বাংলাদেশের কৃষি খাত দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্বত্বভোগী, অস্বচ্ছ বাজারব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকার। এই বাস্তবতায় কৃষকদের সরাসরি রাষ্ট্রীয় সুবিধার আওতায় আনতে ‘ফার্মার্স কার্ড’ উদ্যোগকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অন্যতম প্রতিশ্রুতি হিসেবে সামনে এনেছে বিএনপি। দলটির দাবি এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কৃষকরা একটি নিরাপদ ডিজিটাল পরিচয়পত্রের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই ভর্তুকি, ন্যায্যমূল্য, সহজ ঋণ, ফসল বীমা এবং সরকারি ক্রয় সুবিধা পাবেন।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি বলেছেন, ‘কৃষক শুধু ভোটার নন, তিনি জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ফার্মার্স কার্ডের মাধ্যমে আমরা কৃষকদের রাষ্ট্রের সরাসরি অংশীদার করতে চাই, যাতে তাদের ন্যায্য অধিকার আর কেউ কেড়ে নিতে না পারে।’ তিনি আরো বলেন, ডিজিটাল পরিচয়ভিত্তিক এই ব্যবস্থার ফলে কৃষি খাতে দুর্নীতি ও লিকেজ কমবে এবং কৃষকের আয় বাড়বে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, ফার্মার্স কার্ড হবে একটি ইউনিক ডিজিটাল আইডি, যা জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে সমন্বিত থাকবে। প্রতিটি কার্ডে কৃষকের জমির পরিমাণ, ফসলের ধরন, উৎপাদন ইতিহাস এবং ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট সংযুক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে সরকার প্রদত্ত সার, বীজ, সেচ ও নগদ ভর্তুকি সরাসরি কৃষকের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় কৃষক উৎপাদন খরচই তুলতে পারে না। ফার্মার্স কার্ড চালু হলে সরকারি ক্রয়কার্যক্রমে কৃষকের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে এবং ন্যায্য দাম পাবে। তিনি জানান, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঘোষণা ও তাৎক্ষণিক পেমেন্টের ব্যবস্থা রাখা হবে।
বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিএনপি জানিয়েছে, ক্ষমতায় এলে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে দেশব্যাপী কৃষক নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করা হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে ডেটা সংগ্রহ ও যাচাই করা হবে। একই সাথে তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা হবে।
কৃষি ঋণ ও বীমার ক্ষেত্রে ফার্মার্স কার্ড একটি গেম-চেঞ্জার হবে বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। বিএনপির সিনিয়র নেতা শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘কার্ডের মাধ্যমে কৃষকের ক্রেডিট প্রোফাইল তৈরি হবে। এতে জামানত ছাড়াই স্বল্পসুদে ঋণ এবং দুর্যোগে স্বয়ংক্রিয় ফসল বীমা ক্ষতিপূরণ দেয়া সম্ভব হবে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে ফার্মার্স কার্ড কৃষি খাতে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এর জন্য দরকার স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ে জবাবদিহি।
বিএনপির ভাষ্য অনুযায়ী, ফার্মার্স কার্ড কেবল একটি কার্ড নয়, এটি কৃষকের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায্যতার প্রতীক। নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে এই উদ্যোগ কতটা বাস্তব রূপ পাবে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনে রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জনসমর্থনের ওপর।



