রাসুলুল্লাহ সা: এর প্রশ্নোত্তরভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন দিশা দিতে পারে

Printed Edition

শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক, প্রশ্ননির্ভর ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: এর শিক্ষাদান পদ্ধতি অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে। বক্তারা বলেছেন, প্রায় দেড় হাজার বছর আগে রাসুলুল্লাহ সা: যে প্রশ্নোত্তর, সংলাপ ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষাকৌশল প্রয়োগ করেছিলেন, তার সাথে আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীকেন্দ্রিকতা, উচ্চতর চিন্তন, সৃজনশীলতা ও সংলাপভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য রয়েছে।

আজ (২২/০৮/২০২৬) এ বিষয়কে সামনে রেখে উত্তরার আইইএস কমপ্লেক্স মিলনায়তনে ইসলামিক এডুকেশন সোসাইটি, ঢাকা আয়োজিত সেমিনারে ‘প্রশ্নোত্তরভিত্তিক অংশগ্রহণমূলক শিক্ষাপদ্ধতি : রাসুলুল্লাহ সা: এর কর্মপদ্ধতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে তার প্রাসঙ্গিকতা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. মুহাম্মদ রুহুল আমীন রব্বানী, সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। প্যানেল আলোচক হিসেবে অংশ নিয়েছেন প্রফেসর ড. মো: শামছুল আলম, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ড. মুহাম্মদ নূরুল্লাহ, ভাইস প্রিন্সিপাল, বিএমটিটিআই, গাজীপুর।

সভাপতিত্ব করেন মো: শফিউল্লাহ, চেয়ারম্যান, ইসলামিক এডুকেশন সোসাইটি, ঢাকা ও সাবেক সিনিয়র সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। সেমিনারে মডারেটর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. আহসান হাবীব ইমরোজ, পরিচালক, ইসলামিক এডুকেশন সোসাইটি, ঢাকা।

সেমিনারে নির্বাচিত আলোচক হিসেবে অংশ নেন অধ্যক্ষ মো: সিরাজুল ইসলাম, কার্যকরী কমিটির সদস্য, ইসলামিক এডুকেশন সোসাইটি; ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এবিএম গোলাম মুস্তফা, এলডিএমসি, পিএসসি; ড. মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ, সহযোগী অধ্যাপক, কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সাবেক কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড; হাবীবুল্লাহ মুহাম্মাদ ইকবাল, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশন।

এ ছাড়া উপস্থাপিত প্রবন্ধের ওপর বক্তব্য রাখেন ড. তারেক মোহাম্মদ জায়েদ, প্রিন্সিপাল, আইডিয়াল টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, উত্তরা; মোহাম্মদ মন্্জুরুল হক, সাবেক অধ্যক্ষ আইইএস উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়; মিসেস সিদ্দিকা বুলবুল, শিক্ষক, আইইএস উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, উত্তরা।

সেমিনারের মূল প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে, প্রচলিত বক্তৃতাকেন্দ্রিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীরা অনেক সময় জ্ঞানের নিষ্ক্রিয় গ্রহীতায় পরিণত হয়। এর বিপরীতে অংশগ্রহণমূলক শিক্ষায় শিক্ষার্থী প্রশ্ন করে, চিন্তা করে, আলোচনায় অংশ নেয় এবং নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে জ্ঞান নির্মাণ করে। গবেষণায় প্রশ্নকে শিক্ষার্থীর মনোযোগ আকর্ষণ, পূর্বজ্ঞান সক্রিয়করণ, সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ, অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং তাৎক্ষণিক মূল্যায়নের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রবন্ধে আরো দেখানো হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সা: এর শিক্ষাদান পদ্ধতিতে প্রশ্নের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত ও বহুমাত্রিক। কখনো তিনি প্রশ্নের মাধ্যমে শ্রোতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন, কখনো পূর্বজ্ঞান যাচাই করেছেন, আবার কখনো এমন প্রশ্ন করেছেন যার উত্তর দেয়ার আগে সাহাবিদের গভীরভাবে চিন্তা করতে হয়েছে। ফলে প্রশ্ন তাঁর কাছে শুধু তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যম ছিল না; বরং জ্ঞান নির্মাণ, চরিত্র গঠন এবং হৃদয়-মনে স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টির একটি কার্যকর শিক্ষণ-কৌশল ছিল।

গবেষণায় কোরআন ও হাদিসের আলোকে প্রশ্নোত্তরভিত্তিক শিক্ষার বিভিন্ন ধারা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়-কখনো সাহাবিগণ রাসুলুল্লাহ সা:-কে প্রশ্ন করেছেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তার উত্তর এসেছে; কখনো সাহাবির প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজেই দিয়েছেন; আবার কখনো শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে তিনি সাহাবিদের প্রশ্ন করেছেন এবং তাদের কাছ থেকে উত্তর গ্রহণ করেছেন।

বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীকে শুধু পরীক্ষার জন্য তথ্য মুখস্থ করানোর পরিবর্তে তাকে প্রশ্ন করতে, যুক্তি দিয়ে ভাবতে, মতামত প্রকাশ করতে, অন্যের বক্তব্য শুনতে এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজতে সক্ষম করে তোলা জরুরি। এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সা:-এর প্রশ্নোত্তরভিত্তিক শিক্ষা মডেল ইসলামী শিক্ষাদর্শন ও আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে।

সেমিনারে আধুনিক শিক্ষাতত্ত্বেও ঈড়হংঃৎঁপঃরারংস, ওহয়ঁরৎু-ইধংবফ খবধৎহরহম, উরধষড়মরপ চবফধমড়মু এবং ইষড়ড়স’ং ঞধীড়হড়সু-এর সাথে নবীজি সা:-এর প্রশ্নোত্তরভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতির সাদৃশ্য ও পার্থক্য নিয়েও আলোচনা করা হয়। গবেষণায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, নবীজি সা:-এর শিক্ষাপদ্ধতিতে প্রশ্নের পাশাপাশি ওহি, নৈতিকতা ও ঈমানি মূল্যবোধ ছিল জ্ঞান নির্মাণের চূড়ান্ত নির্দেশক, যা আধুনিক শিক্ষাতত্ত্বের সাথে এর একটি মৌলিক পার্থক্য।

আয়োজকরা মনে করছেন, শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, গবেষক, মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা তৈরি হলে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে আরো কার্যকর, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও মূল্যবোধনির্ভর শিক্ষাপদ্ধতি বিকাশের পথ সুগম হবে।