যমুনার চরে বাদাম ও তিলে স্বাবলম্বি শত শত কৃষক পরিবার

Printed Edition

শফিউল আযম বেড়া (পাবনা) সংবাদদাতা

পাবনার বেড়া উপজেলার যমুনা নদীর চরাঞ্চলে এবার বাদাম ও তিলের বাম্পার ফলন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো বৃষ্টি ও পলিযুক্ত বেলে-দোআঁশ মাটির কারণে ফলন বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এ দিকে ভালো দাম পাওয়ায় প্রফুল্ল মেজাজে রয়েছেন কৃষকরা। ক্ষেত থেকে বাদাম তোলা, গাছ থেকে বাদাম ছাড়ানো ও শুকানোর কাজে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন চরাঞ্চলের চাষিরা।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বেড়ায় তিন হাজার ৯১২ একর জমিতে বাদাম এবং প্রায় তিন হাজার একর জমিতে তিল চাষ হয়েছে। বাদাম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই হাজার ৩৪৭ টন এবং তিলের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক হাজার ৮০০ টন। গত বছরের থেকে বাদামের আবাদও বেড়েছে।

নয়নপুর, কল্যাণপুর, পেঁচাকোলা, চরপেঁচাকোলা, চরআড়ালিয়া, সাঁড়াশিয়া, চরসাফুল্লা, চরনাগদা, চরঢালাসহ যমুনার অন্তত ১৮টি চরে বাদাম ও তিলের আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও প্রায় ৩১২ একর বেশি জমিতে এবার বাদামের চাষ হয়েছে।

পেঁচাকোলার সাবেক ইউপি সদস্য মানিক সরোয়ার, নয়নপুরের আজগর মোল্লা ও জাহান মোল্লা, চরসাঁড়াশিয়ার নজরুল ইসলামসহ একাধিক কৃষক জানান, ফাল্গুন মাসে বপন করা এই ফসলের জন্য বৈশাখের বৃষ্টি আশীর্বাদ হয়ে আসে। এবার প্রতি বিঘায় গড়ে ১৮ মণ ভেজা বাদাম পাওয়া যাচ্ছে, যা শুকানোর পর প্রায় ৯ মণে এসে দাঁড়াবে। গত বছর একই জমিতে শুকনো বাদামের উৎপাদন ছিল প্রায় ছয় মণ।

কৃষকদের ভাষ্য, বাদাম চাষে প্রতি বিঘায় গড়ে প্রায় ১১ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। বীজের দাম বাড়ায় এ বছর খরচ কিছুটা বেশি হয়েছে। তবে ফলন ও বাজারদর ভালো থাকায় লাভও বেড়েছে। মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ বাদাম পাঁচ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে বাজারে সরবরাহ বেড়ে দাম কিছুটা কমে চার হাজার ৯০০ টাকায় নেমেছে। তবু গত বছরের থেকে কৃষকরা বেশি লাভ করছেন।

বাদামের পাশাপাশি তিল চাষেও আশাব্যঞ্জক ফল মিলেছে এবার। নয়নপুর, পেঁচাকোলা ও সাঁড়াশিয়া চরে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে তিলের আবাদ করা হয়। কৃষকদের দাবি, প্রতি বিঘায় তিলের ফলন হয়েছে চার থেকে পাঁচ মণের মতো। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ তিল বিক্রি হচ্ছে প্রায় তিন হাজার ৮০০ টাকায়।

নয়নপুরের কৃষক জাহান মোল্লা বলেন, তিল চাষে খরচ কম, আবার জমির উর্বরতাও বাড়ে। তাই আগামী বছর বাদামের সাথে সাথী ফসল হিসেবে আরো বেশি তিল চাষের পরিকল্পনা রয়েছে। তার মতে, তিলের পাতা ও ফুল ঝরে জৈবসার তৈরি হয়, যা পরে ফসলের জন্য বেশ উপকারী।

চরাঞ্চলের বাদাম ও তিলকে কেন্দ্র করে নাকালিয়া ও নগরবাড়ীতে গড়ে উঠেছে বড় পাইকারি মোকাম। প্রতিদিন কৃষকরা নৌকায় করে এসব মোকামে ফসল নিয়ে আসেন। এখানে ২০টির বেশি আড়ত রয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা বাদাম ও তিল কিনতে এখানে আসেন।

নাকালিয়া বাজারের আড়তদার রফিকুল ইসলাম জানান, পাবনার পাশাপাশি সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী ও কুষ্টিয়ার চরাঞ্চলের কৃষকরাও এখানে ফসল বিক্রি করেন। আর ঢাকার পোস্তগোলার ব্যবসায়ী শাজাহান আলী বলেন, এ অঞ্চলের বাদামের গুণগত মান ভালো হওয়ায় সারা দেশে এর চাহিদা রয়েছে।

বাদামকে কেন্দ্র করে নগরবাড়ীতে গড়ে উঠেছে দু’টি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, যেখানে প্রায় ৪০ জন নারী কাজ করছেন। এসব কারখানায় খোসা ছাড়ানো বাদাম বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয়।

বেড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নুসরাত কবীর বলেন, কৃষকদের প্রণোদনা, উন্নত বীজ সরবরাহ এবং নিয়মিত পরামর্শ দেয়ায় এ বছর আবাদ ও উৎপাদন দু’টিই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় বাদামের দানা পুষ্ট এবং রোগবালাইও তুলনামূলক কম হয়েছে। তিলের ফলনও সন্তোষজনক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

যমুনার চরাঞ্চলে বাদাম ও তিল এখন শুধু একটি ফসল নয়, বরং শত শত কৃষক পরিবারের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার নতুন ভিত্তি হয়ে উঠেছে।