ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের ফের পাল্টাপাল্টি হামলায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে শঙ্কা

Printed Edition

আলজাজিরা

উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে, ফলে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অগ্রগতি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ইরানের সামরিক বাহিনী আইআরজিসি গতকাল দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

এর আগে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্টকম জানায়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার স্থাপনায় তারা হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানি ড্রোন হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। সেন্টকম এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরানি বাহিনীর এই হামলা বাণিজ্যিক নৌপরিবহনের বিরুদ্ধে ‘অযৌক্তিক আগ্রাসন’ এবং এটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অন্য দিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরানের উপকূলীয় নজরদারি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো এসব নৃশংস হামলা যুদ্ধ শেষ করার সমঝোতাস্মারকের একটি প্রকাশ্য লঙ্ঘন। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী সিরিক বন্দরের তাহেরুই জেটি এলাকায় শুক্রবার গভীর রাতে একটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। সামরিক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, এলাকায় একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানার ফলে ওই বিস্ফোরণ ঘটে। তবে রাষ্ট্রীয় ঘনিষ্ঠ মেহের নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, সিরিক বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে এবং বন্দরের কোনো স্থাপনা বা যন্ত্রপাতির ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। এ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেন, হরমুজ প্রণালীতে চলাচলরত একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের ড্রোন হামলা যুদ্ধবিরতি চুক্তির ‘একটি বোকামিপূর্ণ লঙ্ঘন’। এরপর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সতর্ক করে বলেন, ‘ইরান যদি আরো কোনো হামলা চালায়, তাহলে সহিংসতার জবাব সহিংসতার মাধ্যমেই দেয়া হবে।’ এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরজিসির বিবৃতি প্রচার করে। সেখানে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে উপসাগরে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। আইআরজিসি আরো হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ‘আগ্রাসন আবারো হলে আমাদের জবাব এবারকার চেয়েও আরো ব্যাপক হবে।’

সাম্প্রতিক এই সংঘর্ষে গত ১৭ জুন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতাস্মারক (এমওইউ) কার্যকর থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চুক্তিটি ছিল মূলত একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা, যার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে পরবর্তী পর্যায়ে আলোচনা এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা ছিল। বিশেষ করে বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ছিল আলোচনার প্রধান বিষয়। ইরান এর আগে জানিয়েছিল, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে উপসাগরে প্রবেশ বা বের হতে পারবে না। তবে বাস্তবে অনেক জাহাজ বিকল্প পথ ব্যবহার করে চলাচল অব্যাহত রেখেছে। এ দিকে সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এভার লাভলি’ বৃহস্পতিবার হামলার শিকার হয়। এরপর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা সঙ্কট এবং পারমাণবিক ইস্যু- এই তিনটি বিষয়ই এখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাহরাইনে হামলা

এ দিকে বাহরাইনের ভূখণ্ডে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। বাহরাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা ভোরে চালানো ইরানি ড্রোন হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে এবং এটিকে সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের থ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বেশ কয়েকটি ড্রোন দিয়ে তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। তবে এর সঠিক অবস্থান বা লক্ষ্যবস্তুর প্রকৃতি নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, এই ঘটনা বেসামরিক নাগরিকদের জীবন বিপন্ন করছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে।