দেশে বন্যা ও পাহাড়ধসে মৃত্যু নতুন নয়। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও পাহাড়ধসের আশঙ্কা থাকে; কিন্তু থাকে না শুধু তা মোকাবেলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি। এ বছরও বন্যা ও পাহাড়ধসের আশঙ্কা ছিল; কিন্তু যথাযথ প্রস্তুতির অভাবে ৪৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এই মৃত্যু ঠেকানো যেত কি না কিংবা এ জন্য কারা দায়ী তা পর্যালোচনা করা জরুরি বৈকি।
সরকারি হিসাবে, গত শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দেশের সাত জেলা- খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের ৫৮টি উপজেলা বন্যাপ্লাবিত হয়েছে। বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা ৪৪ জন। আহত হয়েছেন ৩৯ জন। পানিবন্দী পরিবারের সংখ্যা দুই লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি। ক্ষতিগ্রস্ত ১০ লক্ষাধিক মানুষ।
উদ্বেগের বিষয় হলো- পানিবন্দী মানুষকে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। গণমাধ্যমের খবর- চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও সাতকানিয়ায় মানুষের ভোগান্তি, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানিসঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করেছে। পানিবন্দী বাঁশখালী উপজেলার বাহারছাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ইলশা গ্রামের হাজী লস্কর বাড়ির মোহাম্মদ নুরুল করিম (৬৫) গণমাধ্যমকে বলেছেন, ছয় দিন ধরে তার ঘরের চুলায় আগুন জ্বলেনি। পরিবার-পরিজন নিয়ে মুড়ি, বিস্কুট, কলা খেয়ে দিন পার করেছেন। বাড়িতে টাকা-পয়সা না থাকায় বাইরে থেকে তেমন কিছু কিনে আনাও সম্ভব হয়নি। সরকারি-বেসরকারি কোনো ত্রাণ না পেয়ে সাত সন্তান ও স্ত্রীকে আশ্রয়কেন্দ্রে রেখে এসেছেন।
অন্য দিকে সাতকানিয়ায় এখনো চার লাখের মতো মানুষ পানিবন্দী। ক্ষতিগ্রস্ত ঢেমশা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর ঢেমশা শাহ মোহছেনপাড়ার বাসিন্দা আব্দুল হালিম বলেছেন, আমার চার মেয়ে ও এক ছেলে। গত ছয় দিন খাটে শুয়ে-বসে কাটিয়েছি। ঘরে যে শুকনো খাবার ছিল, তা অনেক আগে শেষ। বাড়ির পাশের লোকজন কিছু চিঁড়া, মুড়ি ও গুড় দিয়েছেন। একজন কিছু রান্না করা খাবার দিয়েছিল। তা দিয়ে আপাতত ক্ষুধা নিবারণ করছি। এখন পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি কোনো ত্রাণ পাইনি।
সেনাবাহিনীসহ সরকারের অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা বন্যাকবলিতদের উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতায় কাজ করছেন। রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও ত্রাণ তৎপরতা চলছে। তারপরেও অনেক পানিবন্দী মানুষ উদ্ধার ও ত্রাণের অপেক্ষায় আছেন। সাধারণত দুর্যোগের সময় উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের সমন্বয়হীনতায় এমনটি হয়ে থাকে। দেখা যায়, কিছু মানুষ বারবার ত্রাণ পাচ্ছেন। অনেকে একবারো পান না। তাই পানিবন্দীদের উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা যেমন জোরদার করা জরুরি; তেমনি সমন্বয়ও থাকা দরকার। মনে রাখতে হবে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা অনেকটা দুর্বল। ফ্যাসিবাদের দোসর হওয়ায় অনেক এলাকায় চেয়ারম্যান-মেম্বার পালিয়েছেন। তাই বন্যাকবলিতদের পাশে দাঁড়ানোর মতো জনপ্রতিনিধিও কম। এমতাবস্থায় সেচ্ছাসেবী রেড ক্রিসেন্ট, স্কাউটের মতো সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো যেতে পারে।
বন্যাকবলিত মানুষকে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা জোরদারের মাধ্যমে তাদের পাশে দাঁড়ানোই হোক এখন সরকারের অগ্রাধিকারের অন্যতম প্রধান কর্তব্য।



