মজুদ সঙ্কটে এলএনজির সরবরাহ আবার কমেছে নতুন জাহাজ আসা নিয়ে অনিশ্চয়তা

স্পট মার্কেট থেকে কিনে দ্রুত সরবরাহের কথা বলছে পেট্রোবাংলা

Printed Edition

নূরুল মোস্তফা কাজী, চট্টগ্রাম

ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল দু’টি সচল হওয়ার পর গ্যাসের সরবরাহ কয়েকদিন আগে কিছুটা বেড়েছিল। কিন্তু এলএনজির মজুদ সঙ্কটে সরবরাহ আবার কমেছে। এক্সিলারেটের সরবরাহ ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমেছে। তবে নাইজেরিয়া থেকে ছেড়ে আসা এক জাহাজ এলএনজি আগামীকাল বৃহস্পতিবার পৌঁছার পর পরিস্থিতির উন্নতির ব্যাপারে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা। পরিস্থিতি উন্নতির সাময়িক আশাবাদের পাশাপাশি নতুন করে জাহাজের সিডিউল নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। পেট্রোবাংলা বলছে স্পট মার্কেট থেকে দ্রুত দুই জাহাজ এলএনজি ক্রয় করে শিগগিরই সরবরাহ লাইনে নিয়ে আসা হবে।

বাংলাদেশ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার এনার্জি ও ওমানের ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেডের কাছ থেকে এলএনজি সংগ্রহ করে। এ ছাড়া সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আরামকো ট্রেডিং এসএ’র সাথে স্বল্পমেয়াদি জিটুজি চুক্তিও রয়েছে। এর বাইরে পেট্রোবাংলার তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্য থেকে দরপত্রের মাধ্যমে খোলাবাজার থেকেও এলএনজি কেনা হয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সঙ্কট কাটাতে দরপত্র ছাড়াই ডিপিএম (সরাসরি ক্রয়) পদ্ধতিতে এলএনজি আমদানির ক্রয়াদেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সব জাহাজের সিডিউল নিশ্চিত করা যায়নি। এলএনজি আমদানির দায়িত্বে থাকা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানিও নতুন কোনো জাহাজের সিডিউল জানাতে পারেনি। ফলে আগামীকাল একটি জাহাজ পৌঁছার পর সীমিত সময়ের জন্য গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও দীর্ঘমেয়াদে আবার অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

উদ্ভুত পরিস্থিতিতে গত ১২ আগস্ট অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি আট জাহাজ এলএনজি ডিপিএম পদ্ধতিতে জরুরি ভিত্তিতে সংগ্রহের প্রস্তাব অনুমোদন করে। এর মধ্যে হংকং ঝেনইউ শিপিং থেকে দু’টি, মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস থেকে দু’টি, চীনের চায়না রুনজে হোল্ডিংস থেকে দু’টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের দারাব ইনকরপোরেটেড থেকে দুই জাহাজ এলএনজি সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আমদানি করা হবে।

ফেরত যাচ্ছে এক জাহাজ এলএনজি : সৌদি আরামকো প্রেরিত ৬১ হাজার ৩৬৯ মেট্রিকটন এলএনজি বোঝাই লাইবেরীয় পতাকাবাহী এলএনজি ট্যাংকার আল হামরা কার্গো খালাস না করেই ফেরত যাচ্ছে। জাহাজটির স্থানীয় এজেন্ট ইউনিগ্লোবাল শিপিংয়ের কর্মকর্তারা জানান, পেট্রোবাংলা এবং এলএনজি টার্মিনালের পক্ষ হতে জাহাজটি থেকে এলএনজি স্থানান্তর ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়ায় তা রিসিভ করা হয়নি। পোর্ট ক্লিয়ারেন্স পেলেই জাহাজটি ফেরত যাবে বলে সূত্র জানায়। আগামী ২৪-২৫ তারিখের দিকে নতুন জাহাজের সিডিউল পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হওয়ার কথাও জানান ওই কর্মকর্তা। জাহাজটি গত ১২ আগস্ট মহেশখালীতে পৌঁছে।

কমেছে গ্যাসের সরবরাহ : দৈনিক ১১শ’ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজিসহ দেশে গ্যাসের উৎপাদন ক্ষমতা তিন হাজার ৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে গতকাল ৬২৪ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজিসহ গ্যাস সরবরাহ হয় দুই হাজার ২৬২.৮ মিলিয়ন ঘনফুট। যা গত তিন দিন আগেও ছিল দুই হাজার ৪১৮ মিলিয়ন ঘনফুট। গত ২১ জুলাই মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেটের টার্মিনালে অগ্নি দুর্ঘটনার পর যে পর্যায়ে নেমেছিল গ্যাসের সরবরাহ, মাঝে টার্মিনালটি থেকে সীমিত সবরাহ শুরু হয়ে কিছুটা উন্নতি হলেও গতকাল তা দুর্ঘটনার সময়কার অবস্থায় নেমে এসেছে। অবশ্য রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন আগামীকাল নতুন এলএনজির জাহাজ আসার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

মহেশখালীর পথে মল আজুর : এলএনজি বোঝাই ট্যাংকার জাহাজ মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী মল আজুর আগামীকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দর সীমায় পৌঁছার কথা রয়েছে। মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, নাইজেরিয়ার বন্নি বন্দর থেকে ছেড়ে আসা ৬৮ হাজার ৫৪৮ মেট্রিকটন এলএনজি বোঝাই জাহাজটি গতকাল মঙ্গলবার সাউথ ইন্ডিয়ান ওশ্যানে ছিল।

চট্টগ্রামে গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে : বন্দর নগরী চট্টগ্রামে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানির ডিজিএম (অপারেশন, চট্টগ্রাম) শফিউদ্দিন মো: ফরহাদ ওমর নয়া দিগন্তকে বলেন, এলএনজি টার্মিনালগুলো হতে জাতীয় গ্রিডে ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আসছে, সেখান থেকে চট্টগ্রামের জন্য ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ একেবারেই তলানিতে পৌঁছে ছিল। সে তুলনায় গতকাল সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো: শোয়েব নয়া দিগন্তকে বলেন, এলএনজি আমদানির স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সিডিউল নির্ধারণসহ বিষয়টি দেখভাল করে আরপিজিসিএল। পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে শুধু তদারকিটা করা হয়।

পেট্রোবাংলার ডিজিএম (জনসংযোগ) তারিকুল ইসলাম খান বলেন, এখন পর্যন্ত একটি এলএনজি জাহাজ আগামী ২০ আগস্ট পৌঁছার সিডিউল আছে। স্পট মার্কেট থেকে দুই জাহাজ এলএনজি ক্রয় প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার প্রচেষ্টা চলছে। কাছাকাছি স্পট থেকে পেলে স্বল্প সময়ের মধ্যে আশাকরি জাহাজ চলে আসবে। এ ছাড়া আগামী ২৩ তারিখে একটি জাহাজ আসার সিডিউল থাকলেও সেটি এখন পর্যন্ত নিশ্চয়তা দেয়া যাচ্ছে না বলেও তিনি জানান।

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের চট্টগ্রামস্থ কার্যালয়ের ডিজিএম মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, গতকাল মঙ্গলবার এক্সিলালেরেটের এমএলএনজি টার্মিনাল থেকে ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং সামিট এলএনজি টার্মিনাল থেকে ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। তবে তিনি এলএনজি আমদানির বিষয়ে কোন তথ্য দিতে পারেননি।

রূপান্তরিক প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) ইঞ্জিনিয়ার মো: শফিকুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি টানা মিটিংয়ে থাকার কথা জানান।