীর আলম প্রায় ছয় মাস বন্দী ছিলেন। তিনি বলেন, ‘চার দিন পর আমাদের পায়ে শিকল লাগায়। পাহাড় থেকে পাথর টানতে হতো। পানি বহন করতে হতো। কাজ না পারলে মারত।’
তার ভাই ইব্রাহিম জানান, পরে তাদের এক ধরনের অস্থায়ী আদালতে নেয়া হয়। কোনো আইনজীবী ছাড়াই ‘মিয়ানমারের জলসীমায় মাছ চুরি’ করার অভিযোগে ১০ বছরের সাজা ঘোষণা করা হয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো এই বন্দীদের অনেকের পরিবারের কাছে মাসের পর মাস কোনো খবরই পৌঁছায় না। ২৫ বছর বয়সী রাসেল গত বছরের ডিসেম্বরে মাছ ধরতে গিয়ে আর ফেরেননি। মা মিনারা বেগম এখনো প্রতিদিন অপেক্ষা করেন ছেলের জন্য।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘একটা মাত্র বড় পোলা। পাঁচ মাস হইলো কোনো খবর নাই। ছোট ছোট সন্তান নিয়ে কষ্টে দিন যাইতেছে। একবেলা খাইলে আরেকবেলা না খাইয়া থাকি।’
শুধু অপহরণ নয়, তথ্য আদায়ের চেষ্টাও
ফিরে আসা অনেক জেলে জানিয়েছেন, আরাকান আর্মি শুধু তাদের আটকই করে না; বাংলাদেশের সীমান্ত পরিস্থিতি সম্পর্কেও তথ্য জানতে চায়।
জেলে মাহমুদুল হাসান জানান, তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল বাংলাদেশের সীমান্তে কোথায় বিজিবির ক্যাম্প আছে, কতজন সদস্য মোতায়েন থাকে, কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়।
তিনি বলেন, ‘তথ্য দিতে না চাইলে মারধর করত।’
এই তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদেরও ভাবিয়ে তুলেছে। কারণ এটি কেবল জলসীমা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়; বরং সীমান্ত ঘিরে কৌশলগত তৎপরতার ইঙ্গিতও বহন করে।
কেন হঠাৎ এত সক্রিয় আরাকান আর্মি?
সংশ্লিষ্টদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে।
প্রথমত, রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সাথে চলমান সঙ্ঘাতে আরাকান আর্মি এখন নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরো শক্ত করতে চাইছে। সমুদ্রপথে সরকারি বাহিনীর হামলার আশঙ্কায় তারা পুরো উপকূল এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে।
দ্বিতীয়ত, খাদ্য ও সরঞ্জামের সঙ্কট। বিভিন্ন সূত্র বলছে, চাল, ডাল, আলু, চিনি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্য বাংলাদেশ থেকে অবৈধ পথে আরাকান এলাকায় যায়। এই সরবরাহ বন্ধ হলেই জেলেদের ওপর চাপ বাড়ে।
অনেক জেলে দাবি করেছেন, খাদ্যপণ্য যাওয়া বন্ধ হলে আরাকান আর্মি বেশি করে জেলে ধরে নিয়ে যায়।
তৃতীয়ত, বিশ্লেষকদের ধারণা বাংলাদেশের সাথে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ বা ‘স্বীকৃতি’ তৈরি করতেও জেলেদের ব্যবহার করছে তারা। কারণ জেলে ফেরত আনার জন্য শেষ পর্যন্ত বিজিবি বা স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগ করতেই হয়।
উপকূলে দালাল চক্রের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাংলাদেশের ভেতরেও আরাকান আর্মির তথ্যদাতা বা দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। শাহপরীর দ্বীপের বোটমালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুর গফুর বলেন, ‘বাংলাদেশে দালাল না থাকলে এত সহজে জেলেদের ধরে নিতে পারত না। কোন নৌকায় কয়জন যাচ্ছে এই তথ্য কেউ না কেউ দেয়।’
এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা না হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে দেখছে।
রোহিঙ্গা বাস্তবতা ও সীমান্তের জটিলতা
এই সঙ্কটের সাথে রোহিঙ্গা বাস্তবতাও জড়িয়ে গেছে।
অনেক বাংলাদেশী জেলে কম মজুরিতে রোহিঙ্গা শ্রমিক নিয়ে সমুদ্রে যান। কারণ রোহিঙ্গারা রাখাইন উপকূলের মাছ ধরার এলাকা সম্পর্কে ভালো জানেন।
কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. জিয়াউল হক বলেন, ‘আরাকান এলাকায় যুদ্ধের কারণে স্থানীয়রা মাছ ধরতে পারছে না। রোহিঙ্গারাই বাংলাদেশের জেলেদের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যায়।’
তবে তিনি দাবি করেন, আরাকান আর্মি বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরে ঢুকে কাউকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
পরিবারগুলোর নিঃশব্দ যুদ্ধ
যে মানুষগুলো সমুদ্র থেকে ফিরে আসে, তারা শুধু শারীরিক নির্যাতনের স্মৃতি নিয়েই ফেরে না; সাথে নিয়ে আসে ভাঙা সংসার, ঋণের বোঝা আর গভীর মানসিক ট্রমা।
জাহাঙ্গীর আলম বন্দী থাকাকালে তার স্ত্রী সংসার চালাতে ৩০ হাজার টাকা ঋণ করেন। এখনো সেই ঋণ শোধ হয়নি। অন্য দিকে ইলিয়াস মাঝির সাত লাখ টাকার ট্রলার এখনো আরাকান আর্মির দখলে। অনেক পরিবারে এখন একবেলার খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। শিশুদের স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নারীরা ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছেন।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো অনেক পরিবার জানেই না তাদের স্বজন জীবিত না মৃত।
রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা ও কূটনৈতিক সঙ্কট
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আরাকান আর্মি কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনী নয়। ফলে তাদের সাথে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।
কক্সবাজার বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের মাধ্যমে জেলেদের ফেরত আনি। ফরমাল রিলেশন না থাকায় বিষয়গুলো সমাধান কঠিন।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও বলছেন, আরাকান আর্মি ‘নন-স্টেট অ্যাক্টর’ হওয়ায় সরাসরি কূটনৈতিক উদ্যোগ সীমিত।
তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাস্তবতাকে অস্বীকার করে লাভ নেই। রাখাইনের একটি বড় অংশ এখন কার্যত আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। ফলে সীমান্ত নিরাপত্তা ও জেলেদের সুরক্ষায় কোনো না কোনো কার্যকর যোগাযোগ কাঠামো তৈরি করতেই হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আরাকান আর্মির সাথে কার্যকর যোগাযোগ দরকার। একই সাথে তাদের স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে বাংলাদেশ এ ধরনের আচরণ মেনে নেবে না।’
সমাধান কোন পথে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সঙ্কটের সমাধানে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি।
প্রথমত, জেলেদের জিপিএস ও ডিজিটাল নেভিগেশন প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা অনিচ্ছাকৃতভাবে সীমান্ত অতিক্রম না করেন।
দ্বিতীয়ত, ট্রলারে বাধ্যতামূলক ট্র্যাকিং ডিভাইস বসানো যেতে পারে।
তৃতীয়ত, সীমান্ত ও সমুদ্র এলাকায় কোস্টগার্ড ও বিজিবির টহল আরো জোরদার করতে হবে।
চতুর্থত, স্থানীয় দালাল চক্র শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সবশেষে, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ এই জেলেরা কোনো ভূরাজনৈতিক খেলোয়াড় নন। তারা শুধু জীবিকার তাগিদে সমুদ্রে যাওয়া সাধারণ মানুষ।



