নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর আবারো সমুদ্র এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে সরকার। ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০২৬’ নামে ঘোষিত এই উদ্যোগের আওতায় গভীর ও অগভীর সমুদ্রের মোট ২৬টি ব্লক বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। সরকারের আশা, নতুন এই বিডিং রাউন্ড দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন গতি সৃষ্টি করবে। রোববার সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি হয়েছে বলেই বিদেশী কোম্পানিগুলো নতুন করে বাংলাদেশের অফশোর খাতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার। নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। এই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে।’
১০০ দিনের অঙ্গীকার থেকে বিডিং রাউন্ড : মন্ত্রী জানান, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সমুদ্র এলাকায় জ্বালানি অনুসন্ধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়। নির্বাচনী ইশতেহারে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, তার অংশ হিসেবে ১০০ দিনের মধ্যে অফশোর বিডিং রাউন্ড আয়োজনের নির্দেশনা দেয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতায় চূড়ান্ত করা হয়েছে ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি)-২০২৬’। সরকারের মতে, নতুন মডেল পিএসসিতে এমন কিছু সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে। এর মধ্যে রয়েছে শতভাগ কস্ট রিকভারি সুবিধা, ব্রেন্ট ক্রুডের সাথে গ্যাসের মূল্য সমন্বয়, কন্ট্রাক্টরের আয়কর পেট্রোবাংলার বহন, আমদানিকৃত যন্ত্রপাতিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং নির্দিষ্ট শর্তে গ্যাস রফতানির সুযোগ।
১৯৯৩ সালের সাফল্যের পুনরাবৃত্তির আশা: সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী অতীতের সফল অফশোর বিডিং রাউন্ডের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৯৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত প্রথম সফল বিডিং রাউন্ডের মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর সাথে একাধিক পিএসসি চুক্তি হয়। সেই চুক্তির ফলেই আবিষ্কৃত হয়েছিল বিবিয়ানা ও সাঙ্গুর মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্র। মন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে উৎপাদিত গ্যাসের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে শেভরন পরিচালিত গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে। তাঁর মতে, বিদেশী বিনিয়োগের সুফল দেশ আগেও পেয়েছে এবং নতুন বিডিং রাউন্ড থেকেও একই ধরনের ইতিবাচক ফল আসতে পারে।
গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ: জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। একটি প্রকল্পে ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। অনুসন্ধানে কাক্সিক্ষত সম্পদ না মিললে সরকার কোনো ক্ষতিপূরণ দেবে না, বরং প্রয়োজন হলে ব্যাংক গ্যারান্টিও বাজেয়াপ্ত করতে পারে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে পিএসসির বিভিন্ন শর্ত নমনীয় করা হয়েছে বলে জানান তিনি। বিশেষ করে গভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে দু’টি সংলগ্ন ব্লকের জন্য একক চুক্তির সুযোগ রাখাকে বড় সুবিধা হিসেবে দেখছে সরকার।
২৬ ব্লকে দরপত্র, আগ্রহী বিদেশী কোম্পানি: পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, অগভীর সমুদ্রের ১১টি এবং গভীর সমুদ্রের ১৫টিসহ মোট ২৬টি ব্লক বিডের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। আগ্রহী কোম্পানিগুলো এককভাবে অথবা কনসোর্টিয়াম গঠন করে দরপত্রে অংশ নিতে পারবে। বিড জমা দেয়ার শেষ সময় আগামী ৩০ নভেম্বর। মন্ত্রী জানান, এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কয়েকটি কোম্পানি সরকারের সাথে যোগাযোগ করেছে এবং তারা বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে চাই। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েই এবার এগোনো হচ্ছে।’
বাপেক্সকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা: বাপেক্সের সক্ষমতা প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সরকার দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে আরো শক্তিশালী করতে চায়। তবে গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানের মতো উন্নত প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা এখনো প্রতিষ্ঠানটির নেই। এজন্য বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ উদ্যোগে কাজ করার সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে বাপেক্স নিজস্ব সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, সরকার সমুদ্র ও স্থলভাগ-উভয় ক্ষেত্রেই জ্বালানি অনুসন্ধান জোরদার করছে। একই সাথে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা চূড়ান্ত করার কাজও চলছে এবং আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে তা অনুমোদন পেতে পারে বলেও জানান তিনি।



