পুঁজিবাজারে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও দেশে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনাকারী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শেয়ার আদৌ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় একটুও কমেনি। সাম্প্রতিক উদ্যোগ কি সফল হবে? এই প্রশ্ন নতুন কিছু নয়। বিশ বছরের বেশি সময় ধরে এটাই দেশের পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্য যেন লাখ টাকার প্রশ্ন। আগের সরকারগুলোর মতো এবারো অন্তর্বর্তী সরকার আট মাসেরও বেশি সময় ধরে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের এ ব্যাপারে আশ^স্ত করে চলেছেন। কিন্তু এখনো তা আলোর মুখ দেখছে না। সর্বশেষ গত ৭ জানুয়ারি অর্থ উপদেষ্টার সভাপতিত্বে বিষয়টি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে উচ্চ পর্যায়ে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠক বিনিয়োগকারী তথা সংশ্লিষ্ট সব মহলকে আবারো আশার আলো দেখাচ্ছে। কিন্তু সময়ই বলে দেবে এবারের এ উদ্যোগ কতটা বাস্তবে রূপ পায়।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সঙ্কট ভালো তথা মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি ও শেয়ারের অপ্রতুলতা। আর এ অপ্রতুলতার কারণে একদিকে বাজারে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগে উৎসাহ খুঁজে পান না। অপর দিকে বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা কিছুটা বাড়লেই বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি বেড়ে যায়। আর এভাবে দুই যুগেরও কম সময়ে দুই দুইবার বড় ধরনের বিপর্যয়ে পড়েছে দেশের পুঁজিবাজার। আর প্রতিবারই বিপর্যয় পরবর্তী সরকার ও সংশ্লিষ্টরা বাজারে ভালো শেয়ারের প্রবাহ বৃদ্ধির বিষয়ে সোচ্চার হয়।
কিন্তু ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এ নিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী মহল এবং পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা পুঁজিবাজারকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে এখানে ভালো ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির তালিকাভুক্তির বিষয়ে একমত হলেও বাস্তবে তা দেখা যায়নি। গত বিএনপি সরকারের (২০০১-২০০৬) শেষ দিকে অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের সময় এবং সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে (২০০৭-২০০৮) তখনকার অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জা এ বি আজিজুল ইসলামের সময় বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি মন্ত্রণালয়ের দু’টি বিদ্যুৎ কোম্পানি ও দু’টি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বাজারজাত কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছিল যা তখনকার পুঁজিবাজারের জন্য একটি বড় ঘটনা ছিল। ২০০৬ ও ২০০৭ সালে দুই পর্বে ডিরেক্ট লিস্টিং পদ্ধতিতে এ চারটি কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। তা ছাড়া ২০০৯ সালে টেলিকমিউনিকেশন খাতের বহুজাতিক কোম্পানি গ্রামীণফোন ও ২০২০ সালে একই খাতের আরেক কোম্পানি রবি অজিয়াটা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এ দু’টি কোম্পানি বাজারের গভীরতা বাড়াতে একটি বড় ভূমিকা রাখে।
কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে ২০০৬ সালের পর সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে চেষ্টার পরও কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি এবং সরকারের শেয়ার থাকা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাজারে তালিকাভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। বারবার এ নিয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হলেও প্রতিবারই এ প্রচেষ্টা কোম্পানিগুলোর দায়িত্বে থাকা সরকারেরই কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর গত বছরের মার্চ এপ্রিলে পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক দরপতনের ঘটনা ঘটলে বিনিয়োগকারীরা আবার রাস্তায় নেমে আসে। প্রায় প্রতিদিনই ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে বিনিয়োগকারীদের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও এ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়েও এক ধরনের ক্ষোভ তৈরি হয় যা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পুঁজিবাজার নিয়ে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করে। তখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পুঁজিবাজার উন্নয়নে ভূমিকা রাখার জন্য একজন বিশেষ সহকারীর নিয়োগ দেন। পরে ২০২৫ সালের ১ মে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে ও অর্থ মন্ত্রণালয় ও পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের নিয়ে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা পুঁজিবাজারের তখনকার সঙ্কট নিরসনে বেশ কয়েকটি দিকনির্দেশনা প্রদান করেন, যার মধ্যে অন্যতম ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুততম সময়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ব্যবস্থা করা। এ ছাড়া যেসব বহুজাতিক কোম্পানিতে সরকারের শেয়ার রয়েছে সে সব কোম্পানির সরকারি শেয়ারের একটি অংশ পুঁজিবাজারে নিয়ে আসার উদ্যোগ গ্রহণ করা। অন্যান্য বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকেও বাজারে আসতে উৎসাহিত করার কথা বৈঠকে আলোচনা হয়। বিষয়টি নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বিভিন্ন বৈঠক হলেও এখনো এর সুরাহা হয়নি। সর্বশেষ ৭ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবারো একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায় ওই বৈঠকে চারজন উপদেষ্টার পাশাপশি বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সচিবও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বিষয়ে সরকার সম্মতি প্রদান করে। বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা সাংবাদিকদের জানান বৈঠক যথেষ্ট ফলপ্রসূ হয়েছে। এবং এবারই প্রথম সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তিতে সম্মতি দেয়া হয়েছে। তা ছাড়া বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব অনুসারে তাদের সংশ্লিষ্ট পরিচালনা পর্ষদে এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকারকে অবহিত করার কথা বলা হয়েছে।
৭ জানুয়ারির ওই বৈঠকে আলোচনায় উঠে আসা কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে- কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো), নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড, সিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেড, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড, ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড, সিনোভিয়া বাংলাদেশ লিমিটেড, নোভার্টিস (বাংলাদেশ) লিমিটেড ও নেসলে বাংলাদেশ পিএলসি।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, বৈঠকটি খুবই উচ্চ পর্যায়ের ছিল। সরকারের এ সংক্রান্ত নীতিনির্ধারকদের সবাই এতে উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো যেসব মন্ত্রণালয়ের অধীন এবং যারা এসব কোম্পানির দায়িত্বে রয়েছেন তারা যেমন উপস্থিত ছিলেন, তেমনি বহুজাতিক কোম্পানির প্রতিনিধিরাও ছিলেন। কিন্তু অতীতেও এ ধরনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু তা কর্যকর করা যায়নি। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে একটা ইন্টারেস্ট গ্রুপ রয়েছে যারা চায়না কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আসুক। তারাই বারবার এটাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। আর বহুজাতিক কোম্পানিগুলোও প্রতিবারই তাদের বোর্ড মিটিংয়ের কথা বলে। অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ইউনিলিভার, নেসলে যদি ভারতের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারে তাহলে এখানে কেন পারবে না? তা ছাড়া আমরাতো চাচ্ছি আমাদের সরকারের মালিকানায় থাকা শেয়ারের একটা অংশ বাজারে আনতে। তাতে কেন তারা বাদ সাধবে?
ঢাকা ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনে অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলামের কাছে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এ বৈঠক সম্পর্কে তারা কতটুকু আশাবাদী তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত ২০ বছর থেকে আমরা এটা শুনে আসছি। কিন্তু কোনোভাবেই এটা কার্যকর করা যাচ্ছে না। সরকারের একটি অংশ এটা চায় না। তারা চায় না সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর অংশ দিতে। অথচ এর মাধ্যমেই কোম্পানিগুলোতে স্বচ্ছতা সৃষ্টি হয়। একটা স্বার্থান্বেষী মহলের কারসাজির কারণেই এটা কার্যকর হচ্ছে না। তা ছাড়া বর্তমান সরকারের হাতে আরে তেমন সময় নেই। তবুও তারা যদি এ সময়ের মধ্যে অন্তত একটি কোম্পানিকেও পুঁজিবাজারে আনতে পারে তাহলে এটি পরবর্তী সরকারের জন্য একটি দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করবে। তখন তারাও বাধ্য হবে এসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে।
প্রসঙ্গত, বিগত সরকারের অর্থমন্ত্রী ড. আবুল মাল আবদুল মুহিতের সময় তিনি বারবার রাষ্ট্রায়ত্ত এসব কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘসময় ধরে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করার পরও তিনি পারেননি রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক কোম্পানি পুঁজিবাজারে আনতে।



