ট্রাম্পের দাবি

ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনায় বসতে চায় ইরান

রয়টার্স
Printed Edition

  • আকাশ-স্থল ও নৌপথ ব্যবহার করতে দেবে না আরব আমিরাত

  • হামলা করলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ‘প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়’ নামিয়ে আনার হুমকি ইরানের

  • বিশাল মার্কিন নৌবহর ইরানের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে

  • ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর হামলার আশঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে, ঠিক তখনই ইরান ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনায় বসতে চাচ্ছে। তিনি বলেছেন, বিশাল মার্কিন ‘আর্মাডা’ বা নৌবহর ইরানের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এই আর্মাডা ভেনিজুয়েলা অবরোধ করা মার্কিন নৌবহরের চেয়েও বড়। তাই ইরান সমঝোতা না চাইলে হামলার বিকল্পও হাতে রাখা হয়েছে।

স্থানীয় সময় সোমবার গভীর রাতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে ‘এক বিশাল আর্মাডা’ পাঠানোর নির্দেশ দেয়ার পর ইরান পরিস্থিতি এখন ‘পরিবর্তনশীল অবস্থায়’ রয়েছে। তিনি যোগ করেন, তার বিশ্বাস, তেহরান সত্যিই একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়।

অ্যাক্সিওসের উদ্ধৃতিতে হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা বলেছেন, সামরিক হামলার পথ এখনো একটি বিকল্প হিসেবে খোলা রয়েছে। তারা জানান, ট্রাম্প এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। খবরে আরো বলা হয়, প্রেসিডেন্ট চলতি সপ্তাহে এ নিয়ে আরো পরামর্শ করবেন এবং অতিরিক্ত সামরিক বিকল্পগুলো পর্যালোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এর আগে সোমবার ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন যুদ্ধজাহাজটি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের এরিয়া অব রেসপনসিবিলিটিতে প্রবেশ করে। এটিকে ইরানের কাছাকাছি অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থানে একটি বড় ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধির পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই মোতায়েন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের পাশে আমাদের একটি বড় আর্মাডা রয়েছে। ভেনিজুয়েলার চেয়েও বড়।’ একই সাথে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, কূটনৈতিক পথ এখনো খোলা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘তারা একটি চুক্তি করতে চায়। আমি এটা জানি। তারা বহুবার ফোন করেছে। তারা কথা বলতে চায়।’

সোমবার মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং কয়েকটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। এই অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের আওতাভুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এক্সে জানিয়েছে, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের স্ট্রাইক গ্রুপ ইতিমধ্যে ওই অঞ্চলে পৌঁছেছে। পোস্টে বলা হয়, জাহাজগুলো বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন রয়েছে, যাতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায়।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে’ ওয়াশিংটন ওই অঞ্চলে একটি ‘বিশাল নৌবহর’ পাঠাচ্ছে। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েনের ফলে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের জুনে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে ১২ দিনব্যাপী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে সমর্থন দেয় এবং স্বল্প সময়ের জন্য সরাসরি যুদ্ধে অংশও নেয়। যদিও ট্রাম্প গত সপ্তাহে নতুন সামরিক হামলার হুমকি থেকে কিছুটা সরে আসার ইঙ্গিত দেন, তবে তিনি কখনো সেই বিকল্প পুরোপুরি বাতিল করেননি।

চলতি মাসের শুরুতে যুদ্ধজাহাজগুলো এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে রওনা হয়। ইরানের ভেতরে বিক্ষোভ দমনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই মোতায়েন শুরু হয়। ট্রাম্প একাধিকবার হুমকি দিয়েছিলেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়ে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে। তবে পরে দেশজুড়ে চলা ওই বিক্ষোভ প্রশমিত হয়ে আসে। ইরান দাবি করেছে, বিক্ষোভগুলো শুরুতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শুরু হয়েছিল। তবে পরে সেগুলো ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সংশ্লিষ্ট এজেন্টদের দ্বারা প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়।

এদিকে ইরানি কর্তৃপক্ষ মার্কিন সামরিক হামলার আশঙ্কায় আবারও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। হামলা করলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ‘প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়’ নামিয়ে আনা হবে বলে হুমকি দিয়েছে তেহরান। দেশজুড়ে প্রাণঘাতী বিক্ষোভে জড়িত থাকার অভিযোগে আরও বহু মানুষকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ বা সীমিত থাকায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে।

গত রোববার তেহরানের কেন্দ্রীয় এলাকা এঙ্গেলাব (বিপ্লব) স্কয়ারে একটি বিশাল বিলবোর্ড উন্মোচন করে নগর কর্তৃপক্ষ। এটি ইরানের নৌসীমার কাছে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরী ও সহায়ক যুদ্ধবিমান মোতায়েনের প্রেক্ষাপটে একধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিলবোর্ডে ওপর থেকে দেখা একটি বিমানবাহী রণতরীর ছবি ছিল। তাতে রণতরীর ডেকে ধ্বংসপ্রাপ্ত যুদ্ধবিমান পড়ে থাকতে দেখা যায় এবং চার পাশের পানিতে রক্ত মিশে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার আকৃতি তৈরি করেছে। বিলবোর্ডে ফারসি ও ইংরেজিতে লেখা ছিল ‘বাতাসে যারা বিষের বীজ বোনে, তাদের কপালে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ই জোটে।’ বাইবেলের হোসিয়া অধ্যায়ের এই বিখ্যাত প্রবচনটির মূল ভাব- মানুষ যেমন কর্ম করে, তাকে তেমনই ফল ভোগ করতে হয়।

ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর হামলার আশঙ্কা

মিডল ইস্ট আই-এর এক খবরে বলা হয়েছে, ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ‘নির্ভুল হামলা’ চালানোর বিষয়টি বিবেচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই হামলা চলতি সপ্তাহেই হতে পারে, তবে পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে সময় পরিবর্তন হতে পারে। সূত্রের বরাত দিয়ে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে এ নিয়ে আলোচনা বেশ বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে। কর্মকর্তারা ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধের পরিণতি নিয়ে বিভক্ত মত পোষণ করেন। এক সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প এখনো তেহরানে সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনা ছাড়েননি।

আকাশ-স্থল ও নৌপথ ব্যবহার করতে দেবে না আরব আমিরাত

এদিকে রয়টার্স জানায়, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) জানিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে তাদের আকাশ, স্থল ও নৌপথ ব্যবহার করতে দেবে না। সোমবার আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এ কথা জানায়। ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় কোনো লজিস্টিক সহায়তা দেয়ার চেয়ে ইউএই কর্তৃপক্ষ বরং সমস্যা কূটনৈতিক উপায়ে সমাধান করার ওপর জোর দিয়েছে। সংলাপ বাড়ানো, উত্তেজনা কমানো, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করাই বর্তমান সঙ্কট সমাধানের সর্বত্তোম পন্থা বলে আরব আমিরাত বিশ্বাস করে, বলা হয় বিবৃতিতে।

যেকোনো মুহূর্তে ইরানে হামলা চালানোর ট্রাম্পের এই প্রচ্ছন্ন হুমকির প্রতিক্রিয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাত এবার তাদের অবস্থান জানাল। যদিও আরব আমিরাতে রাজধানী আবুধাবির কাছে একটি বিমানঘাঁটিতে আছে হাজারো মার্কিন সেনা কর্মকর্তা। আরব আমিরাতের মতো একইরকম বিবৃতিতে এক সপ্তাহ আগে সৌদি আরবও বলেছে, ইরানে হামলায় তারা তাদের আকাশ ও স্থলপথ ব্যবহার হতে দেবে না।