গ্যাসের চাপ নেই, বিদ্যুৎও মিলছে না নিয়মিত। উৎপাদন সচল রাখতে ডিজেলচালিত জেনারেটর চালিয়েও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছেন না শিল্পোদ্যোক্তারা। কোথাও পুরো কারখানা বন্ধ, কোথাও অর্ধেক সক্ষমতায় উৎপাদন, আবার কোনো কোনো কারখানা দিনে কয়েক ঘণ্টা চালু রাখার পর বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। এদিকে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে জ্বালানি সঙ্কট এখন উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে কারখানা বন্ধ, শ্রমিক ছাঁটাই, রফতানি আদেশ হারানো এবং ব্যাংকঋণ পরিশোধে সক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝা যায় গ্যাস সরবরাহের পরিসংখ্যানেই। ১৩ আগস্ট জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২০৩ কোটি ঘনফুটে, যেখানে দৈনিক চাহিদা ছিল প্রায় ৩৮৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ এক দিনে ঘাটতি ছিল প্রায় ১৭৭ কোটি ঘনফুট। গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে যাচ্ছে এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বাড়ছে। ১৩ আগস্ট সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য দোকান, মার্কেট ও শপিংমল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশও দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্যাসনির্ভর শিল্প। টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং, ওয়াশিং, ফিনিশিং, স্টিল, সিমেন্ট, কাচ, গার্মেন্ট ও খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বয়লার ও উৎপাদনযন্ত্র স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। একই সাথে বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালানোর জন্য বাড়তি ডিজেল কিনতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে এক দিকে উৎপাদন কমছে, অন্য দিকে প্রতিটি পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা দেখা যাচ্ছে গাজীপুরে। শিল্প মালিকদের হিসাবে জেলাটিতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিল্প ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১২ থেকে ১৫ শতাংশ, অর্থাৎ আনুমানিক ৫২৫টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। যেসব বড় কারখানা কোনোভাবে চালু আছে, সেগুলোর উৎপাদনও প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জের চিত্রও উদ্বেগজনক। শিল্প মালিকদের হিসাবে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে যাওয়ায় জেলায় প্রায় ৪৫০টি ডাইং কারখানা উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে গার্মেন্ট কারখানায়। ডাইং কারখানা থেকে কাপড় না পাওয়ায় শতাধিক পোশাক কারখানাও ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থাৎ একটি কারখানার গ্যাস সঙ্কট এখন আর শুধু সেই প্রতিষ্ঠানের সমস্যা থাকছে না; সরবরাহ-শৃঙ্খলের পরবর্তী কারখানাকেও অচল করে দিচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের একটি টেক্সটাইল কারখানার উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, কারখানাটির অনুমোদিত গ্যাসচাপ ১৫ পিএসআই হলেও গত কয়েক মাস ধরে চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। শিল্পযন্ত্র সচল রাখতে যেখানে অন্তত ৭ পিএসআই চাপ প্রয়োজন, সেখানে অনেক সময় ১ থেকে ২ দশমিক ৫ পিএসআইয়ের বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সরকারি গ্যাসে যে কারখানার মাসিক জ্বালানি ব্যয় প্রায় চার কোটি টাকা হওয়ার কথা, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে তা বেড়ে প্রায় ৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নয়া দিগন্তকে বলেন, এক বছরে কোনো কারখানা মোট কত দিন বন্ধ ছিল এমন সমন্বিত সরকারি হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। তবে সঙ্কটটি এক দিনের বা কয়েক দিনের নয়; অনেক কারখানা মাসের পর মাস স্বাভাবিক উৎপাদন করতে পারছে না। কোনো কারখানায় শিফট কমানো হয়েছে, কোনোটি সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিন বন্ধ রাখা হচ্ছে, আবার কোথাও গ্যাস ও বিদ্যুৎ দু’টির সঙ্কটে পুরো উৎপাদনই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, তাদের কাছে তথ্য রয়েছে একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর কারখানাগুলোতে জেনারেটর চালাতে প্রতিদিন প্রায় ৬৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হচ্ছে। এতে দৈনিক খরচ হচ্ছে প্রায় ৭০ লাখ টাকা। সাভার-আশুলিয়াতেও গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। এতে বয়লার, ডাইং, ওয়াশিং ও ফিনিশিং ইউনিট সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব শিল্পে একটি পর্যায়ের উৎপাদন ব্যাহত হলে পরবর্তী পর্যায়েও কাজ আটকে যায়। ফলে গার্মেন্ট কারখানা চালু থাকলেও সময়মতো কাপড়, সুতা বা প্রক্রিয়াজাত পণ্য না পাওয়ায় রফতানি পণ্যের উৎপাদন শেষ করা যাচ্ছে না। দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে ১৫০ থেকে ৩৯০ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে।
এদিকে চট্টগ্রামেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গ্যাসের ঘাটতির সাথে বিদ্যুৎ সঙ্কট যুক্ত হওয়ায় শিল্পকারখানাগুলোকে উৎপাদনসূচি বারবার পরিবর্তন করতে হচ্ছে। গ্যাসনির্ভর স্টিল, সিমেন্ট, টেক্সটাইল ও অন্যান্য শিল্পে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি জেনারেটরনির্ভরতা বাড়ছে। শিল্পোদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক রফতানি কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়বে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, রফতানিমুখী শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হচ্ছে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারা। একটি পোশাক বা টেক্সটাইল অর্ডারের ক্ষেত্রে উৎপাদন, ডাইং, ওয়াশিং, ফিনিশিং, প্যাকিং ও জাহাজীকরণ সব ধাপ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করতে হয়। একটি পর্যায়ে গ্যাসের অভাবে উৎপাদন আটকে গেলে পুরো সরবরাহ-চক্র পিছিয়ে যায়। এতে ক্রেতার কাছে অতিরিক্ত সময় চাইতে হয়, জরিমানার ঝুঁকি থাকে এবং ভবিষ্যতের অর্ডার অন্য দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের গার্মেন্ট কারখানাগুলোর উৎপাদন অনেক ক্ষেত্রে প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যভুক্ত অনেক কারখানা বন্ধ রয়েছে এবং চালু থাকা কারখানাগুলোও সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, শিল্পের এই দুরবস্থা ব্যাংকিং খাতের জন্যও নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। কারণ অধিকাংশ বড় শিল্পকারখানা ব্যাংকঋণ নিয়ে যন্ত্রপাতি, ভবন ও উৎপাদন অবকাঠামো তৈরি করেছে। উৎপাদন বন্ধ হলে প্রথমে বিক্রি কমে যায়, এরপর নগদ অর্থের প্রবাহ কমে যায়। একপর্যায়ে শ্রমিকের মজুরি, কাঁচামালের মূল্য, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল ও ব্যাংকের কিস্তি- সব একসাথে পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, বর্তমান সঙ্কটের তাৎক্ষণিক কারণ এলএনজি সরবরাহে বিঘœ হলেও এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতা। একটি এলএনজি টার্মিনাল ২১ জুলাই বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। ৬ আগস্ট টার্মিনালটির একটি ইউনিট আংশিকভাবে চালু হলেও দৈনিক প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাসই তখন নতুন করে গ্রিডে যুক্ত হয়। বাংলাদেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুটের বিপরীতে স্বাভাবিক সরবরাহ প্রায় ২৬০ কোটি ঘনফুট বলে তিনি জানিয়েছেন।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্যাস সঙ্কটের কারণে তাদের ব্যাংক প্রায় সাত হাজার থেকে আট হাজার কোটি টাকার শিল্পঋণ আটকে থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংকঋণ নিয়ে যন্ত্রপাতি স্থাপন করলেও গ্যাসের অভাবে কারখানা উৎপাদনে যেতে পারেনি। কোথাও তিন থেকে চার বছর ধরে আমদানি করা যন্ত্রপাতি পড়ে আছে। এসব প্রকল্প শেষ পর্যন্ত খেলাপি ঋণে পরিণত হলে ব্যাংকিং খাতও বড় চাপের মুখে পড়তে পারে বলে তিনি জানান।
এদিকে শুধু পুরনো কারখানা নয়, নতুন বিনিয়োগও থমকে আছে। তিতাস গ্যাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত নতুন শিল্প গ্যাস সংযোগ দেয়া সম্ভব নয়। পাঁচ শতাধিক গ্রাহক গ্যাস সংযোগের জন্য টাকা জমা দিয়েও সরবরাহ পাচ্ছেন না। তিতাসের দৈনিক প্রয়োজন প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস, অথচ বর্তমানে তারা পাচ্ছে প্রায় ১৫০ থেকে ১৫৫ কোটি ঘনফুট।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ, তেলের ৯৫ শতাংশ এবং কয়লার ৯০ শতাংশ আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ও সরবরাহের অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে পড়ছে। জ্বালানি খাতে ভর্তুকিও মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকারের নতুন পদক্ষেপও দেখাচ্ছে যে সঙ্কটটি এখন কেবল শিল্প খাতে সীমাবদ্ধ নেই। গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে জাতীয় গ্রিডে কয়েক শ’ মেগাওয়াটের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বাড়ছে।
দেশের শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, সঙ্কট সামাল দিতে হলে গ্যাস বণ্টনে শিল্পাঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেয়ার পাশাপাশি আগে থেকেই সরবরাহের সময়সূচি জানাতে হবে। এতে কারখানাগুলো উৎপাদন পরিকল্পনা করতে পারবে এবং বিদেশী ক্রেতাদেরও বাস্তব পরিস্থিতি জানানো সম্ভব হবে। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি।
তারা বলছেন, কারখানা বন্ধের হিসাব শুধু শিল্প মালিকের লোকসান দিয়ে শেষ হয় না। একটি কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিকের আয় কমে, ব্যাংকের ঋণ ঝুঁকিতে পড়ে, কাঁচামালের সরবরাহকারী টাকা আটকে যায়, রফতানি আয় কমে এবং সরকারের রাজস্বও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর গার্মেন্ট ও টেক্সটাইলের মতো আন্তঃনির্ভর শিল্পে একটি ডাইং বা স্পিনিং কারখানা বন্ধ হলে তার প্রভাব একাধিক কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।



